
মেট্রোরেল যাত্রীসেবার ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) অব্যাহতি আরও ১০ বছর বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০৩৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রাখার দাবি করা হয়েছে।
সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ। এনবিআরে পাঠানো চিঠির সূত্রে এসব জানা গেছে। চিঠিতে ডিএমটিসিএল বলছে, মেট্রোরেলে কোনো শ্রেণিভিত্তিক সেবা নেই এবং এটি সবার জন্য সমান ভাড়ার গণপরিবহন। এ কারণে সেবাটির ওপর ভ্যাট আরোপ যৌক্তিক নয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, শুধু ভাড়ার আয়ে মেট্রোরেল পরিচালনা লাভজনক হয় না। বিভিন্ন দেশের মেট্রোরেল পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, শুধুমাত্র ভাড়ার আয় হতে লাভজনকভাবে মেট্রোরেল পরিচালনা করা যায় না। মেট্রোরেল পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলো ভাড়া থেকে সর্বোচ্চ ৬৫ শতাংশ আয় হয়ে থাকে। অবশিষ্ট ৩৫ শতাংশ আয় সরকার ভর্তুকি হিসেবে দিয়ে থাকে।
চিঠিতে দাবি করা হয়, মেট্রোরেল আইন ২০১৫ অনুযায়ী সরকার মেট্রোরেলের ভাড়া জনসাধারণের সাধ্যের মধ্যে রেখেছে। মেট্রোরেল সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত বিধায় কোনো ধরনের জীবাশ্ম ও তরল জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে না। এমআরটি লাইন-৬ পরিপূর্ণভাবে চালু হলে এই রুটে সড়ক যানবাহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বছরে ২ লাখ ২ হাজার ৭৬২ টন কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে। এরইমধ্যে এমআরটি লাইন-৬ নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চালু হওয়ায় এই রুটে সড়ক যানবাহনের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। ফলশ্রুতিতে এই রুটে বায়ু দূষণও কমতে শুরু করেছে। শব্দ দূষণও কমেছে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, এমআরটি লাইন-৬ এর সম্পূর্ণ অংশ পরিপূর্ণভাবে চালু হওয়ার পর মেট্রোরেল পরিচালনাকালে দৈনিক ট্রাফেল টাইম কস্ট বাবদ প্রায় ৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং ভেহিক্যাল অপারেশন কষ্ট বাবদ প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা সাশ্রয় হবে। সাশ্রয় করা অর্থ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সূত্র আরও বলছে, ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৬) একটি চলমান জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। প্রকল্পটির মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৮ তারিখে উত্তীর্ণ হবে অর্থাৎ প্রকল্পটি এখনও শেষ হয়নি। প্রকল্পটি চলমান থাকায় প্রকল্পের দায় এবং সম্পদ এখনও ডিএমটিসিএল এর কাছে হস্তান্তর হয়নি। ডিএমটিসিএল এর নিরীক্ষিত অডিট রিপোর্টেও এর প্রতিফলন রয়েছে। ডিএমটিসিএল একটি কোম্পানি বিধায় মেট্রোরেল বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে গৃহীত বিপুল অঙ্কের ঋণের কিস্তি অর্থ বিভাগের মাধ্যমে নিয়মিত পরিশোধ করে যাচ্ছে। এরইমধ্যে হয় কিস্তির সর্বমোট ১০৬ কোটি ০৫ লাখ ২৯ হাজার ৮৬ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এমআরটি লাইন-৬ এখনও শেষ না হওয়ায় এবং পূর্ণ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে না যাওয়ায় বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের জন্য মেট্রোরেল একটি ইনফ্যান্ট ইন্ডাস্ট্রি দীর্ঘমেয়াদি কর রেয়াত সুবিধা দিয়ে থাকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিল্লি মেট্রোরেল প্রায় ২৫ বছর ধরে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং এখনও সম্প্রসারণ কাজ অব্যাহত থাকায় মেট্রোরেল সেবার ওপর কোনো মূসক নেই। এছাড়া প্রকল্পের শুরুতেও মেট্রোরেলের অপারেশন ও সার্ভিস শুরুর পর হতে পরবর্তী ১০ বছর পর্যন্ত ট্যাক্স হলিডে সুবিধা প্রদানের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
অন্যদিকে মেট্রোরেলের আংশিক বাণিজ্যিক পরিচালনা শুরুর পর বিদ্যুতের মূল্য ২০২৩ সালে ৩ বার এবং ২০২৪ সালে ১ বার বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ বিল বাবদ মাসে গড়ে প্রায় ৬ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। তারপরও সরকার জনসাধারণের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় মেট্রোরেলের ভাড়া এখন পর্যন্ত বৃদ্ধি করেনি। এছাড়া বর্তমানে মেট্রোরেলের ১৬টি স্টেশনে মোট ৮৪টি স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায় মেশিননের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। যেখানে মেশিনের মাধ্যমে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত করে তা আদায় করা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
গত ডিসেম্বরের আদেশে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) মেট্রোরেল সেবার ওপর আরোপণীয় মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ জুনের পরবর্তী সময়ের জন্য মেট্রোরেল সেবার ওপর মূল্য সংযোজন কর হতে অব্যাহতি দেওয়া প্রয়োজন। এসব বিবেচনায় নিয়ে দ্রুতগামী, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, সময় সাশ্রয়ী, বিদ্যুৎচালিত, পরিবেশবান্ধব ও দূরনিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গণপরিবহণ ব্যবস্থা হিসেবে মেট্রোরেলের যাত্রী সেবার ওপর মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি আগামী ১০ বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০৩৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেছে ডিএমটিসিএল।