
একই জমিতে একাধিক ফসল, তাও আবার ভিন্ন দুই স্তরে! জমির মাটির নিচে বেড়ে উঠছে আদা, আর সেই জমির ওপর বাঁশ ও তারের তৈরি মাচায় ফলছে একের পর এক সবজি। ব্যতিক্রমী এই চাষাবাদে সাফল্য দেখিয়েছেন হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার ছিলামী গ্রামের কৃষক আব্দুস সাত্তার। তাঁর উদ্ভাবনী উদ্যোগ, কঠোর পরিশ্রম ও কৃষি কর্মকর্তার সঠিক পরামর্শে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছে কৃষিতে।
প্রচলিত পদ্ধতিতে একটি জমিতে একটি ফসল চাষের পরিবর্তে একই জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন আব্দুস সাত্তার। আদা চাষের পাশাপাশি মাচায় জিঙ্গা, বরবটি, লাউ ও শিম চাষ করে এরইমধ্যে পেয়েছেন আশাব্যঞ্জক সাফল্য। সবজি বিক্রি থেকে তাঁর ঘরে এসেছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এখন জমিতে বেড়ে উঠছে আদা ও শিম। সবকিছু ঠিক থাকলে আদা ও শিম বিক্রি করে আরও দেড় লাখ টাকার বেশি আয় করার প্রত্যাশা করছেন তিনি। সম্প্রতি ছিলামী গ্রামে তাঁর চাষের জমি পরিদর্শনকালে কথা হয় কৃষক আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে। নিজের জমিতে একাধিক ফসল চাষের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, কৃষিকাজে প্রচুর শ্রম দিতে হয়। তবে শুধু শ্রম দিলেই হয় না, প্রয়োজন সঠিক পরামর্শ ও পরিকল্পনা। শ্রমের সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ যুক্ত হলে কৃষিতে সফলতা অর্জন করা সম্ভব।
চলতি মৌসুমে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ক্রিপার প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে প্রায় ২০ শতক জমিতে আদা চাষ করেন আব্দুস সাত্তার। এ সময় তাঁকে নতুন পদ্ধতিতে চাষাবাদের পরামর্শ দেন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম।
আদা চাষের পাশাপাশি জমির ওপরের অংশ কাজে লাগিয়ে মাচায় সবজি চাষের পরামর্শ দেন তিনি। সেই পরামর্শকে কাজে লাগিয়ে বাঁশ ও তার দিয়ে তৈরি করেন মাচা। এরপর মাচায় প্রথমে জিঙ্গা ও বরবটি চাষ করেন। এসব ফসল সংগ্রহের পর সেখানে চাষ করেন লাউ ও শিম। একই জমিতে আদার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সবজি চাষের ফলে জমির ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি সবজি বিক্রি করে আগাম আয়ও হয়েছে। বর্তমানে মাচায় রয়েছে লাউ ও শিমগাছ। লাউ চাষ রয়েছে শেষ পর্যায়ে। অন্যদিকে, শিম ধরার সম্ভাবনা রয়েছে। আর মাটির নিচে বেড়ে উঠছে আদা, যা সংগ্রহ করতে আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে।
কৃষক আব্দুস সাত্তারের দেওয়া তথ্যমতে, আদা ও মাচায় সবজি চাষে তাঁর মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। এরইমধ্যে জিঙ্গা, বরবটি ও লাউ বিক্রি করে আয় করেছেন প্রায় ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সবজি বিক্রির আয় মোট উৎপাদন খরচের পাঁচ গুণ। এখনও জমিতে আদা রয়েছে। আদা সংগ্রহ ও বিক্রির পর চূড়ান্ত হিসাব আরও পরিষ্কার হবে। তবে বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় আদা ও শিম থেকে দেড় লাখ টাকার বেশি আয় করার আশা করছেন তিনি। আব্দুস সাত্তার বলেন, কৃষিকাজে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। তবে কোন জমিতে কী চাষ করলে বেশি লাভ হবে, সে বিষয়ে সঠিক পরামর্শ থাকাও জরুরি। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীমের পরামর্শে আদার পাশাপাশি মাচায় সবজি চাষ করেছি। এতে আমি লাভবান হয়েছি। তাঁর পরামর্শ আমার কাজে এসেছে। এ জন্য আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ।
আব্দুস সাত্তারের এই ব্যতিক্রমী চাষাবাদ দেখে আগ্রহ তৈরি হয়েছে আশপাশের কৃষকদের মধ্যেও। একই জমিতে আদার পাশাপাশি মাচায় সবজি চাষ করে বাড়তি আয়ের সুযোগ দেখে তারাও এ পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, সঠিক পরামর্শ ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আব্দুস সাত্তার যে সাফল্য দেখিয়েছেন, তা অন্য কৃষকদের জন্যও অনুপ্রেরণাদায়ক। একটি জমিতে শুধু একটি ফসলের ওপর নির্ভর না করে পরিকল্পিতভাবে একাধিক ফসল চাষ করা গেলে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাঁর এই উদ্যোগ দেখে তাঁরাও আদার সঙ্গে মাচায় সবজি চাষ করার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
কৃষকদের মতে, জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন খরচের বিপরীতে আয় বাড়ানো এখন কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আব্দুস সাত্তারের চাষপদ্ধতি সেই সম্ভাবনাই সামনে এনেছে।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শামিমুল হক শামীম বলেন, একই জমিতে পরিকল্পিতভাবে একাধিক ফসল চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব। কৃষক আব্দুস সাত্তার তার বাস্তব উদাহরণ দেখিয়েছেন। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহার ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ অনুসরণ করলে কৃষকেরা জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারেন।
তিনি বলেন, কৃষকদের নতুন প্রযুক্তি ও উন্নত চাষপদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং তাদের সঠিক পরামর্শের মাধ্যমে সহায়তা করা হলে কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। বাহুবল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চিন্ময় কর অপু বলেন, সঠিক পরামর্শ ও পরিকল্পনা অনুযায়ী চাষাবাদ করলে কৃষকের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই জমিতে ফসল চাষের আগে পরিকল্পনা নির্ধারণ করা জরুরি। কোনও জমিতে কোনও ফসলের সঙ্গে অন্য ফসল চাষ করা যাবে, তা বিবেচনায় নিয়ে চাষাবাদ করতে হবে।