প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৭ জানুয়ারি, ২০২৬
১৯৮০ সালের ১৬ জানুয়ারির কথা। চট্টগ্রাম দোহাজারী সড়ক উপ-বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করি। থাকি সেখানকার পরিদর্শন বাংলোর কক্ষে। দোহাজারী চট্টগ্রাম থেকে সড়কপথে কক্সবাজারের দিকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে শঙ্খ নদের তীরে অবস্থিত বর্ধিষ্ণু ইউনিয়ন। মূল বাজার এলাকা শঙ্খ নদের উত্তর পাড়ে। আর সড়ক উপবিভাগের অফিস এবং অফিস-সংলগ্ন পরিদর্শন-বাংলোটি দক্ষিণপাড়ে অবস্থিত। সেদিকে আরও ছিল একটি পাওয়ার সাবস্টেশন এবং বনবিভাগের প্লাইউড কারখানা। কারখানায় ছিলেন এক বয়স্ক ম্যানেজার। পাওয়ার সাবস্টেশনের কারোর সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। উত্তর পাড়ে ছিল একটি সরকারি হাসপাতাল, একটি হাইস্কুল এবং বিআইডব্লিউটিএ আর বিএডিসি-এর কমপ্লেক্স। হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন কয়েকজন ডাক্তার। বিআইডব্লিউটিএ-তে ছিলেন তিনজন অফিসার আর বিএডিসিতে একজন ইঞ্জিনিয়ার। এদের বিবাহিতরা পরিবার নিয়ে থাকতেন। আমাদের আড্ডা জমত বিআইডব্লিউটিএ-এর কমপ্লেক্সে। কমপ্লেক্স-চত্বরের পশ্চিম এবং উত্তর দিকে ছিল দিগন্ত বিস্তৃত ফসলি মাঠ। ছোট বিলের মতো একটি জলাধারও ছিল। গ্রীষ্মের দুপুরে দূরে ওই বিস্তৃত মাঠের দিকে তাকালে তপ্ত রোদে তেতে ওঠা বাতাস চিকচিক করে দিগন্তে অনবরত ঢেউ খেলানো আবছা জলের ধারা বলে ভ্রান্তির সৃষ্টি করত। শরতে সেখানে অবারিত হাওয়ায় দোল খাওয়া ধানখেতে রৌদ্রছায়ার খেলা আর নীলাকাশে সাদা মেঘের ভেলা রবীন্দ্রনাথের গানের সেই ধানের খেতে রৌদ্রছায়ার লুকোচুরি খেলাকেই মনে করিয়ে দিত। সে এক অনির্বচনীয় অপূর্ব দৃশ্য ছড়িয়ে থাকত সেখানকার দৃশ্যমান আকাশ আর দিগন্তজুড়ে। কমপ্লেক্সটিও ছিল দারুণ পরিচ্ছন্ন এবং গোছানো।
মন ভালো করার সুন্দর টনিক : একটি চমৎকার রেস্টহাউস ছিল। সেখানে ছিল আড্ডা দেওয়ার কক্ষ। শীতকালে খেলাধুলা করারও জায়গা ছিল। অতি মনোরম পরিবেশ। বিএডিসি-এর কমপ্লেক্সও ছিল বেশ চমৎকার, পরিকল্পিত এবং গোছানো। হাসপাতাল কমপ্লেক্স যেমন হওয়ার কথা, তেমনই ছিল। বনবিভাগের কারখানাটিও মন্দ ছিল না। কেবল আমাদের জায়গাটি ছিল খুবই অগোছালো, পুরোনো মালামালে ভর্তি। আমার মানসিকতার সঙ্গে খাপ খেত না। তবু চাকরির জন্য সেখানে থাকতে হতো। তবে বাংলো-সংলগ্ন উত্তর দিকে ভালো লাগার একটি গোলাপ বাগান ছিল। আর ছিল কিছু বৃহৎ ছায়াতরু। সেগুলো ছায়া দিয়ে পরিবেশকে শীতল করে রাখত। আরও ছিল পশ্চিম দিকে আমার কক্ষ-সংলগ্ন একটি সাধারণ পুকুর। জানালার নেট ভেদ করে পরিষ্কারভাবেই সেটি দেখা যেত। কিন্তু নেটের কারণে বাইরে থেকে কক্ষের ভেতরে কিছুই দেখা যেত না। অবিরাম শ্রাবণধারায় কাকচক্ষু জলে পুকুরটি হঠাৎ এমন টলমল আর স্নিগ্ধ হয়ে উঠত যে, তখনই তাতে ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করত। মন ভালো করার জন্য গোলাপ বাগানে বসতাম। বাগানটি আমার মনের টনিক হিসেবে কাজ করত। কিন্তু কক্সবাজারের আমার নির্বাহী প্রকৌশলী বাগানের জায়গায় বাংলোর কক্ষ বাড়ানোর জন্য নির্দেশ দিয়ে বসলেন। বাগান নষ্ট করার পক্ষপাতী না থাকায় দীর্ঘদিন সেটা বাস্তবায়ন করিনি। তবে একপর্যায়ে চাপের মুখে আমাকে সেটা আরম্ভ করতে হয়। আমার মন ভালো করার টনিক নষ্ট হয়ে গেল। নির্বাহী প্রকৌশলী কাজটি বিভাগীয়ভাবে করতে বলায় আমার থাকাকালে কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দারুণভাবে টানত : যেদিন দোহাজারীতে থাকতাম, বিকালে আড্ডা দিতে বিআইডব্লিউটিএ-এর কমপ্লেক্সে চলে যেতাম। কিছু কেনাকাটার জন্য কখনও চট্টগ্রামে যেতাম। সরকারি কাজের জন্য আধা পাহাড়িপথে কক্সবাজারেও যেতে হতো মাঝে-মধ্যে। আমি ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে না পারলে ভর্তি হব চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে দারুণভাবে টানত বলেই এমন সিদ্ধান্ত। কোনো দিনও ভাবিনি আমি শুষ্ক-ধুলিময় উত্তপ্ত রাজশাহীতে পড়ব। চট্টগ্রাম আর রাজশাহী দুই জায়গাতেই আমি ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলাম। কিন্তু মানুষ যা চায় তা সব সময় পায় না। যেকোনো কারণেই হোক আমি ভর্তি হলাম রাজশাহীতে। কিন্তু আমার সৌভাগ্যই বলতে হবে, চট্টগ্রামের সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তিলে তিলে উপভোগ করার সুযোগ আমার এলো দুবার। মাঠপর্যায়ে কাজ করার একদম শুরুতে এবং পরে একদম শেষে, যেখান থেকে আমি অবসরে যাই।
শরতের অপার সৌন্দর্য উপভোগ : দোহাজারী থাকতে একদিন কক্সবাজারে যাওয়ার পথে সড়কের ডান দিকে দেখা গেল ছোট্ট শীর্ণ, তবে শোভাময় একটি পাহাড়ী নদী এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে তার গন্তব্যে। তখন ছিল শরৎকাল। শরতের প্রকৃত রূপ আমার তখনও দেখা হয়নি। নদীটির দিকে হঠাৎ তাকিয়ে আমি অবাক হয়ে থেমে গেলাম। শরৎ তো এভাবে নিজেকে চেনাতে কখনও আমার সামনে হাজির হয়নি। নদীর পাড় বরাবর জমিতে প্রস্ফুটিত শুভ্র কাশফুলের কী অপরূপ সমারোহ! শরতের পাগল করা বাতাসে কাশফুলগুলো নদীর ঢেউয়ের মতো দুলে দুলে উঠছে। নদীর পেছনে সবুজ পাহাড়। চারদিকে নির্মল হাওয়ায় নরম রোদ স্বচ্ছ কাঁচের মতো চিকচিক করছে। এই তো শরৎ! কোনো দিনই তো শরৎকে এভাবে দেখিনি। আমার দৃষ্টি চলে গেল দূর আকাশে। কী নীলাঞ্জনে আঁকা আকাশ! তার মধ্যে পেঁজা পেঁজা শুভ্র তুলোর মতো ভেসে যাচ্ছিল মেঘ। আহা! এই তো তুমি শরৎ। আজ তোমার প্রকৃত রূপ দেখে হৃদয় হলো চঞ্চল। আমি চারদিকে তাকালাম আর শরৎ-আলোয় আমার হৃদয়-মন জুড়িয়ে গেল। আমাকে পেয়ে বসল রোমান্টিকতায়। আমি গাড়ি থেকে নেমে একগুচ্ছ কাশফুল তুলে নিলাম। কী আশ্চর্য সৌন্দর্য ঝরে পড়ছিল আমার হাতের সেই শরতের কাশফুল থেকে! এসব মনে করে আজও আমি শরতের সেই অপার সৌন্দর্য উপভোগ করি। সত্যি, সেদিনই শুধু আমি চিনেছিলাম প্রকৃতির শরৎকে।
ছিপছিপে গড়নের শতবর্ষী গাছের গল্প : এ পথে হারবাং-এর ঢাল পার হতে ডানে-বামে দৃশ্যমান হতো আকাশ ছুঁতে চাওয়া ছিপছিপে গড়নের প্রচুর শতবর্ষী বৃক্ষ। বৃক্ষগুলো কালের সাক্ষী। নিজের শোভার গর্বে যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি পড়লে প্রাণ জুড়িয়ে যেত। বৃক্ষ আর মানুষ তো পরস্পরের ভালো বন্ধু। একজনের দূষিত বায়ু অন্যজন গ্রহণ করে জীবন নিরাপদ করে। আমার একটি সেকশন অফিস ছিল চুনতিতে। পথের ধারেই অফিস। সেই অফিস এলাকার আশপাশে রাস্তার ধারে ছিল বেশকিছু দারুণ শোভিত পাহাড় বা টিলা। হঠাৎ একদিন দেখলাম, কোনো কোনো পাহাড়ের কিছু মাটি কাটা। তাতে পাহাড়ের সৌন্দর্যের হানি ঘটেছে। পাহাড়ের মাটি কাটার বিষয়ে আমার সেকশন অফিসারকে জিজ্ঞেস করলাম। জানা গেল, আশপাশের মানুষেরা পাহাড়ের মাটি কাটে। বললাম, একদমই পাহাড়ের মাটি কাটতে দেবেন না। আর যে অংশে মাটি কাটা হয়েছে, সেটা ভরাট করার ব্যবস্থা নিন। আমার নির্দেশের কারণে আমার স্টাফরা ওইসব পাহাড়ের মাটি আর কাটতে দিত না কাউকে।
সময়ের পালাবদলে বদলেছে সব : ২০০৯ সালে আবার বদলি হয়ে অ্যাডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এলাম চট্টগ্রামে। পুরোনো জায়গায় এসে আমি নস্ট্যালজিক হচ্ছি। দেখতে চাইছি আমার দেখা সেসব জায়গা, রাস্তা, সেতু আর অবকাঠামো। আমি ফিরে যাচ্ছি ২৯ বছর পেছনে। কিন্তু চাইলেই তো যাওয়া যাবে না; সে যে অতীত! অতীতে যাওয়া যায় না। তাকে ধরাও যায় না। ধরা যায় শুধু ভবিষ্যৎকে। তবু আমি অতীত দেখতে চাইছি। কোথায় ছিলাম আমি? পরিদর্শন বাংলোর সেই কক্ষটি খুঁজলাম। সবাই বলল, ‘এই ঘর।’ আমি সেই ঘরটি চিনতে পারলাম না। সব বদলে গেছে। সেটি হয়েছে অফিস রুম। একটি অগোছালো নোংরা অফিসকক্ষ। সেখানে এলোমেলোভাবে রাখা হয়েছে অফিসের নানা সামগ্রী। অথচ এ কক্ষটি সেখানকার সামান্য সম্পদ দিয়ে সে সময় কী নিপুণভাবেই না গুছিয়ে রেখেছিলাম।
বৃক্ষের দুর্দশা মানে মানুষের দুর্দশা : প্রকৃতিবিনাশী দৃশ্য দেখে আমার প্রাণ কেঁদে উঠল। আমি প্রকৃতিপ্রেমী; সুন্দরের পূজারী। আল্লাহ-সৃষ্ট সুন্দরকে উন্নয়নের নামে আমরা হনন করে চলেছি। আমি চুনতির রাস্তার ধারের একটি পাহাড়ও আর খুঁজে পেলাম না। ওদিকে হারবাং-ঢালের চারদিকের সেসব আকাশ স্পর্শ করতে চাওয়া অহংকারী বৃক্ষগুলোর একটিরও চিহ্ন আর নেই। যে বৃক্ষের শোভা অবলোকনে হৃদয়-মন কেমন জুড়িয়ে যেত! সেসব বিনাশ হয়েছে চিরদিনের জন্য। অথচ বৃক্ষের দুর্দশা মানে মানুষেরই দুর্দশা। এসব বাঁচিয়ে রেখে কি সড়ক উন্নয়ন করা যেত না? আমাদের উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু সেটা প্রকৃতিকে নিহত করে নয়; তাকে বাঁচিয়ে রেখে করতে হবে। নইলে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের অনেক কিছুই আমাদের হারাতে হবে।
লেখক : অ্যাডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার, সওজ (অব.)