ঢাকা শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সেই দিয়াবাতের গোলে মোহামেডানকে হারাল আবাহনী

সেই দিয়াবাতের গোলে মোহামেডানকে হারাল আবাহনী

দেশের ফুটবলে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, মোহামেডান ও আবাহনীর লড়াই মানেই অন্য রকম উত্তেজনা। দুই দলের সমর্থকদের দূর দূরু বুকে অপেক্ষা, কখনোবা শঙ্কাও। এই দুই দলের লড়াই মানেই ছিল ঢাকা শহর কোনো এক অজানা আশঙ্কায় ফাঁকা হয়ে যাওয়া। আবাহনী-মোহামেডানের যেকোনো লড়াইই ছিল সকাল থেকে উৎকণ্ঠা-কী হয়! কী হয়!! দুই ক্লাবের লড়াই হয়ে যেত সেদিনের ‘টক অব দ্য টাউন’। যেকোনো শ্রেণি-পেশা তো বটেই, কিছুটা নাক উঁচু মধ্যবিত্তে কিংবা উচ্চবিত্তের বৈঠক খানা কিংবা চায়ের টেবিলেও সেদিন আবাহনী-মোহামেডান আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। নব্বই দশকের পর এই দ্বৈরথের সেই জৌলুস আর নেই। তারপরও দুই দলের ম্যাচ মানে অন্যরকম আমেজ। গতকাল শুক্রবারর কুমিল্লার ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে সেই লড়াইয়েরই সাক্ষী হলেন স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীরা। ম্যাচের শুরুতেই উজবেক মিডফিল্ডার মোজাফফরভের অবিশ্বাস্য এক ‘অলিম্পিক গোল’ করে মোহামেডানকে এগিয়ে নিলেন।

প্রথমার্ধেই মিরাজুল ইসলামের গোলে ঘুরে দাঁড়াল আবাহনী। দ্বিতীয়ার্ধে সুলেমানে দিয়াবাতের লক্ষ্যভেদে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপক্ষে জিতল আকাশি-নীল জার্সিধারীরা। মোহামেডানের ঘরের ছেলে দিয়াবাতে এবার খেলছেন তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ঢাকা আবাহনীর হয়ে। এই দিয়াবাতের গোলে মোহামেডান অনেক ম্যাচে আবাহনীকে হারিয়েছে। এদিন ঘটেছে উল্টো ঘটনা। এবার দিয়াবাতের গোলে মোহামেডানকে ২-১ গোলে হারিয়েছে আবাহনী। এ নিয়ে লিগে ৩ বছর পর সাদাকালো জার্সিধারীদের বিপক্ষে জিতল তারা। লিগে অবশ্য সময়টা ভালো যাচ্ছে না মোহামেডানেরও। তবে গত ছয় ম্যাচে জয়হীন থাকা আলফাজ আহমেদের দল পায় দারুণ শুরু। ম্যাচের তৃতীয় মিনিটের মাথায় মোহামেডানের উজবেক ফরোয়ার্ড মোজাফরভ অলিম্পিক গোল করেন। বাঁ প্রান্ত থেকে কর্নার কিক থেকে সরাসরি বল জালে জড়ান তিনি। দুর্দান্ত বাঁকানো শটের গোলে আবাহনীর গোলরক্ষক মিতুল মারমা ছিলেন দর্শকের ভূমিকায়। আবাহনী খেলায় ফিরতে অবশ্য বেশি দেরি করেনি। ১৪ মিনিট পরই মিরাজুল ইসলাম আবাহনীর হয়ে সমতা আনেন। বক্সের সামনে বল পেয়ে শটে গোল করেন।

এই গোলের আগে অবশ্য মিরাজুল দুইবার সহজ সুযোগ মিস করেন। আবাহনী প্রথমার্ধে একটা ধাক্কা খায়। মোহামেডানের এক আক্রমণ ক্লিয়ার করতে ডিফেন্ডার হাসান মুরাদ ও গোলরক্ষক মিতুল মারমার মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ডিফেন্ডার মুরাদ মাথায় ব্যথা পান। অবস্থা বেগতিক দেখে তাকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

দ্বিতীয়ার্ধে দিয়াবাতে আবাহনীকে এগিয়ে নেন। এই অর্ধে কাজেম শাহ ও মোরসালিন নামার পর আবাহনীর খেলার গতি বাড়ে। মোরসালিন ম্যাচের শেষ দিকে একটি ওয়ানটুওয়ান সুযোগ মিস করেন। মোহামেডান পিছিয়ে পড়ার পর সমতা আনতে মরিয়া ছিল। ইনজুরি সময় ১০ মিনিটে একাধিক আক্রমণ করেছে। বিশেষ করে বক্সের সামনে খুব ভালো জায়গায় ফ্রি কিক পেয়েও সেখান থেকে গোল আদায় করতে পারেনি সাদা-কালোরা। ম্যাচের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে মোজাফরভ কর্নার নিলেও বক্সে দাঁড়ানো তার সতীর্থরা ঠিক মতো প্লেসিং করতে পারেননি।

আবাহনী এই জয়ে ১২ ম্যাচে ২২ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। এক ম্যাচ কম খেলা ফর্টিজের পয়েন্ট ২১। ঢাকা মোহামেডান ১২ ম্যাচে মাত্র ১১ পয়েন্ট সংগ্রহ করে টেবিলের সাত নম্বরে। ২৪ পয়েন্ট নিয়ে বসুন্ধরা, তবে এক ম্যাচ কম খেলেছে তারা। এক মাস পর পুনরায় শুরু হওয়া লিগে গতকাল ছিল তিন ম্যাচ। দিনের অন্য দুই ম্যাচে ২-০ গোলে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ফকিরেরপুলকে ও পিডব্লিউডি রহমতগঞ্জকে হারায়। এতে ব্রাদার্স ১৩ পয়েন্টে ছয় নম্বরে আর পিডব্লিউডি ১০ পয়েন্টে ৮ নম্বরে। ফকিরেরপুলেরও পয়েন্ট দশ তবে গোল ব্যবধানে তারা নয় নম্বরে আর রহমতগঞ্জ ১৮ পয়েন্টে চার নম্বরে।

ম্যাচ শেষে মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা দিয়াবাতের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখা গেল, তাঁর চোখেমুখে তৃপ্তির ছাপ। জয়ের জন্য অভিনন্দন জানাতেই দিয়াবাতে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, ৩ পয়েন্ট এবং জয় পেয়েছি। আপনারা জানেন, মোহামেডান ও আবাহনীর খেলা সব সময়ই একটি কঠিন লড়াই। আজকের লড়াইটাও সহজ ছিল না। আমি গোল করতে পেরেছি এবং দল জিতেছে, এ জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই।’ প্রশ্ন করা হলো, সাবেক দলের বিপক্ষে গোল করার সময় কি আবেগ কাজ করছিল? দিয়াবাতে মুহূর্তেই একজন নিখুঁত পেশাদার খেলোয়াড়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠলেন। মৃদু হেসে বললেন, ‘না, আমি গোল করতে পেরেই খুশি ছিলাম। কারণ, আবাহনী এখন আমার দল। মোহামেডানের কথা আমি ভুলে গেছি। গত ম্যাচে গোল করতে চেয়েও পারিনি, কিন্তু হাল ছাড়িনি। এই লিগের দ্বিতীয় লেগে এসে সফল হলাম। আমার কাজ এখন আবাহনীকে জেতানো।’

মোহামেডানের জার্সিতে আবাহনীর বিপক্ষে কতগুলো গোল করেছেন, তা মনে নেই তার। তবে এটা পরিষ্কার মনে আছে, কুমিল্লার এই মাঠেই ২০২৩ সালে ফেডারেশনে কাপের ফাইনালে আবাহনীর বিপক্ষে করেছিলেন চার-চারটি গোল। দিয়াবাতে জানালেন, এদিন জয়সূচক মহাগুরুত্বপূর্ণ গোলটি তিনি উৎসর্গ করেছেন এখনো চোখে না দেখা তাঁর সদ্য জন্ম নেওয়া পুত্রকে, ‘এই গোল আমার ছোট্ট ছেলের জন্য। ওর বয়স মাত্র দুই সপ্তাহ। আমি চেয়েছিলাম ওকে একটি বিশেষ উপহার দিতে। আজকের জয়ের গোলটিই ওর প্রতি আমার ভালোবাসা। ও হয়তো এখনও কিছুই বোঝে না, কিন্তু বড় হয়ে ও দেখবে, ওর বাবা ওকে কতটা মনে রেখেছিল।’ দিয়াবাতের স্ত্রী-সন্তান এখন মালিতে। ৩৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার এখন ছেলেকে দেখার অপেক্ষায়, ‘ওকে এখনও সামনাসামনি দেখিনি। শুধু ছবিতে দেখেছি।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত