ঢাকা সোমবার, ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২১ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চাপের মুখে আইপিএল থেকে মোস্তাফিজ বাদ

উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চাপের মুখে আইপিএল থেকে মোস্তাফিজ বাদ

একের পর এক হুমকি আসছিল কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) মালিক বলিউড বাদশা শাহরুখ খানের ওপর। ক্রমেই চাপ বাড়ছিল বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার জন্য। এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কলকাতাকে নির্দেশ দেয়। বোর্ডের নির্দেশ ও উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চাপের মুখে অবশেষে এই কাটার মাস্টারকে দল থেকে বাদ দিয়েছে কলকাতার ফ্র্যাঞ্জাইজিটি। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশের পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে কেকেআর জানায়, ‘ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশ অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে মোস্তাফিজকে স্কোয়াড থেকে মুক্ত করা হয়েছে।’

তার কিছুক্ষণ আগে বাংলাদেশের পেসারকে বাদ দিতে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দিয়েছে বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া (বিসিসিআই)। বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে বিসিসিআই কেকেআরকে বাংলাদেশের খেলোয়াড় মোস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে ছাড়তে নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা যদি বিকল্প খেলোয়াড় নিতে চায়, বোর্ড সেই অনুমতিও দেবে।’ যদিও বিসিসিআই বা কেকেআরের পক্ষ থেকে ‘সাম্প্রতিক উন্নয়ন’ বলতে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি, তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগ ঘিরে তৈরি হওয়া ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েনের মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে। গত কয়েকদিন ধরে এই ইস্যুতে কেকেআর ও তাদের মালিক শাহরুখ খানকে লক্ষ্য করে সমালোচনাও হয়েছে।

তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান জনমত ও রাজনৈতিক চাপের মুখে বোর্ডকে এ কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নীতি থাকলেও বর্তমান কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং বাংলাদেশে চলমান অস্থিরতার কারণে সিদ্ধান্তটি নিতে বাধ্য হয়েছে বিসিসিআই। গত ডিসেম্বরের নিলামে ৯ কোটি ২০ লাখ টাকায় মোস্তাফিজকে দলে নেয় কেকেআর। এর ফলে আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি বাংলাদেশি খেলোয়াড়ে পরিণত হন তিনি। তাকে ঘিরে তখন থেকেই বিতর্ক চলছিল।

বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) কড়া সমালোচনা করেছেন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার সদস্য শশী থারুর। ভারতীয় এই রাজনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিক এই প্রশ্নও তুলেছেন, ‘আমরা আসলে কাকে শাস্তি দিচ্ছি- একটি দেশকে, একজন ব্যক্তিকে নাকি তার ধর্মকে। এমন কিছু যে ঘটতে পারে, সেটা সম্ভবত আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন শশী থারুর। এ কারণে তিরুভনন্তপুরমে গত শুক্রবার সাংবাদিকদের শশী থারুর বলেছিলেন, ‘আমি সত্যিই মনে করি না যে ক্রিকেটকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ভার বহন করতে দেওয়া উচিত। আমার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট- আমাদের উচিত কিছু ক্ষেত্রকে অন্য ক্ষেত্র থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা করা।’ থারুর আরও বলেন, ‘মোস্তাফিজুর রহমান একজন ক্রিকেটার, যার এসব ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণাসূচক কথা, হামলা বা এমন কর্মকাণ্ডকে সমর্থন কিংবা ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য কখনও অভিযুক্ত হননি। তিনি একজন ক্রীড়াবিদ আর এ দুটি বিষয়কে মিশিয়ে ফেলাটা অনুচিত।’

থারুর ভবিষ্যতের কথাও ভেবেছেন। তার মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোকে খেলাধুলায় বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলাদা করে ফেলাটা ভারতের জন্য কখনই গঠনমূলক ফল বয়ে আনবে না। আইপিএলেই যেমন প্রথম আসরের পর রাজনৈতিক কারণে আর কোনো পাকিস্তানি ক্রিকেটারকে দেখা যায়নি। থারুর বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তান- কোনো দেশেরই নাম উচ্চারণ না করেই বিষয়টি সামনে টেনে নিজেদের হৃদয়টা বড় করার পরামর্শ দিয়েছেন, ‘যদি ভারত এমন দেশ হয়ে যায় যে তার সব প্রতিবেশী দেশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং বলে যে কারও সঙ্গেই তাদের খেলা উচিত নয়, তাতে কোনো উপকার হবে না। এ বিষয়ে আমাদের বড় মন ও হৃদয় থাকতে হবে।’

এদিকে কেকেআর থেকে ক্ষোভ উগরে দিয়ে এই পুরো ঘটনাকে ‘ওপর মহলের’ চাপে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন ভারতের হয়ে ১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী সাবেক অলরাউন্ডার মদন লাল। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’র সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, খেলাধুলার ভেতরে রাজনীতির এই অনধিকার প্রবেশ মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। তার মতে, পরিস্থিতির চাপে বিসিসিআই অনেকটা একতরফাভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মদন লাল সোজাসাপ্টা বলেছেন, ‘বিসিসিআই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ, তাদের চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কারও নেই। এমনকি শাহরুখ খানেরও না; কিন্তু খেলাধুলায় কেন এত রাজনীতি ঢুকছে? আমি জানি না ক্রিকেট কোন দিকে যাচ্ছে।’ মদন লাল মনে করেন, এখানে মোস্তাফিজ পরিস্থিতির শিকার। তিনি সরাসরিই বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই ওপর মহল থেকে চাপ ছিল। বাংলাদেশে যা ঘটছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক, কিন্তু খেলোয়াড়দের কেন এর মাঝখানে টেনে আনা হচ্ছে? এখানে শাহরুখ খানের দোষ কোথায়? নিলামে তো একটা কমিটি বসে খেলোয়াড় নির্বাচন করে।’

তবে ভারতের মতো ক্রিকেট পাগল দেশে জাতীয় আবেগ যে অনেক বড় বিষয়, তা-ও মানছেন এই সাবেক তারকা। তার মতে, দেশ সবার আগে, এই ভাবনা থেকেই হয়তো বোর্ড এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। তার কথা, ‘দেশের মানুষের আবেগ সব সময়ই বড়। কোটি কোটি মানুষ ক্রিকেট ভালোবাসে বলেই আজ এসব ঘটছে। দিন শেষে দেশই সবার আগে, আর সেই জায়গা থেকে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়তো ভুল নয়।’ এ সিদ্ধান্ত কেকেআরের জন্য কৌশলগত ও আর্থিক-উভয় দিক থেকেই বড় ধাক্কা। ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা খরচ করে তাকে মূলত ডেথ ওভারের বিশেষজ্ঞ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। ইডেন গার্ডেন্সের ধীরগতির পিচে তার কাটার ও বাঁহাতি বোলিং বৈচিত্র্য দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মৌসুমের এত কাছাকাছি সময়ে তাকে হারানোয় দলটির বোলিং বিভাগে বড় শূন্যতা তৈরি হলো।

মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেওয়ায় বলিউড তারকা ও কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) মালিক শাহরুখ খানের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন ভারতের উত্তর প্রদেশের বিজেপি নেতা সংগীত সোম। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে তিনি শাহরুখকে ‘গাদ্দার’ বা ‘দেশদ্রোহী’ বলে আখ্যা দেন। উত্তর প্রদেশ বিধানসভার সাবেক সদস্য সংগীত সোম মীরাটে এক জনসভায় বলেন, একদিকে বাংলাদেশে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে, অন্যদিকে আইপিএলে বাংলাদেশি ক্রিকেটার কেনা হচ্ছে। শাহরুখ খান ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা দিয়ে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে কিনেছেন। এ ধরনের গাদ্দারদের এ দেশে থাকার কোনো অধিকার নেই।

শাহরুখের সমালোচনা করে এ বিজেপি নেতা আরও বলেছিলেন, এ দেশের মানুষই আপনাকে এ অবস্থানে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। আপনি এ দেশ থেকেই টাকা উপার্জন করছেন, অথচ দেশের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। সংগীত সোম হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, আগামী মার্চে আইপিএল শুরু হলে মোস্তাফিজের মতো ক্রিকেটাররা ভারতের বিমানবন্দরে নামতে পারবেন না। একই ইস্যুতে শাহরুখ খানের সমালোচনা করেছিলেন গুরু দেবকীনন্দন ঠাকুরও। তিনি কেকেআর ম্যানেজমেন্টের প্রতি মোস্তাফিজকে দলে না খেলানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই শাহরুখকে তারকা বানিয়েছেন। অথচ বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি বিবেচনা না করেই তিনি বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে দলে নিয়েছেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত