ঢাকা শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

উপকূলীয় নারীদের জীবন বদলে দিল কাঁকড়ার খামার

উপকূলীয় নারীদের জীবন বদলে দিল কাঁকড়ার খামার

সকাল হতে না হতেই শুরু হয় নারীদের কর্মযজ্ঞ। মৎস্য ঘেরের পানির উপর ভাসমান প্লাস্টিকের বক্সে রাখা কাঁকড়ার খাদ্যের জন্য কেউ দা ও বঁটি দিয়ে ছোট ছোট তেলাপিয়া মাছ কাটছেন, কেউবা পানির উপর ভাসমান সারি সারি বক্স চেক করছেন, কেউ আবার প্রতিটি বক্সের ভিতরে এক পিস করে টুকরো মাছ দিচ্ছেন। আবার কয়েকজন মিলে খোলস পাল্টানো কাঁকড়াগুলো আলাদা করছেন বিক্রির জন্য।

সরজমিনে দেখা যায়, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকার নারীরা এভাবেই তাদের দিন শুরু করেন। এই কাঁকড়া খামারে কাজ করেই তারা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছেন। ঘূর্ণিঝড়, আইলা ও সিডরের আগে, অবহেলিত এই অঞ্চলের নারী ও পুরুষরা সুন্দরবনের নদীতে জাল ঠেলে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু এখন আর তাদের কুমির ও বাঘের সঙ্গে লড়াই করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনের নদীতে নামতে হচ্ছে না। উপকূলীয় এই উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নে এখন গড়ে উঠেছে মৎস্য ঘেরের পাশাপাশি অসংখ্য সফট শেল কাঁকড়ার খামার। আর এই খামারে কাজ করে তারা তাদের সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের ভালোভাবে লেখাপড়াও শেখাচ্ছেন। বদলে ফেলেছে তারা তাদের জীবনযাত্রা। এর ফলে এই কাঁকড়া খামারগুলো খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় অসংখ্য নারী-পুরুষের। কাঁকড়া ফার্মের শ্রমিক অনিমা মন্ডল জানান, তিনি ও তার স্বামী কাঁকড়া খামারে কাজ করে তাদের দুটি সন্তানকে ভারতে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। সেখানে ৫ কাঠা জমিও ক্রয় করেছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন আর কাজ করতে পারবেন না তখন তারা ছেলে-মেয়েদের কাছে গিয়ে থাকবেন। কাঁকড়া খামারে কাজ শুরু হওয়ার পর তিনিসহ অন্যান্য নারীরা শুধু আয় করছেন না, নিজেদের মূল্যবোধও ফিরে পেয়েছেন। আগে তাদের স্বামীর কাছে হাত পাততে হতো। এখন নিজেই আয় করে ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি স্বামীর হাতে তুলে দিচ্ছেন। গ্রামের মানুষও এখন তাদের সম্মানের চোখে দেখে।

কাঁকড়া খামারের নারী শ্রমিক শরদিনী মন্ডল জানান, সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ঘণ্টায় ৩০ টাকা করে, দিন শেষে কেউ পাচ্ছেন ৩০০ টাকা, আবার কেউ পাচ্ছেন ৪০০ টাকা। যে যত বেশি সময় দেন, সে তত বেশি টাকা মজুরি পান। এতে তারা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে ভালোই আছেন। টুম্পা মন্ডল জানান, ঘূর্ণিঝড় আইলা ও সিডরের আগে তারা কুমির ও বাঘের সঙ্গে লড়াই করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনের নদীতে জাল ঠেলে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন তাদের দিন বদলেছে। এখন তারা কাঁকড়া খামারে কাজ করে ঘণ্টায় ৩০ টাকা করে মজুরি পান। যে যত বেশি সময় ধরে কাজ করবেন সে তত বেশি মজুরি পাবেন। দিনে তারা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পান। এতে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারেন। তিনি আরও জানান, তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই কাঁকড়া ফার্মে কাজ করেন। দুইজন মিলে যে টাকা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালানোর পর সন্তানদের ভালো স্কুলে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। সুন্দরবনের পাড় ঘেঁষা উপকূলীয় এই এলাকার নারী-পুরুষ এখন সফট শেল কাঁকড়া চাষের খামারে কাজ করে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি বদলে ফেলেছেন তাদের জীবনযাত্রা।

কাঁকড়া ফার্মের শ্রমিক সুদেশ মন্ডল জানান, শক্ত খোলসের কাঁকড়া প্রথমে বক্সে দেওয়া হয়। এরপর ১০-১৫ দিন পর সেটি খোলস বদলে পরিণত হয় নরম খোলসের কাঁকড়ায়। তখন তা তুলে বাজারজাত করা হয়। এর মধ্যে এ গ্রেডের সবচেয়ে নরম কাঁকড়া ১০০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। বি গ্রেডের কাঁকড়া, যেটি খুব নরম নয় আবার খুব বেশি শক্তও নয়, সেটি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়। আর সি গ্রেডের কাঁকড়া যেটি একটু তুলনামূলক শক্ত ও যার পা নেই, হাত নেই এরকম কাঁকড়া ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। এই কাঁকড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের কাছ থেকে নিয়ে প্যাকেটজাত করে বিদেশে রপ্তানি করে। বুড়িগোয়লিনী বি ডি সফট ক্র্যাব অ্যাগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল কাইয়ুম আবু বাসসকে বলেন, বুড়িগোয়ালিনী একটি উপকূলীয় এলাকা। আর এই উপকূলীয় এলাকায় সফট শেল কাঁকড়া ফার্ম তৈরি হওয়ায় এই এলাকার অবহেলিত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীদের সেখানে কাজের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি তারা স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এছাড়া যারা এই এলাকায় বেকার ছিল তাদেরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি দারিদ্রের হাত থেকে মুক্ত হয়েছে। তিনি আরও জানান, যার ফার্মে ১০ হাজার কাঁকড়া বক্স রয়েছে তারা বছরে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা লাভ করতে পারেন। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিএম সেলিম জানান, জেলায় চিংড়ির পাশাপাশি কাঁকড়ার উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাৎসরিক কাঁকড়ার উৎপাদন সাড়ে তিন হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে যেটা সফট শেল সেটা শতভাগ সাতক্ষীরাতেই হয়। সাড়ে সাতশ মেট্রিক টন কাঁকড়া বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি ভালো দিক। এটা আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজন। তবে, বর্তমানে কাঁকড়া বীজটা পেতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। কারণ জুন, জুলাই এবং আগস্ট এই তিন মাস বনবিভাগের নিষিদ্ধের কারণে চাষিরা এটা আহরণ করতে পারে না। এতে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হন চাষিরা। এরপর আবার জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসেও বনবিভাগের একটি ইন্সট্রাকশন রয়েছে। এ সময়ও চাষিরা কাঁকড়া বীজ আহরণ করতে পারেন না। এর জন্য আমরা সরকারি ও বেসরকারি হ্যাচারি করতে পারি, সেক্ষেত্রে সুবিধা হবে। সরকারিভাবে এরইমধ্যে ট্রায়ালে রয়েছে। সরকারি-বেসরকারিভাবে যদি কাঁকড়া উৎপাদন করা সম্ভব হয়, তাহলে উপকূলীয় এলাকার জীবন জীবিকার আরও বড় সুযোগ তৈরি হবে। তিনি আরও বলেন, কাঁকড়া শিল্প নারী শ্রমিকদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তারা শুধু পরিবারকেই বাঁচাচ্ছেন না, স্থানীয় অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত