ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

পোশাক পরিধানের নীতিমালা

মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ
পোশাক পরিধানের নীতিমালা

পোশাক মানুষের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-মূর্খ, অভিজাত-ইতর সবাই পোশাকের মাধ্যমে নিজের সতর আবৃত করে। তা ছাড়া রোদ, বৃষ্টি ও ঠান্ডা থেকে বাঁচার প্রয়োজনেও পোশাক পরতে হয়। ব্যতিক্রম শুধু পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ। তারা না পোশাক পরে, আর না পোশাক পরার প্রয়োজন পড়ে। মূলত মানুষের এই প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করেই মহান আল্লাহ পোশাকের বিধান দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে বনি আদম, অবশ্যই আমি তোমাদের সতর ঢাকার ও সজ্জা গ্রহণ করার জন্য পোশাক দান করেছি। তবে খোদাভীরুতার পোশাকই সর্বোত্তম।’ (সুরা আরাফ : ২৬)। অর্থাৎ একজন মুসলমান সাধ্যমতো সুন্দর পোশাক পরিধান করবে, পাশাপাশি অন্তরেও তাকওয়ার সৌন্দর্য ধারণ করবে।

পোশাকের মৌলিক নীতি : পোশাক গ্রহণ ও নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্যান্য ধর্মে সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি না থাকলেও শাশ্বত ধর্ম ইসলামে রয়েছে কিছু মৌলিক নীতিমালা ও আলোকিত দিকনির্দেশনা। কেননা, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার নাম। তাতে ঈমান, ইবাদত, মুয়ামালাত ও মুয়াশারাত যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সুস্থ, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন সংস্কৃতিও, পোশাক যার অন্যতম। মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট ধরন ও প্রকারের পোশাক পরাকে ইসলাম অপরিহার্য করে দেয়নি। বরং কিছু মৌলিক বিধিনিষেধ বেঁধে দিয়েছে, যাতে তা অনুসরণ করে স্থান-কাল-পাত্রভেদে রুচি ও পছন্দের যেকোনো পোশাক তারা পরিধান করতে পারে। মৌলিক নীতিগুলো হচ্ছে-

সুন্দর হওয়া : মানুষের পরিধেয় বস্ত্রটি সুন্দর হওয়া উত্তম। কেননা, আল্লাহতায়ালা কোরআনে পোশাককে ‘জিনাত’ বলে উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ হচ্ছে, সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য-শোভা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে আদম সন্তান, প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা তোমাদের সৌন্দর্য ধারণ করো।’ (সুরা আরাফ : ৩১)। অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, ‘বলুন কে নিষিদ্ধ করেছে আল্লাহপ্রদত্ত সৌন্দর্যকে, যা তিনি আপন বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন?’ (সুরা আরাফ : ৩২)। তা ছাড়া এক হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহতায়ালা পছন্দ করেন বান্দার শরীরে স্বীয় নেয়ামতের নিদর্শন দেখতে।’ (তিরমিজি : ২৮১৯)।

সতর আবৃতকারী হওয়া : পুরুষ-নারী উভয়ের পরিধেয় পোশাক সতর আবৃতকারী হওয়া চাই। কেননা পোশাকের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে সতর ঢাকা, যেমনটি প্রথমোক্ত আয়াত থেকে আমরা জেনেছি। অতএব, এমন কোনো আটো-খাটো বা পাতলা পোশাক পরিধান না করা, যা দেহসৌষ্ঠব ও শারীরিক সৌন্দর্য প্রকাশ করে নগ্নভাবে। যার ফলে যুবক-যুবতীদের মধ্যে বাসা বাঁধতে থাকে নানা ধরনের অশ্লীল ও অনৈতিক চিন্তাভাবনা। নবীজি (সা.) বলেন, ‘জাহান্নামি দুই শ্রেণির লোক রয়েছে যাদের আমি আজও দেখিনি এক. পোশাক পরিহিতা নগ্ন মহিলা, যারা নিজেরা পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট হবে আবার পুরুষদেরও নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করবে। তাদের মাথা হবে উটনীর মাথার মতো উঁচু ও একপাশ ঝুঁকানো।’ (মুসনাদে আহমদ : ৯৬৮০)।

ধর্মীয় পরিচয়ের প্রকাশ : ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির পোশাক না হতে হবে। সুতরাং যেসব পোশাক অমুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পোশাক হিসেবে পরিচিত বা স্বীকৃত তা পরা যাবে না। হাদিসে এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদেরই দলভুক্ত বলে গণ্য হবে।’ (আবু দাউদ : ৪০৩১)। আরেক হাদিসে এসেছে, ‘যারা অন্যদের রূপসাদৃশ্য গ্রহণ করবে তারা আমাদের দলভুক্ত হতে পারে না।’ (তিরমিজি : ২৬৯৫)। ওমর (রা.) বলেছেন, ‘বিলাসিতা ও অনারবিদের বেশভূষা গ্রহণ থেকে সাবধান!’ (শরহে মুসলিম, আল্লামা নববি : ১৪/৪৭)।

রেশমের পোশাকে সতর্কতা : রেশম বা সিল্কের পোশাক পরিধান করা নারীদের জন্য বৈধ হলেও পুরুষদের জন্য অবৈধ। সুতরাং এ থেকে সতর্ক থাকতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘স্বর্ণ ও রেশম আমার উম্মতের নারীদের জন্য হালাল করা হয়েছে, পক্ষান্তরে পুরুষদের জন্য করা হয়েছে হারাম।’ (নাসায়ি : ৫১৮৪)।

টাখনুর ওপরে পরা : পুরুষদের জন্য প্যান্ট, পাজামা, লুঙ্গি ইত্যাদি টাখনুর ওপরে পরতে হবে। কোনোভাবেই যেন টাখনুর নিচে বা জমিন স্পর্শ করে না যায়, এ ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা এ সম্পর্কে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে আল্লাহর নবীর জবানে। তিনি বলেন, ‘লুঙ্গি বা পাজামার যে অংশ টাখনুর নিচে যাবে তা জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার কারণ হবে।’ (বোখারি : ৫৭৮৭)। অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি অহংকারবশত মাটি স্পর্শ করে পোশাক পরবে আল্লাহতায়ালা কেয়ামতের দিন তার প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেবেন না।’ (বোখারি : ৩৬৬৫)।

লৌকিকতা পরিহার করা : সুনাম, প্রসিদ্ধি ও লৌকিকতার উদ্দেশ্যে পোশাক পরা নিন্দনীয়। তাই এ ধরনের হীন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পোশাক পরিধান করা যাবে না। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় প্রসিদ্ধি লাভের উদ্দেশ্যে পোশাক পরিধান করবে কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা তাকে পরাবেন লাঞ্ছনার পোশাক।’ (ইবনে মাজাহ : ৩৬০৬)।

বিপরীত লিঙ্গের পোশাক না পরা : নারী-পুরুষের কিংবা পুরুষ-নারীর পোশাক পরতে পারবে না। কেননা, বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্য গ্রহণকারীরা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা অভিসম্পাত বর্ষণ করেন ওই সব পুরুষদের ওপর, যারা নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে। অনুরূপ অভিসম্পাত বর্ষণ করেন ওই সব নারীদের ওপর, যারা পুরুষদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৩১৫১)। তাই সবাইকে ইসলামের কল্যাণময় নীতি-আদর্শ অনুসরণ করে শালীন ও সুন্দর পোশাক পরিধান করার চেষ্টা করতে হবে এবং বর্জন করতে হবে সব ধরনের শালীনতাবর্জিত পোশাক।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত