
২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দ্বিগুণ করার লক্ষ্য অর্জনে তরুণদের দক্ষ, কর্মক্ষম ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
তিনি বলেন, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জনই যথেষ্ট নয়, শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগের দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এসব দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।
গতকাল শুক্রবার ঢাকায় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এ টেসলবিডি ও ইউল্যাবের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত '২য় ইউল্যাব-টেসলবিডি আন্তর্জাতিক ইএসপি (ইংলিশ ফর স্পেসিফিক পারপাস) কনফারেন্স ২০২৬'-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি জ্ঞান অর্জন করতে এবং নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে। কিন্তু প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি না হলে শুধু ডিগ্রি দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থীকে এমনভাবে প্রস্তুত হতে হবে, যাতে তিনি অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারেন এবং কর্মক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেন। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার ঘাটতি তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি শেখানো ও শেখার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যালয় পরিদর্শন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শেখানোর জন্য শিক্ষকদের নিজেদেরও ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজিতে পড়াশোনা করেও অনেক শিক্ষার্থীর সাবলীলভাবে কথা বলা, লিখিতভাবে ভাব প্রকাশ করা এবং পেশাগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতির পরিবর্তনে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে ভাষার ব্যবহারিক প্রয়োগ ও যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা শুধু যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, ব্যবসা, অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক জ্ঞান অর্জনের জন্যও এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা, প্রযুক্তিগত নির্দেশনা এবং পেশাগত তথ্যের বড় একটি অংশ ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। ফলে ভাষাগত দক্ষতার অভাব অনেক সময় মেধাবী শিক্ষার্থীদেরও জ্ঞান অর্জন ও কর্মক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে ইংরেজির পাশাপাশি নিজস্ব ভাষায় জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত পরিভাষা সহজলভ্য করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যথাযথ দক্ষতায় গড়ে তুলতে পারলে তারা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় সম্পদ হয়ে উঠবে। তরুণদের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থান, স্থিতিশীল আয় এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণদের সামনে বাস্তবসম্মত বিকল্প তৈরি করা গেলে তারা অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে থেকে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। এ জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মমুখী শিক্ষা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ইউল্যাবের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. শামসাদ মর্তুজার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মাসুমা হাবিব, রিয়েলিইংলিশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাইজেল কিলিক এবং সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। এ ছাড়া টেসল সোসাইটি অব বাংলাদেশের সদস্য এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হবে:
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, দায়িত্ব পালনে সক্ষম এবং ভবিষ্যতে আরও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন— এমন প্রার্থীদেরই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঢাকার আশুলিয়ার নয়ারহাট এলাকার 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড রিসার্চ (নিটার)'-এ দেশের বৃহত্তম 'টেক্সটাইল ফেস্ট বাংলাদেশ'-এর দ্বিতীয় দিনের সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রতিমন্ত্রী। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে ববি হাজ্জাজ বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পলিসিগত কিছু নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। শুরু থেকেই এর মূল উদ্দেশ্য ছিল যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের সুযোগ দেওয়া। সে অনুযায়ী প্রচলিত নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে এবং পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সম্পন্ন করেই নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়েছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি বা দুর্বলতা রয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের কিছু জায়গায় প্রশাসনিকভাবে কিছুটা দুর্বলতা বা ব্যাঘাত তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর নিজ দায়িত্বে তা চিহ্নিত করে সংশোধনের কাজ করছে। পুরো প্রক্রিয়া ইতিবাচক ও সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে বলে সরকার আশাবাদী।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার সামগ্রিক মান বাড়াতে বর্তমানে সব খাতকে একসাথে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষকদের অবস্থান ও সুযোগ-সুবিধা, মনিটরিং ব্যবস্থা, কারিকুলাম উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির আধুনিকায়নের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাটি বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু এবং নিটারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।