
রাজধানী ঢাকার সড়কগুলোতে যানবাহনের আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করতে এআই-প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপন করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। নতুন এ ব্যবস্থা চালুর পর সড়কগুলোতে চালকদের আচরণের পরিবর্তন ধরা পড়ছে।
রাজধানীর প্রধান মোড়গুলোতে গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালকদের জন্য সতর্ক থাকা এখন আর ইচ্ছার বিষয় নেই। সিগন্যাল লাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমে যাচ্ছে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা। অনেকক্ষেত্রে জেব্রা ক্রসিংয়ের আগেই গাড়ি থামিয়ে দিচ্ছেন চালকরা।
কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল ফার্মগেট সড়কে আগে যেখানে তীব্র যানজট, চালকদের অস্থিরতা ও সিগন্যাল পার হওয়ার জন্য যে তাড়াহুড়ো দেখা যেত, সেখানে আর আগের চিত্র নেই। সম্প্রতি এআই-প্রযুক্তির সিসিটিভি ক্যামেরা চালুর পর সরেজমিনে দেখা গেছে, গাড়িগুলো বিভিন্ন মোড়ের জেব্রা ক্রসিং পর্যন্ত যাচ্ছে না কিংবা পথচারীদের রাস্তা পার হওয়ার জায়গা দখল করছে না। অন্তত আগের চেয়ে এই প্রবণতা এখন কম দেখা যাচ্ছে।
আরও অবাক করা বিষয় হলো, গাড়িগুলো সিগন্যাল সবুজ হলেই চলতে শুরু করে, এর আগে না। ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য এটা নতুন এক চিত্র।
যারা প্রতিদিন এই সড়কে যাতায়াত করেন, তাদের কাছে কয়েকদিন আগেও বিশৃঙ্খলা ছিল প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে বিরল সব দৃশ্য। ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত কয়েকটি পয়েন্টে ২৫টি এআই-ক্যামেরা বসানো হয়েছে। নতুন এই প্রযুক্তি ৫ ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করতে পারে। চলতি মাসের শুরুতে চালু হওয়া এই স্মার্ট সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাল বাতি অমান্য, বন্ধ থাকা বাম লেনে প্রবেশ, লেন ভঙ্গ, উল্টো পথে চলাচল ও অবৈধ পার্কিং শনাক্ত করা যায়। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, নতুন সিস্টেম চালু হওয়ার প্রথম সপ্তাহে ৩০০টির বেশি ট্রাফিক মামলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পুরো ঢাকাজুড়ে এই প্রযুক্তি চালু হলে সপ্তাহে মামলার সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। শাহবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, জাহাঙ্গীর গেট ও বিমানবন্দর সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে এআই ক্যামেরা বসানোর পর আরও বেশ কিছু সড়ককে এআই-ভিত্তিক নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা চলছে। কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ে গেলে দেখা যাচ্ছে, সতর্ক চালকরা ক্যামেরা দেখে গাড়ির অ্যাক্সিলারেটর থেকে পা সরিয়ে নিচ্ছেন। রাইড-শেয়ারিং মোটরসাইকেলগুলোকেও যথেষ্ট সাবধানী মনে হচ্ছে। যারা ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চালাতেন, হুটহাট লেন পরিবর্তন করতেন এবং ফুটপাতে মোটরসাইকেল উঠিয়ে দিতেন, এআই ক্যামেরার কারণে তারা দ্বিতীয়বার ভাবছেন।
ট্রাফিক কর্মকর্তারা বলছেন, ভিডিও প্রমাণ থাকায় মামলার ভয়ে চালকদের আচরণগত পরিবর্তন এসেছে। নতুন সিস্টেমে গাড়ির মালিকদের কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলার নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। ডিএমপি জানিয়েছে, নোটিশ উপেক্ষা করলে বিদ্যমান আইনে তলব, এমনকি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হতে পারে। তবে দৃশ্যমান এসব উন্নতি সত্ত্বেও অনেক রাস্তায় নিয়ম লঙ্ঘন চলছেই। উল্টোপথে গাড়ি চালানো, সিগন্যাল অমান্য করা এবং বেপরোয়াভাবে লেন ভাঙার দৃশ্য এখনো কিছু সড়কে চোখে পড়ছে। পথচারীদের অনেকে রাস্তা পারাপারের নিয়ম না মেনে, বিশেষ করে জেব্রা ক্রসিং বা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন।
বাংলামোটর মোড়ে অপেক্ষারত মোটরসাইকেলচালক শরাফত উল্লাহ বলেন, ‘পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। আমি ক্রসিংয়ের আগে লাল বাতি দেখে থামছি এবং অন্যদেরও বলছি। কেউ শুনছে, আবার কেউ শুনছে না। সবার বুঝে উঠতে হয়তো সময় লাগবে।’
কারওয়ান বাজার মোড়ে পথচারী আনিকা তাবাসসুম জানান, ক্রসিংয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আগের চেয়ে বেশি গাড়ি থেমে যাচ্ছে বলে তিনি লক্ষ্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই প্রথম ঢাকার কিছু রাস্তা পার হওয়ার জন্য নিরাপদ মনে হচ্ছে।’
ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সারোয়ার গত সোমবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, আগামী ৬ মাসের মধ্যে রাজধানীর বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এ ধরনের ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে সিস্টেমটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে।