
খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে শয্যা খালি নেই। করিডোর, সিঁড়ির নিচ থেকে শুরু করে যেখানে একটু ফাঁকা জায়গা আছে, সেখানেই গাদাগাদি করে শুয়ে আছেন রোগীরা।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় এই সরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ধারণক্ষমতার প্রায় চার গুণ বেশি রোগী ভর্তি আছেন। কিন্তু শয্যার অভাবে রোগী এবং তাদের স্বজনদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
খুমেক হাসপাতালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গতকাল শনিবার ৫০০ শয্যার বিপরীতে সেখানে ১ হাজার ৯৩৩ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৮৮৮, ২৪ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৯৩৩ এবং ২২ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৯১৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।
পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ ডেঙ্গু রোগীদের। হাসপাতালে তাদের জন্য ৩২টি শয্যা বরাদ্দ থাকলেও ২১ ও ২০ সেপ্টেম্বর ভর্তি ছিলেন ২৪৪ জন এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ছিলেন ২৬৭ জন।
শয্যার অভাব থাকায় অনেক ডেঙ্গু রোগীকে মেডিসিন ওয়ার্ডের বারান্দা বা মেঝেতে অন্যান্য রোগীর সঙ্গেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। করিডোর ও বারান্দায় লোকজনের সার্বক্ষণিক যাতায়াতের কারণে রোগীরা সব সময় মশারি টানিয়ে রাখতে পারেন না। ফলে সেখানে থাকা অন্যান্য রোগী ও তাদের স্বজনরা ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন। বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার শ্রীফলতলা থেকে গত সম্প্রতি অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রাইসা বেগমকে খুমেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন রকিবুল হাসান। বহু চেষ্টার পরও শয্যা না পেয়ে এই দম্পতি তাদের ছোট ছেলেকে নিয়ে সিঁড়ির পাশের একটি ছোট্ট জায়গায় থাকছেন।
রাইসা বলেন, 'যখন এই হাসপাতালে আসি, তখন আমি অজ্ঞান ছিলাম। জ্ঞান ফেরার পর দেখি অবস্থা আরও খারাপ। রোগী, ডাক্তার, স্বজন, নার্স, হকার— সব জায়গায় শুধু মানুষ আর মানুষ। আমাদের পাশেই একটি ময়লার ডিব্বা। যেখান থেকে সারাক্ষণ দুর্গন্ধ আসে।' তিনি জানান, তার মাত্র ১০ ফুট দূরেই তিনজন ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'আমি এমনিতেই অসুস্থ। এই পরিবেশে আমার স্বামী-সন্তানও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অনেক সময় ডাক্তারও পাওয়া যায় না। এক রোগীকে ভালোভাবে দেখার আগেই আরেকজন এসে ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে যায়। আমি স্বামীকে বলেছি আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে, নইলে এখানে থেকে আমি আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ব।' একই করিডোরে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৭৫ বছর বয়সি আরমান শেখ। মাথার ওপরে ফ্যান এবং নিচে শয্যা—কোনোটিই না পেয়ে তার ছেলে আসলাম বাধ্য হয়ে তিন দিন আগে একটি ব্যাটারিচালিত টেবিল ফ্যান কিনেছেন। আরমান শেখ বলেন, 'মাথার ওপর কোনো ফ্যান নেই, বিছানাও পাইনি। তিন দিন গরমে কষ্ট পাওয়ার পর আমার ছেলে এই ফ্যান কিনে এনেছে।' তিনি জানান, আশপাশে ফ্যান চালানোর মতো বৈদ্যুতিক সকেট না থাকায় অন্য জায়গা থেকে ফ্যানের ব্যাটারি চার্জ দিয়ে আনতে হয়। তিনি আরও বলেন, 'মানুষ সারাক্ষণ হাঁটাহাঁটি করায় ধুলোবালি উড়ছে। ধুলোয় শরীর নোংরা হচ্ছে।'
১৯৮৯ সালে ২৫০ শয্যা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত খুমেক হাসপাতালটি ২০০৮ সালে ৫০০ শয্যায় উন্নীত হয়। খুলনা বিভাগ এবং এর আশপাশের জেলার রোগীদের একমাত্র ভরসা এই হাসপাতাল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও এর অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা সে অনুযায়ী বাড়েনি। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, 'তীব্র চাপের মধ্যে কাজ করাটা আমাদের এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আমরা কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে চিকিৎসা দিচ্ছি, তা রোগী এবং তাদের স্বজনরা নিজেদের চোখেই দেখছেন।'
তিনি বলেন, 'বারান্দায় এত বেশি রোগী থাকে যে, চিকিৎসকদের এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে যাওয়ার পথও থাকে না। শয্যা না পেয়ে রোগীরা সিঁড়ির নিচে, করিডোরে, এমনকি লিফটের পাশেও বিছানা পাতছেন।' সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও হাসপাতালের কর্মীরা রোগীদের সার্বক্ষণিক সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ রোগী ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালে চিকিৎসকদের জন্য ২৭৮টি পদ অনুমোদিত রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসক যুক্ত করায় বর্তমানে চিকিৎসকের কোনো ঘাটতি নেই। নার্সদের জন্য ৫১০টি পদের মধ্যে ৪৯২টি পূরণ হলেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের ২১২টি পদ শূন্য রয়েছে।
খুমেক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও উপ-পরিচালক ডা. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, 'সীমিত সামর্থ্য নিয়েই আমরা রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছি। ১০টি জেলার মানুষ এখানে আসেন। এর ফলে সীমিত অবকাঠামোর ওপর বিপুল চাপ পড়ে। এরপরও আমরা সেরা চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি।' ডা. সুজাত আহমেদ মনে করেন, রোগীর এই বিশাল চাপ প্রমাণ করে যে, হাসপাতালের সেবার ওপর মানুষের আস্থা রয়েছে। তবে তিনি বলেন, 'যদি সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি দূর করা যেত, তবে আরও উন্নত সেবা দিতে পারতাম।'