প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬
মানুষের জন্য কোন বিধান এবং কোন কাজটি কল্যাণকর- এটা নির্ধারণ করার মানদ- কী হবে? এ ব্যাপারে ইসলাম এবং নিছক বস্তুবাদী ধারণাগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বস্তুবাদী ধারণামতে, যে বস্তুই সাময়িক প্রশান্তি ও আনন্দ সৃষ্টি করবে, সেটিই ‘কল্যাণ’ হিসেবে গৃহীত হবে; পরিণাম ও ফলাফলের বিচারে তাতে যত অকল্যাণ ও ক্ষতিই থাকুক। উদাহরণ হিসেবে নর-নারীর বিয়েবহির্ভুত সম্পর্কের কথা বলা যায়। এটি মানুষকে আত্মিক আনন্দ ও দৈহিক প্রশান্তি দেয়; কিন্তু ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে এর অনিষ্টতা প্রকাশিত হয় বহুমাত্রিকভাবে। তবু বস্তুবাদী ধারণায় একে কল্যাণবিরোধী বা অকল্যাণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় না।
কেননা, সবকিছুর পরেও এটি ভোগ, আনন্দ ও প্রশান্তির উপকরণ। বস্তুবাদী ধারণায় ধর্ম ও পরকাল চিন্তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। অপরদিকে ইসলামি শরিয়ামতে কল্যাণের বিষয়টি আল্লাহতায়ালা ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস এবং প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে ইসলামি শরিয়ায় অনেক বিধানের ক্ষেত্রে যেমন পার্থিব কল্যাণের দিকটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, অপরদিকে এমন অনেক বিধানও রয়েছে, যেগুলোতে ধর্মীয় ও নৈতিক কল্যাণ রক্ষার্থে পার্থিব ও বস্তুবাদী কল্যাণকে সাময়িকভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।
যেমন- হজ ফরজ করা হয়েছে। এটি পালন করতে সফরের ক্লান্তি সহ্য করতে হয়, বিপুল টাকা-পয়সা ব্যয় করতে হয়। আবার কনকনে শীতের রাতেও ওজু-গোসলের বিধান দেওয়া হয়েছে। বড় বড় কিছু অপরাধের জন্য দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। সন্দেহ নেই, এ প্রতিটি কাজেই ব্যক্তির সামান্য হলেও বস্তুগত ক্ষতি ও অকল্যাণ রয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, এসবের কল্যাণ ক্ষতি থেকে বহুগুণ বেশি। মূলত এ কারণেই ইসলামের মহান ফকিহ, ইমাম ও মুজতাহিদগণ শরিয়ার সমস্ত বিধান পূর্ণরূপে পর্যালোচনা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করে বলেছেন, ‘শরিয়ার উদ্দেশ্যগুলো পাঁচটি- দ্বীন, জীবন, বুদ্ধি, বংশ ও সম্পদ সংরক্ষণ করা। যা কিছু এ পাঁচটি বিষয়কে সংরক্ষণ করে, তা-ই কল্যাণ এবং যা কিছু এ পাঁচটি বিষয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তা-ই অকল্যাণ, অনিষ্ট ও ক্ষতি।’
ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের সংজ্ঞা : ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র হলো এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি দিয়ে পরিচালিত হয়। কোরআন-সুন্নাহকে নীতি ও আইন প্রণয়নের মূল উৎস হিসেবে গ্রহণ করে। যার কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হলো, মানবকল্যাণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। এটি কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক বা সম্পূর্ণ সেক্যুলার রাষ্ট্র নয়; বরং একটি নৈতিক, জবাবদিহিমূলক এবং মানবকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে শাসক রাষ্ট্রক্ষমতাকে আল্লাহর বিধানের আলোকে পরিচালিত করে জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করে।
ইমাম গাজালি (রহ.) রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হিসেবে মানুষের পাঁচটি মৌলিক বিষয় চিহ্নিত করেছেন- দ্বীন, জীবন, বুদ্ধি, বংশধারা ও সম্পদের সংরক্ষণ। যে রাষ্ট্র এ লক্ষ্য অনুযায়ী নীতি ও বিধান প্রণয়ন করে, তা ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য। ইমাম শাতেবি (রহ.)-এর মতে, ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, মানুষের কল্যাণ সাধন ও অকল্যাণ অপসারণ। রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা, আইন প্রণয়ন ও সামাজিক নীতিগুলো এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর হয়। ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) রাষ্ট্রকে এমন একটি কাঠামো হিসেবে দেখেছেন, যা ইনসাফ, ন্যায়, মানবাধিকার ও সামাজিক কল্যাণ বজায় রাখে।
অর্থাৎ আল্লাহর মনোনীত জীবনব্যবস্থানির্ভর নৈতিক ও সামাজিক আদর্শকে রাষ্ট্রব্যবস্থায় কার্যকর করে। সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন (রহ.) রাষ্ট্রকে একটি সামাজিক ও নৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেছেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হলো মানবকল্যাণ কল্যাণ নির্ধারণের মানদ-নিশ্চিত করা এবং সমাজে স্থিতিশীলতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে শাসক জনগণের কল্যাণের জন্য দায়িত্বশীল এবং ক্ষমতা মানুষের সেবা ও ন্যায়বিচারের জন্য ব্যবহৃত হয়। ইবনে খালদুনের মতে, রাষ্ট্রের কার্যকরী নীতি ও আইন অবশ্যই সমাজের নৈতিক ভিত্তি এবং মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করবে।
শরিয়ার আলোকে কল্যাণ রাষ্ট্রের লক্ষ্য : ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো ‘মাকাসিদুশ শরিয়া’, যা শরিয়তের উদ্দেশ্যসমূহকে নির্দেশ করে। ইসলামি শাসনব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং মানুষের ধর্ম, জীবন, বুদ্ধি, বংশধারা ও সম্পদ সংরক্ষণ করা। এ কারণে মাকাসিদুশ শরিয়া রাষ্ট্রনীতির কাঠামো ও কল্যাণনৈতিক নীতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
মাকাসিদুশ শরিয়া সাধারণত পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা করা হয়- ১. ধর্মের সংরক্ষণ। অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ইসলামি বিধান সুরক্ষা নিশ্চিত করে। নাগরিকদের দ্বীন পালন, ইবাদত ও নৈতিক জীবনযাপন করার সুযোগ সৃষ্টিতে রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল করা হয়। ২. জীবনের সংরক্ষণ। অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো, মানুষের জীবন রক্ষা করা। অপরাধ, সহিংসতা, অত্যাচার ও যেকোনো ধরনের হুমকি থেকে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক। ৩. বিবেক-বুদ্ধির সংরক্ষণ। অর্থাৎ শিক্ষা, জ্ঞানার্জন ও গবেষণা প্রচার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে সমর্থন দিয়ে নাগরিকদের বুদ্ধি ও জ্ঞান বিকাশে সাহায্য করা। ৪. বংশধারা সংরক্ষণ। অর্থাৎ পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের সুরক্ষা, নারী ও শিশুর অধিকার রক্ষা, সামাজিক ন্যায় ও নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ৫. সম্পদের সংরক্ষণ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ন্যায় ও সামাজিক সমতা নিশ্চিত করা, দারিদ্র?্য বিমোচন, জাকাত ও বাইতুল মালের মাধ্যমে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এর মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। শরিয়তের এ পাঁচটি মূল উদ্দেশ্য ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্র ক্ষমতা শুধু প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের জন্য নয়, বরং মানুষের ধর্ম, জীবন, বুদ্ধি, বংশধারা ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে সমাজে ন্যায়, শান্তি ও পূর্ণাঙ্গ কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সেক্যুলার কল্যাণ রাষ্ট্রের তুলনায় অধিক স্থায়িত্বপূর্ণ ও নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক ভিত্তি মূলত মাকাসিদুশ শরিয়ায় নিহিত। মাকাসিদুশ শরিয়া মানুষের কল্যাণ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে কাজ করে।
লেখক : পরিচালক, মাকাসিদ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ;
আমির, পয়ামে ইনসানিয়াত বাংলাদেশ