ঢাকা শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বাজারে শীতের সবজি, দামে অস্বস্তি

বাজারে শীতের সবজি, দামে অস্বস্তি

বিদায়ের পথে আশ্বিন মাস। ঋতুচক্রে এখন শরতের মধ্যভাগ। প্রকৃতিতে এখন না নাতিশীতোষ্ণ থাকার কথা। কিন্তু শরৎ অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে শীতের লেশমাত্র আভাসও এখন পাওয়া যাচ্ছে না। তবে শীতের আগাম সবজি শিম, ফুলকপি ও মুলা বাজারে উঠতে শুরু করেছে। তবে নতুন সবজি বাজারে এলেও দাম কমার স্বস্তি পাচ্ছেন না ক্রেতারা। অধিকাংশ সবজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। কিছু সবজির দাম আরও বেশি। এর মধ্যে কাঁচা মরিচের দাম কিছুটা কমেছে। মাছ ও মাংসের দাম গত সপ্তাহের মতোই রয়েছে। তবে ডিমের দাম ডজনে ১০ টাকা কমে ১৪০ টাকায় নেমেছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর একাধিক কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বাজার ঘুরে দেখা যায়, শীতের আগাম সবজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা কেজি দরে। ফুলকপি প্রতিটি ৭০ টাকা এবং মুলা বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজিতে। বেগুন, করলা, বরবটি, ঢ্যাঁড়স, পটোল ও কাঁকরোলের মতো সাধারণ সবজির দামও ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে আসেনি। এসব সবজির বেশির ভাগ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। তুলনামূলক কম দামে শসা পাওয়া যাচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। তবে দেশি শসার কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা। পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা কেজি দরে। লাউয়ের দাম আকারভেদে ৪০ থেকে ৬০ টাকা। বাজারে বেগুন ও টমেটোর দামও বেশি। লম্বা বেগুন ১০০ টাকা এবং গোল বেগুন ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। টমেটোর কেজি ১২০ থেকে ১৪০ টাকা। বরবটি, ঝিঙে ও করলা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। কচুরমুখির দাম কেজিতে ৮০ টাকা।

সবজির উচ্চমূল্যের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে কাঁচা মরিচের বাজারে। কয়েক সপ্তাহ আগে কাঁচা মরিচের কেজি ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। সরবরাহ বাড়ায় এখন মানভেদে ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজার করতে আসা আবুল কালাম মাহী বলেন, ১৪০ টাকা দিয়ে দুটি ফুলকপি কিনেছেন। নতুন সবজি হওয়ায় বেশি দাম দিয়েও কিনেছেন। একটি লাউ কিনেছেন ৫০ টাকায়। এ ছাড়া এক পোয়া কাঁচা মরিচ কিনতে খরচ হয়েছে ৪০ টাকা।

সবজির বাজারে বাড়তি খরচের পাশাপাশি মাছ-মাংস কিনতেও ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে চড়া দাম। বাজারে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা কেজি দরে। সোনালি মুরগির দাম ৩১০ টাকা। গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা। ডিমের বাজারে অবশ্য কিছুটা স্বস্তি এসেছে। ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি ডজন ১৪০ টাকা এবং চারটি ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহের তুলনায় ডজনপ্রতি দাম কমেছে ১০ টাকা।

ব্রয়লার মুরগি বিক্রেতা মাহীন সারওয়ার বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্রয়লার মুরগির দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। এক সপ্তাহে কেজিতে ১০ টাকা কমলে পরের সপ্তাহে আবার ১০ টাকা বেড়ে যায়। ফলে দাম ঘুরেফিরে ২০০ টাকার আশপাশে থাকে। সোনালি মুরগির দামও ৩১০ থেকে ৩২০ টাকার মধ্যে রয়েছে। শুক্রবার তিনি ৩১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। কাজীপাড়া এলাকার ডিম বিক্রেতা আলাউদ্দিন জানান, বর্তমানে ফার্মের মুরগির ডিম ডজনপ্রতি ১৪০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। গত সপ্তাহে ১৫৫টা ডজন বিক্রি করেছেন।

উৎপাদন বাড়লেও ডিমে স্বস্তি নেই

বাংলাদেশে ডিমের উৎপাদন বাড়লেও দামে স্বস্তি পাচ্ছেন না ক্রেতারা। উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও ডিমের চড়া দাম নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য পুষ্টির চাহিদা পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে পুষ্টিকর এই খাবার সবার নাগালে রাখার চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে। প্রাণিসম্পদ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, গত কয়েক বছরে দেশে ডিমের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে পোলট্রি খাদ্য, পরিবহন ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ডিমের দামও চড়া থাকছে। এতে অনেক পরিবারের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিম রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

মাছ-মাংসের বাড়তি দামে পরিবর্তন নেই

সাপ্তাহিক ছুটির সুযোগে অনেকে পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় বাজার করতে বের হন। সবজি, মাছ, মাংস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি বাড়লেও মাছ-মাংসের বাড়তি দামে স্বস্তি নেই তাদের। মাছের বাজারেও দামের তেমন পরিবর্তন নেই। তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ২২০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি দরে। রুই ও কাতলার দাম ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা। মাঝারি আকারের রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বড় আকারের রুইয়ের কেজি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। এ ছাড়া পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, ট্যাংরা ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের কইয়ের কেজি ৩০০ টাকা। পোয়া বিক্রি হচ্ছে ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকা কেজি দরে। আকারভেদে চাষের শিং মাছের দাম ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা। চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে। রূপচাঁদা, শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে ক্রেতাদের কেজিপ্রতি এক হাজার টাকার বেশি খরচ হতে পারে। মাছের আকার, ধরন এবং জীবিত না মৃত, তার ওপরও দাম নির্ভর করছে। একই মাছের দাম একেক বাজারে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমবেশি হতে দেখা গেছে।

মাংস কিনতে গিয়ে বাড়তি হিসাব

?মাংসের বাজারে দামের চাপে অনেকে এখন মাসে একবার মাংস কিনছেন। বিশেষ করে বাজারে গরু ও খাসির মাংসের দাম বেশি হওয়ায় অনেক পরিবার প্রয়োজন অনুযায়ী এসব মাংস কিনতে পারছে না। কেউ আধা কেজি, কেউ এক কেজি মাংস কিনে সারা সপ্তাহের খাবারের পরিকল্পনা করছেন। আবার অনেকেই তুলনামূলক কম দামের ব্রয়লায় মুরগির মাংসের দিকে ঝুঁকছেন। বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতিকেজি গরুর মাংস ৭৫০-৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খাসির মাংস ১১০০-১২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

?জহিরুল ইসলাম নামে বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, ছুটির দিনে পরিবারের সদস্যদের পছন্দের খাবার রান্না করার ইচ্ছা থাকলেও বাজারের খরচ সেই ইচ্ছায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার পর মাছ-মাংসের জন্য আলাদা করে বেশি টাকা রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যপ কেউ গরুর মাংস পছন্দ করে, কেউ খাসির মাংস আবার কেউ ব্রয়লার মুরগি ছাড়া চলে না। এমন ঊর্ধ্বমুখী বাজারদরে পরিবারের চাহিদা মিটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। যার ফলে, স্বপ্ল বেতনে চাকরি করি ঠিকমতো পরিবারের চাহিদা মেটাতে পারছি না। আরেক ক্রেতা হুমায়ন আহমদ বলেন, সপ্তাহে শুক্রবার ছুটির দিনে পুরো সপ্তাহের কাঁচা বাজার করে রাখি। মাঝেমধ্যে সপ্তাহের মাঝখানে টুকটাক কিছু লাগলে তা কিনে নেই। তবে, বর্তমান সময়ে এসে বাজারে দরদামের যে হিসাব তা কোনোভাবেই খরচের সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না। একটা ঠিকঠাক কিনতে গিয়ে অন্যগুলো কেনা হয় না। পরিবারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে মাছ-মাংস কিনতে গিয়ে পকেটের টাকা শেষ হয়ে যায়।

সবকিছুর বাড়তি দাম হলেও আমাদের আয় কোনোভাবেই বাড়েনি। বরং আয় দিয়ে বাসাভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ, খাবারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে আমরা চাপে পড়ে যাচ্ছি। আমরা চাই অন্তত খাবারের চাহিদা মেটানের জন্য হলেও সরকার বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

?এদিকে, ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি পর্যায়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে হলে খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়ে। তবে বাজারভেদে পণ্য ও মান অনুযায়ী দামে পার্থক্য রয়েছে। পাইকারী বাজার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে খুচরা পর্যায়ে দাম কমে যাবে বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করেন।

ব্যবসায়ী রহিম উদ্দিন বলেন, আমরা সারারাত জেগে কারওয়ান বাজার গিয়ে বসে থাকি। ভোরে পাইকারী বাজার থেকে পণ্য কিনে সকালের আলো হওয়ার আগেই খুচরা বাজারে মালামাল নিয়ে আসি। খুচরা বাজারে লম্বা সিরিয়াল, বেশি দরে পণ্য কিনতে হয়। যার ফলে, ক্রেতাদের ওপর চাপ পড়ে। ক্রেতারা বাজারে এসে নানান কথা বলে। কিন্তু আমাদের কিছু করার থাকে না। আমরা বেশি দরে পাইকারি বাজার থেকে কিনে লোকসান দিয়ে কম দামে তো আর বিক্রি করব না। সরকার যদি চায়, পাইকারি বাজার নিয়ন্ত্রণ করে সবকিছু দর কমিয়ে আনবে। তাহলে নিত্যপণ্যের দর অনেকটা কমে আসবে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব চালের বাজার

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে চালের বাজারে। রাজধানীর খুচরা বাজারে গত এক থেকে দেড় সপ্তাহে সরু চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। মাঝারি মানের চালের দামও কেজিতে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ধানের দাম বৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চালের দাম বাড়ছে। এতে বাড়তি খরচের চাপে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। বাজারে ডায়মন্ড, মঞ্জুর ও সাগর ব্র্যান্ডের মিনিকেট চাল কেজিতে ৭৪ থেকে ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে এসব চালের দাম ছিল ৭২ টাকা। রশিদ ব্র্যান্ডের মিনিকেট চালের কেজি ৬৫ টাকা, যা এক থেকে দেড় সপ্তাহ আগে ২ টাকা কম ছিল। মোজাম্মেল ব্র্যান্ডের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৭৬ টাকা কেজি দরে।

নাজিরশাইল চালের দামও বেড়েছে। মানভেদে এ চালের কেজি ৭০ থেকে ৯৫ টাকা। বিক্রেতাদের হিসাবে, এক থেকে দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে এ চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। মাঝারি মানের পাইজাম, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ চালের দামও বেড়েছে। এসব চালের কেজি ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। তবে মোটা চালের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এ চালের কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় চাল পরিবহনে ট্রাকভাড়া বেড়েছে। ধান সংগ্রহ থেকে শুরু করে মিল ও পাইকারি বাজারে চাল পৌঁছানো পর্যন্ত কয়েক ধাপে পরিবহনের প্রয়োজন হয়। ফলে প্রতিটি ধাপে পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব চালের দামে পড়তে পারে।

খুচরা ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হোসেন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর চাল পরিবহনে খরচ বেড়েছে। পাইকারি বাজার থেকে আগের দামে চাল কেনা যাচ্ছে না। ফলে বেশি দামে চাল কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত