ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধস, দেশে কমবে কবে

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধস, দেশে কমবে কবে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর প্রাণ ফিরছে হরমুজ প্রণালিতে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ৭৩ ডলারে নেমেছে। বাংলাদেশেও জ্বালানির নিম্নমুখী বাজার প্রত্যাশা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তবে বিশেষজ্ঞরা দেশে এই দাম কতটুকু কমবে এবং সাধারণ মানুষ সুফল পাবেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও আপাতত দেশে তেলের দাম কমানোর পক্ষে নয় বিপিসি। কারণ, বিপিসি বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রির কারণে গত চার মাসে লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান গত মঙ্গলবার বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল কিনে এখনও লোকসান দিতে হচ্ছে সরকারকে। তাই আপাতত তেলের দাম কমানো যাবে না। তবে আশার কথা, তেল কিনে বিপিসিকে প্রতিমাসে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান দিতে হতো, সেটি এখন অনেক কমে এসেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর ব্রেন্ট ক্রুডের (অপরিশোধিত তেল) দাম প্রতি ব্যারেল ৭২ দশমিক ৮৭ ডলার থেকে বাড়তে থাকে। ৪ মে সেই দাম ১১৪ দশমিক ৪৪ ডলারে উঠে যায়। সেই তেলের দাম ২৪ জুন নেমে আসে ৭৫ দশমিক ৫০ ডলারে। বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, মে মাসে ৩০ হাজার টনের একটি ডিজেলবাহী জাহাজের বিল দিতে হয়েছে ৫ কোটি ডলার পর্যন্ত। সেখানে এখন দিতে হচ্ছে ৩ কোটি ডলার। বাংলাদেশ প্রতিমাসে ১৫ জাহাজের মতো তেল কিনে থাকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা চলমান থাকলে তেলের দাম ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের চেয়ে আরও কমে আসতে পারে। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, তেল আমদানি করে এখন বিপিসির লোকসান হলেও সরকারের আর্থিক ক্ষতি নেই। সর্বশেষ পার্ল্টস সিঙ্গাপুর ফর্মুলা (যে ফর্মুলার দাম অনুযায়ী বিপিসি তেল কিনে) অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে বিপিসির খরচ ১২৯ টাকা। আর এখন বিক্রি করা হচ্ছে প্রতি লিটার ১১৫ টাকায়। তবে অকটেন ও পেট্রোল বিক্রি করে লাভ হচ্ছে বিপিসির। অকটেন প্রতি লিটার ১৪৫ এবং পেট্রোল ১৪০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

বিপিসি জানিয়েছে, ডিজেল আমদানি প্রতি লিটার ১২৯ টাকা হলেও এর মধ্যে এনবিআর আমদানি শুল্ক নিচ্ছে ৩৫ টাকা। এর মানে, তেল আমদানি করে এনবিআর বা সরকার রাজস্ব পেলেও বিপিসি লোকসান করছে প্রতি লিটারে ১৪ টাকা। তাই তেল আমদানি করে এখন সরকার লাভবান; কিন্তু বিপিসি এখনো লোকসানে। বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এলএনজি, কয়লা ও সারের ভর্তুকি বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। কিন্তু বিপিসিকে এক টাকাও তেল কিনতে ভর্তুকি দেয়নি। বিপিসির বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি জমা ছিল। সেই টাকা রাখা হয়েছিল বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য। সেখান থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা তুলে লোকসান সামাল দেওয়া হয়েছে। এখন সেই লোকসানের ১৭ হাজার কোটি টাকা ফেরত দিতে জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছে বিপিসি। সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, লোকসানের টাকা ভর্তুকি আকারে না দিলেও অন্তত এনবিআর-এর আমদানি শুল্ক আপাতত মওকুফ করা দরকার। বিপিসি তেল আমদানিতে প্রতি লিটারে ৩৫ টাকার বেশি শুল্ক দেয় এনবিআরকে। আইএমএফ-এর (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) ফর্মুলা অনুযায়ী বিপিসি আগের মাসের ২১ থেকে পরবর্তী মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত তেলের আমদানি ব্যয় গড় করে পরবর্তী মাসের দাম নির্ধারণ করে। এই হিসাবে ২১ মে থেকে ২০ জুন পর্যন্ত বিপিসি হিসাব করে দেখেছে, ওই সময়ে তাদের প্রতি লিটার ডিজেল কেনা পড়েছে ১৫৩ টাকা ২১ পয়সা। আর অকটেন কেনা পড়েছে ১৪৪ টাকা ৪৭ পয়সা। এ হিসাবে গত মাসে ডিজেল বিক্রিতে কিছুটা লোকসান হলেও অকটেন বিক্রিতে লাভ হয়েছে বিপিসির। এ দাম দেখেই ১ জুলাই থেকে তেলের নতুন দাম ঘোষণা করবে সরকার। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে এখন তেলের মজুত সন্তোষজনক। ২৪ জুন পর্যন্ত ডিজেলের মজুত ছিল ৪ লাখ ২৭ হাজার টন, যা দিয়ে চলবে ৪২ দিনের মতো।

এছাড়া অকটেন ৩২ হাজার ৭১৪ টন (চলবে ৩২ দিন), পেট্রোল ২২ হাজার ৩০০ টন (মজুত ২৪ দিন), ফার্নেস অয়েল ৫৪ হাজার ৪৩১ টন (মজুত ২২ দিন), জেট ফুয়েল ৩১ হাজার ১৫৮ টন (মজুত ২১ দিন), কেরোসিন ১৪ হাজার ৪৫১ টন (মজুত ৭৬ দিন) এবং মেরিন ফুয়েল ১ হাজার ২৬ টন, যা দিয়ে চলবে ৩০ দিন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর ১০ দিনের মধ্যে মজুত কমে যাওয়ায় দেশে তেলের রেশনিং করতে হয়েছে। গাড়ির চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করার মতো দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। আন্তর্জাতিক দরপত্রের আওতায় জুলাইয়ে ৩ লাখ টন ডিজেল, ২৫ হাজার টন অকটেন, ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল এবং ৬০ হাজার টন জেট ফুয়েল কিনবে বিপিসি। ওই দরপত্রের মাধ্যমে আগস্ট পর্যন্ত ৭ লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন অকটেন, ২ লাখ টন ফার্নেস অয়েল এবং ১ লাখ ৭০ হাজার টন জেট ফুয়েল কেনা হবে। এর বাইরে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জি-টু-জি চুক্তির মাধ্যমে আরও ১৬ লাখ টন তেল কিনবে সরকার। এজন্য সিঙ্গাপুরে ২০ জুন থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত ১০টি কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা করেছে জ্বালানি বিভাগ এবং বিপিসি। যার নেতৃত্ব দিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। জানা যায়, বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগ ৯০ দিনের তেলের মজুত করতে উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আপাতত বিপিসির কাছে তেল রাখার ট্যাংক আছে ৪৫ দিনের মতো। আরও ট্যাংক বসাতে বিতরণ কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনাকে বলা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ বলেছে, যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে (২১ আগস্ট ২০২৬) চূড়ান্ত চুক্তি করবে যুক্তরাষ্ট্র। ২১ আগস্ট পর্যন্ত আপাতত ইরানের তেল বিক্রির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি না হলে বিশ্ববাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দেবে। সুতরাং সেই বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে তেল কেনার সিদ্ধান্ত দরকার, যাতে বাংলাদেশ আবারও বিপাকে না পড়ে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত