
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর আবগারি (অভ্যন্তরীণ) শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ভোক্তা ও তেল কোম্পানিগুলোকে অস্থির অপরিশোধিত তেলের দামের চাপ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এর পূর্ণ প্রভাব নির্ভর করবে ভারতে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতির ওপর।
গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্তে পেট্রোল ও ডিজেল- উভয়ের ওপর লিটারপ্রতি ১০ রুপি করে আবগারি শুল্ক কমানো হয়েছে। এর ফলে পেট্রোলে আবগারি শুল্ক কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ রুপি প্রতি লিটার, আর ডিজেলের ক্ষেত্রে কার্যত তা শূন্যে নেমে এসেছে। মূলত বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ায় তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর ওপর যে ব্যয়চাপ তৈরি হয়েছে, তা কমাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ মিলিয়ন বা ২ থেকে আড়াই কোটি ব্যারেল তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়, যা বিশ্ব সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি তার মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ এই পথ দিয়ে আনে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিঘ্ন দেখা দিলে সরবরাহ ও দামের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় বাড়তে থাকলে তা মূল্যস্ফীতি বাড়াবে এবং সরকারি অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, যার প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের ওপরও।
এদিকে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিশ্ববাজারে তেলের দামে ওঠানামা হয়েছে, তবুও ভারতে খুচরা জ্বালানির দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। এর কারণ, তেল বিপণন কোম্পানিগুলো স্বল্পমেয়াদি অস্থিরতা নিজেরাই বহন করে, যাতে ঘন ঘন দামের পরিবর্তন না করতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে শুল্ক কমানোর প্রভাব প্রথমদিকে এসব কোম্পানির ক্ষতি পুষিয়ে দিতে ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে ভোক্তারা তাৎক্ষণিকভাবে দামে বড় কোনো পতন না দেখে ধীরে ধীরে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।
তেল-গ্যাসের জন্য ফের রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে ভারত:
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাবে পুরনো মিত্র রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আবারও জোরদার করতে যাচ্ছে ভারত।
দুই দেশ আবার সরাসরি তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্য শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্প্রতি দিল্লিতে রাশিয়ার জ্বালানি উপমন্ত্রী ও ভারতের জ্বালানি মন্ত্রীর বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি বাড়িয়ে মোট আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এই পথ দিয়েই ভারতের প্রায় অর্ধেক তেল ও গ্যাস আমদানি হয়। ফলে দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমিয়েছিল।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দিল্লি আবার রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে এবং এমনকি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় পাওয়ার চেষ্টাও করছে।
শীতল যুদ্ধের সময় থেকেই ভারত-রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান সংকটে সেই সম্পর্ক আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত এখন বাস্তববাদী কৌশল নিচ্ছে—যেখানে রাজনৈতিক চাপের চেয়ে নিজেদের প্রয়োজনকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।