ঢাকা মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ঈদের পরও শেয়ারবাজারে সবুজ ধারা অব্যাহত

ঈদের পরও শেয়ারবাজারে সবুজ ধারা অব্যাহত

ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটি শেষে দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ছুটির আগে টানা পাঁচ কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর ঈদের পর প্রথম কার্যদিবসেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ায় বাজারে সবুজ ধারার দেখা মিলেছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

ঈদের পর প্রথম কার্যদিবস গতকাল সোমবার প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ায় মূল্যসূচকও বেড়েছে। একই সঙ্গে ডিএসইতে বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণ। এর মাধ্যমে টানা ছয় কার্যদিবস শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখিতার দেখা মিললো। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময়ের মন্দাভাবের পর বাজারে ধীরে ধীরে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। বিক্রির চাপও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। নতুন নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে সক্রিয় হচ্ছেন। ফলে বাজারে ক্রেতা বাড়ছে। এতে লেনদেনের গতিও বাড়তে দেখা যাচ্ছে। এই ইতিবাচক ধারা টেকসই করতে হলে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি। ডিএসইর এক সদস্য বলেন, প্রতিবছরই ঈদের আগে কয়েক কার্যদিবস শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। তবে ঈদের পর প্রথম কার্যদিবস দরপতন দেখা যেত। এবার সেটা হয়নি। ঈদের আগের মতো ঈদের পরও শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার দেখা মিললো। এটা খুবই ইতিবাচক। তিনি বলেন, বাজারের আচরণ বলছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ধীরে ধীরে আস্থা ফিরে আসছে। আগামী কয়েক কার্যদিবস এই ধারা অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। তবে আগামী অর্থবছরের বাজেট শেয়ারবাজারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য ইতিবাচক বিষয় থাকলে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য। ডিএসইর আরেক সদস্য বলেন, বর্তমান সরকার শেয়ারবাজারকে যে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তা অর্থমন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেই শেয়ারবাজার নিয়ে আশার সঞ্চার হচ্ছে। এখন দেখার বিষয় আগামী বাজেটে অর্থমন্ত্রী শেয়ারবাজারের জন্য কী রাখেন। এখন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কতটা নিরাপদ? এমন প্রশ্ন রাখা হয় ডিএসইর পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিওর কাছে। উত্তরে তিনি বলেন, শেয়ারবাজার কখনোই পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিশ্বজুড়েই শেয়ারবাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, শেয়ারের দাম প্রতিদিনই ওঠানামা করে এবং অনেক সময় স্বল্পমেয়াদে এর পেছনে দৃশ্যমান কোনো কারণও থাকে না। তবে বিনিয়োগকারীরা মূলত কোনো কোম্পানির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনার ওপর আস্থা রেখেই শেয়ার কেনেন। তিনি বলেন, সঠিক কোম্পানি বাছাই, পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিনিয়োগ করা গেলে শেয়ারবাজার এখনও বিনিয়োগের একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র। তবে বিনিয়োগের আগে কোম্পানির মৌলভিত্তি ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে এখনও পর্যাপ্ত সংখ্যক শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন (ফান্ডামেন্টাল) কোম্পানির অভাব রয়েছে। বাজারে আরও বড় ও ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি প্রয়োজন। কারণ, বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা বিদেশি বিনিয়োগকারী বাজারে এলে তাদের বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন শেয়ার সবসময় পাওয়া যায় না। বিনিয়োগকারী মো. মিজানুর রহমান বলেন, ঈদের আগের মতো ঈদের পর প্রথম কার্যদিবস ভালোই গেল। কয়েক কার্যদিবস টানা ঊর্ধ্বমুখী থাকায় লোকসানের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। তবে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যেও সব কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়েনি। বরং এর মধ্যেও কিছু কোম্পানির শেয়ার দাম আরও কমেছে। ফলে বেশিরভাগ সাধারণ বিনিয়োগকারী এখনও বড় লোকসানে রয়েছেন।

তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে সরকার শেয়ারবাজার ভালো করতে চেষ্টা করছে। আমরাও আশা করছি আগামী অর্থবছরের বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য নীতিগত সহায়তা দেওয়া হবে। তাহলে শেয়ারবাজারে আবার গতি ফিরবে।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, সোমবার ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার মাধ্যমে। ফলে লেনদেনের শুরুতে সূচকের ঊর্ধ্বমুখিতার দেখা মেলে। লেনদেনের শেষ পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকে। এতে দাম বাড়ার তালিকা বড় হওয়ার পাশাপাশি মূল্যসূচক বেড়েই দিনের লেনদেন শেষ হয়। দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে সব খাত মিলে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে ১৭৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ১৫২টির এবং ৫৫টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

এদিকে, ভালো কোম্পানি বা ১০ শতাংশ অথবা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৮৫টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৭৭টির দাম কমেছে এবং ৩১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি মানের বা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া ৪৫টি কোম্পানির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ২৫টির এবং ৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ‘জেড’ গ্রুপে স্থান হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৪৯টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৫০টির এবং ২০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। আর তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে ১৩টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে ২টির দাম কমেছে এবং ১৯টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। দাম বাড়ার তালিকা বড় হওয়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৩৬ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৩৭২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৪ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৮৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ১৩ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ৪৪ পয়েন্টে উঠে এসেছে। মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৯১২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৭৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন বেড়েছে ১৩৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এ লেনদেনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এনসিসি ব্যাংকের শেয়ার। কোম্পানিটির ৪৪ কোটি ৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ২৮ কোটি ১৭ লাখ টাকার। ১৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বিবিএস কেবলস। এছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে- সিটি ব্যাংক, গোল্ডেন সন, যমুনা ব্যাংক, আরডি ফুড, নাহি অ্যালুমিনিয়াম, বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেম এবং বিডি থাই ফুড। অন্য শেয়ারবাজার সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই বেড়েছে ৬১ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৮৭ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১৮টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৫৫টির এবং ১৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ৪৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত