প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৭ জানুয়ারি, ২০২৬
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়তকাল থেকে খেলাফতের সময়কাল পর্যন্ত ইসলামি সমাজ ও সভ্যতা গঠনের এক যুগান্তকারী অধ্যায় ছিল। এ সময়ে আরব সমাজের প্রচলিত গোত্রভিত্তিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয় এবং ইসলামের নৈতিক ও সামাজিক আদর্শ ধীরে ধীরে সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রভাব বিস্তার করে। এ রূপান্তর শুধু আরব উপদ্বীপে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য ন্যায়, সমতা ও জ্ঞানভিত্তিক এক চিরন্তন আদর্শ সমাজের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে।
ইসলামপূর্ব আরব সমাজ : ইসলামপূর্ব আরব সমাজ প্রধানত গোত্রভিত্তিক ও উপজাতিগত কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব আইন, রীতিনীতি ও সামাজিক শৃঙ্খলা বিদ্যমান ছিল। গোত্রীয় শক্তির ভিত্তিতে ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর সামাজিক ও আইনি অবস্থান দুর্বল ছিল। যদিও কিছু গোত্রে সীমিত ব্যতিক্রম দেখা যেত। দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল। সামাজিক বৈষম্য ও গোত্রীয় সংঘাত ছিল সাধারণ বাস্তবতা। (সিরাতে ইবনে হিশাম : ১/৪৫-৭২)।
ইসলামের আগমন ও বদল : রাসুলুল্লাহ (সা.) ইসলামের মাধ্যমে তাওহিদ, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার শিক্ষা প্রচার করেন। কোরআন মানুষের নৈতিক সমতা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ওপর গুরুত্বারোপ করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি; যেন তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে সম্মানিত, যে সবচেয়ে তাকওয়াশীল। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছু অবহিত।’ (সুরা হুজুরাত : ১৩)। দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সহমর্মিতা এবং নারীর মর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি দাসপ্রথায় নিরুৎসাহিত করে ধাপে ধাপে বিলোপের নৈতিক ও সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়।
সামাজিক কাঠামো ও পরিবারব্যবস্থা : ইসলামে পরিবারকে সমাজের মৌলিক একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও নারীর অধিকার ও মর্যাদা সুস্পষ্ট কোরআনি বিধানের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। বিয়ে, তালাক ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধান সমাজে ন্যায় ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘পুরুষদের জন্য আছে যা তাদের পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়গণ পরিত্যাগ করে গেছেন তার একটি অংশ এবং নারীদের জন্যও আছে যা তাদের পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়গণ পরিত্যাগ করে গেছেন তার একটি অংশ- অল্প হোক বা বেশি, নির্ধারিত অংশ।’ (সুরা নিসা : ৭)। আত্মীয়তা ও গোত্রীয় সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও ইসলামের শিক্ষায় গোত্রসীমা অতিক্রম করে ঈমানভিত্তিক ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় মোমিনরা পরস্পর ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপন কর এবং আল্লাহকে ভয় কর; যেন তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা হুজুরাত : ১০)।
নারীর অবস্থান ও অধিকার : ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীর সামাজিক ও আইনি অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়। নারী সম্পত্তির মালিকানা, উত্তরাধিকার এবং বিয়ে ও তালাক বিষয়ে স্বতন্ত্র অধিকার লাভ করে। খাদিজা (রা.)-এর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং আয়েশা (রা.)-এর হাদিস ও ফিকহে অবদান ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীর সক্রিয় সামাজিক ভূমিকার বাস্তব দৃষ্টান্ত। (তবাকাতে ইবনে সাদ : ৮/১৫-৫০)।
অর্থনৈতিক জীবন ও বাণিজ্য : ইসলামের প্রাথমিক যুগে বাণিজ্য আরব সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল এবং মক্কা একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। (আর-রাহিকুল মাখতুম : ১৪৩)।
ইসলামের শিক্ষায় বাণিজ্যে সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও প্রতারণা পরিহারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। জাকাত ও সদকা সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়। পাশাপাশি সুদ নিষিদ্ধকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক শোষণ রোধের নৈতিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা সুদ খায়, তারা কেয়ামতে শয়তানের স্পর্শে পাগল ব্যক্তির মতো উঠবে। আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন।’ (সুরা বাকারা : ২৭৫-২৭৬)।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন : ইসলামের প্রাথমিক যুগে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সামাজিক সংস্কৃতির কেন্দ্রে অবস্থান করে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজান মাসের সিয়াম ও হজ মুসলিম সমাজে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও সামষ্টিক পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোরআন-সুন্নাহ ব্যক্তিগত আচরণ ও সামাজিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের প্রধান নৈতিক মানদ-ে পরিণত হয়। (ফিকহুস সুন্নাহ : ১/৮০)।
শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা : ইসলামি সমাজে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইলম অর্জনকে ফরজ হিসেবে ঘোষণা করেন, ‘জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪)। এ ছাড়া কোরআনের প্রথম নাজিলকৃত আয়াতই ছিল জ্ঞানার্জনের নির্দেশ, ‘পড় তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক : ১)। মসজিদ ইবাদতের স্থান নয় শুধু; বরং শিক্ষা, আলোচনা ও বিচারকার্যের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। মদিনায় মসজিদে নববিতে ‘আসহাবে সুফফা’ নামে একটি আবাসিক শিক্ষাগোষ্ঠী গড়ে ওঠে, যেখানে রাসুল (সা.) নিজে পড়াতেন। নারীদের জন্য আলাদা দিন নির্ধারণ করে শিক্ষা দেওয়া হতো। (বোখারি : ১০১)। বদর যুদ্ধের বন্দীদের মুক্তির শর্ত হিসেবে মুসলিম শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। (বোখারি : ৩০০৯)। এভাবে জ্ঞানচর্চা সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী মুসলিম সভ্যতার শক্তিশালী ভিত্তি রচনা করে।
সামাজিক ন্যায়বিচার ও দায়িত্ববোধ : ইসলামের প্রাথমিক সমাজে সামাজিক ন্যায়বিচার একটি মৌলিক আদর্শ ছিল। অনাথ, বিধবা ও অসহায়দের সুরক্ষা ইসলামের নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না।’ (সুরা দুহা : ৯)। দাসমুক্তি, দানশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে। কোরআন ‘(জান্নাতের) কঠিন পথ’ অতিক্রমের উপায় হিসেবে দাসমুক্তিকে সর্বোত্তম কাজ বলে উল্লেখ করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সে কঠিন পথ অতিক্রম করেনি। আর তোমাকে কী জানাব কঠিন পথ কী? দাসমুক্ত করা অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে অন্নদান করা, নিকটাত্মীয় এতিমকে অথবা ধুলি ধূসরিত মিসকিনকে।’ (সুরা বালাদ : ১১-১৬)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও, রোগীকে দেখতে যাও এবং বন্দীকে মুক্ত কর।’ (বোখারি : ৫৬৪৯)। ইসলামের প্রাথমিক যুগের সামাজিক সংস্কৃতি ও জীবনধারা আরব সমাজে এক গভীর ও স্থায়ী রূপান্তর ঘটায়। গোত্রভিত্তিক ও বৈষম্যমূলক কাঠামো ধীরে ধীরে ন্যায়, মানবিকতা ও নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থায় রূপ নেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শিক নেতৃত্ব এবং খলিফাদের বাস্তবমুখী শাসন এ পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে; যা পরবর্তী মুসলিম সভ্যতার ভিত্তি রচনা করে। (মুকাদ্দিমায়ে ইবনে খালদুন : ১/২৫০-২৮০)।