ঢাকা শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সুসংবাদ প্রতিদিন

চান্দিনায় মাছ চাষে বিপ্লব

চান্দিনায় মাছ চাষে বিপ্লব

কুমিল্লার চান্দিনা বলতেই একসময় চোখের সামনে ভেসে উঠত দিগন্তজোড়া ধানের মাঠ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই চেনা দৃশ্যে এসেছে আমূল পরিবর্তন। লাঙলের ফলার চেয়ে এখন জালের ঝিলিক সেখানে বেশি উজ্জ্বল। চান্দিনার বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমি ও জলাশয়গুলো এখন মাছ চাষের এক বিশাল অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, চান্দিনা এখন আর শুধু ধানের জনপদ নয়, এটি এখন দেশের এক সমৃদ্ধ ‘মাছের স্বপ্নগ্রাম’। মূলত ভৌগোলিক সুবিধা আর কৃষকদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি এই অঞ্চলে এক নীরব মৎস্য বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। জেলা হিসেবে কুমিল্লা মাছ উৎপাদনে দেশের দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও, চান্দিনার অবদান এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রামের সফল মৎস্য ব্যবসায়ী আবুল কালামের অভিজ্ঞতায় উঠে আসে এই পরিবর্তনের পেছনের গল্প। তার মতে, মাছ চাষ একটি অত্যন্ত লাভজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

যদিও এই ব্যবসায় শুরুতে অধিক পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয়, কিন্তু সঠিক পরিচর্যা আর ধৈর্য ধরলে মেয়াদ শেষে যে পরিমাণ মুনাফা পাওয়া যায়, তা অন্য কোনো কৃষিপণ্যে কল্পনা করা কঠিন। বিশেষ করে চান্দিনার অনেক পতিত জমি রয়েছে, যেখানে আগে ধান চাষ করে কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতেন না। লোকসান এড়াতে সেই জমির মালিকরা এখন জমির চারদিকে উঁচু আইল বা বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের উপযোগী করে তুলেছেন। এই পদ্ধতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো সমন্বয়। বর্ষাকালে এসব জমিতে যখন পানি থৈ থৈ করে, তখন চলে মাছের রাজত্ব। আবার পানি নেমে গেলে শীতের মৌসুমে সেখানে অনায়াসেই বোরো ধানের চাষ করা হয়। জমির এই বহুমুখী ব্যবহার স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। বর্তমানে চান্দিনার পুকুর ও ঘেরগুলোতে তেলাপিয়া, পাঙ্গাস, শিং , হাইব্রিড কৈ, বাইন মাছ এবং কার্প জাতীয় মাছ যেমন রুই, কাতলা ও মৃগেলের ব্যাপক চাষ হচ্ছে। পানিপাড়া গ্রামের আরেক সফল মৎস্য ব্যবসায়ী মো. জামাল উদ্দিন মনে করেন, মাছ চাষ শুধু ব্যক্তিগত মুনাফাই বাড়ায় না, বরং এটি দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে এক বিরাট হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। একজন চাষি যখন বাণিজ্যিকভাবে মাছ উৎপাদন শুরু করেন, তখন তারসঙ্গে জড়িয়ে যায় অনেক শ্রমিকের কর্মসংস্থান। পোনা উৎপাদন থেকে শুরু করে মাছ বাজারজাত করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে অসংখ্য মানুষের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হচ্ছে। তবে এই বিশাল সাফল্যের মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। বাণিজ্যিক মাছ চাষের এই আগ্রাসনে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের অতি পরিচিত দেশীয় প্রজাতির মাছ। একসময় চান্দিনার উন্মুক্ত জলাশয়ে যে শোল, গজার, দেশি কই, পুঁটি কিংবা মলা-ঢেলা মাছের ছড়াছড়ি ছিল, অধিক লাভের আশায় চাষ করা বিদেশি বা হাইব্রিড মাছের দাপটে সেগুলো এখন বিলুপ্তির পথে।

এছাড়া অপরিকল্পিতভাবে ফসলি জমির চারপাশে বাঁধ দিয়ে পুকুর খনন করার ফলে অনেক ক্ষেত্রে কৃষিজমি তার স্বাভাবিক চরিত্র হারাচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, অপরিকল্পিত এই জলাশয় তৈরি দীর্ঘমেয়াদে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও মাটির গুণাগুণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আকস্মিক বন্যায় মৎস্য বীজ খামারসহ অসংখ্য ঘের ভেসে গিয়ে চাষিরা যে ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, তা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় পরিকল্পিত অবকাঠামোর অভাবকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের ভূমিকা বেশ প্রশংসনীয়। চান্দিনা উপজেলা মৎস্য অফিস নিয়মিতভাবে চাষিদের আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর মৎস্য সপ্তাহ পালন এবং সফল চাষিদের পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে নতুনদের এই পেশায় আসতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন মৎস্য খাদ্য ও ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানির প্রতিনিধিরাও মাঠে গিয়ে চাষিদের মাছের রোগবালাই দমন ও সঠিক খাদ্যের ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন। এই সমন্বিত প্রচেষ্টায় চান্দিনায় মাছ চাষিদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত