ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ইনিংস ব্যবধানে হেরেও সিরিজ ড্র বাংলাদেশের

ইনিংস ব্যবধানে হেরেও সিরিজ ড্র বাংলাদেশের

ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা- এ প্রবাদটি যেন আরও একবার নতুন করে প্রমাণিত হলো অস্ট্রেলিয়ার ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায়। ডারউইনে ঐতিহাসিক জয়ের পর আকাশচুম্বী প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ম্যাকাইয়ের দ্বিতীয় টেস্টে মাঠে নামতেই সে রঙিন স্বপ্ন পরিণত হয় বিষাদে। তবে একটি ম্যাচে বিশাল ব্যবধানে হারলেও, দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় পর ক্যাঙ্গারুদের ডেরায় গিয়ে সিরিজ ড্র করার এ অনন্য কীর্তি দেশের ক্রিকেটে এক নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। গতকাল রোববার ম্যাকাইয়ে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টের চিত্রটা ছিল একেবারেই একপেশে এবং হতাশাজনক। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশকে মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে দেয়ার পর অস্ট্রেলিয়া নিজেদের একমাত্র ইনিংসে করে ২১০ রান। ১৪৬ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশও প্রতিরোধ গড়তে পারেনি। মাত্র ৯৫ রানে অলআউট হয়ে যায় তারা। মাত্র ২১০ রান করেই ইনিংস ব্যবধানে জয়ের বিরল কীর্তি গড়ে অস্ট্রেলিয়া।

টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড়শ বছরের ইতিহাসে ২১০ বা তার কম রান করে ইনিংস ব্যবধানে জয়ের ঘটনা এবার নিয়ে মাত্র চারটি। ১৮৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৭২ রান করে ইনিংস ও ২১ রানে জিতেছিল ইংল্যান্ড। ১৯৩২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৫৩ রান করেও ইনিংস ও ৭২ রানে জয় পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। ১৯৪৬ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৯ রানে ইনিংস ঘোষণা করেও ইনিংস ও ১০৩ রানের জয় পেয়েছিল তারা। এরপর দীর্ঘ ৮০ বছরে এমন ঘটনা আর দেখা যায়নি। ম্যাকাইয়ের ম্যাচটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দ্বিতীয় সংক্ষিপ্ততম টেস্টও হয়ে গেছে। পুরো ম্যাচে খেলা হয়েছে মাত্র ৭৫০ বল। এর আগে ১৯৩২ সালে মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ শেষ হয়েছিল ৬৫৬ বলে, যা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সবচেয়ে কম বলের টেস্ট। টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার এ ম্যাচটি সংক্ষিপ্ততম ম্যাচের তালিকায় চতুর্থ।

ব্যাট হাতে বাংলাদেশের ব্যর্থতা ছিল ম্যাচের সবচেয়ে বড় চিত্র। দুই ইনিংসেই শতরানের আগে অলআউট হয়ে যায় তারা। টেস্ট ক্রিকেটে ২১ বছর পর কোনো দল এমন লজ্জার রেকর্ডে নাম লেখাল। এর আগে ২০০৫ সালে হারারেতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জিম্বাবুয়ে ৫৯ ও ৯৯ রানে অলআউট হয়েছিল। তবে বাংলাদেশের বিপর্যয়ের মাঝেও বল হাতে উজ্জ্বল ছিলেন শরিফুল ইসলাম। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৪৮ রান দিয়ে সাত উইকেট নিয়ে বাংলাদেশি পেসার হিসেবে সেরা বোলিংয়ের কীর্তি গড়েছেন তিনি। দ্বিতীয় দিনের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ৮ উইকেটে ১৬৫ রান থেকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিলেন ক্যামেরন গ্রিন ও নাথান লায়ন। দিনের অষ্টম ওভারে শরিফুলের দুর্দান্ত ইনসুইং ইয়র্কারে গ্রিনের ইনিংস থামে ৬৭ রানে। রিভিউ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ উইকেটটি পায় বাংলাদেশ।

পরে নাথান লায়ন ও জশ হ্যাজেলউডের জুটি অস্ট্রেলিয়ার লিড আরও বাড়ায়। হ্যাজেলউডকে ৬ রানে তাইজুল ইসলামের ক্যাচ বানিয়ে ইনিংসের সমাপ্তি টানেন বাংলাদেশের স্পিনার। লায়ন ৩২ রানে অপরাজিত থাকেন। শেষ পর্যন্ত ২১০ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া, লিড দাঁড়ায় ১৪৬ রান। কিন্তু সে লিড পেরোনোর বদলে দ্বিতীয় ইনিংসেই আবার ধসে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং। শুরু থেকেই মিচেল স্টার্কের গতির সামনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সফরকারীরা। তৃতীয় ওভারে সাদমান ইসলামকে ১ রানে ফিরিয়ে পরের বলেই মুমিনুল হকের অফস্টাম্প ভেঙে দেন স্টার্ক। মাত্র ৫ রানে দুই উইকেট হারায় বাংলাদেশ।

অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত কিছুটা আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও তাকে বেশিক্ষণ সঙ্গ দিতে পারেননি তানজিদ হাসান তামিম। প্যাট কামিন্সের বলে

৯ রানে আউট হন তানজিদ। ডারউইনে প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা এই ওপেনার এরপর টানা দুই ইনিংসে ডাক মারার পর এবার দুই অঙ্কেও পৌঁছাতে পারেননি। দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩ উইকেটে ৩৯ রান। শান্ত ২৩ ও মুশফিকুর রহিম ৪ রানে অপরাজিত ছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় সেশনে ফের শুরু হয় ধস। মাত্র ৩১ রানের ব্যবধানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে ৮২ রানে আট উইকেটে পরিণত হয় বাংলাদেশ।

শান্ত ও মুশফিকের ২৭ রানের জুটি ভাঙেন নাথান লায়ন। এরপর মিচেল স্টার্কের শিকার হয়ে টানা তৃতীয় ইনিংসে ডাক মারেন লিটন দাস। প্যাট কামিন্স পরপর দুই ওভারে ফিরিয়ে দেন মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদকে। মিরাজ ১ এবং হাসান ২ রানে আউট হন। পরে তাইজুল ইসলামকে ৭ রানে বোল্ড করে ম্যাচে নিজের দশম উইকেট পূর্ণ করেন স্টার্ক। চা-বিরতির সময় বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৮ উইকেটে ৯৫ রান। মুশফিকুর রহিম ২৯ ও তাসকিন আহমেদ ৮ রানে অপরাজিত ছিলেন। বিরতির পর মাত্র তিন বল টিকে বাংলাদেশ। নাথান লায়নের প্রথম বলেই তাসকিন স্টিভ স্মিথের ক্যাচে পরিণত হন। এরপর প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান করা শরিফুল ইসলামকে ২ বলের মধ্যে ফিরিয়ে দেন লায়ন। ৯৫ রানেই শেষ হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস।

ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে যে বাংলাদেশ ইতিহাসের নতুন গল্প লিখেছিল, ম্যাকাইয়ে সে দলটিই ফিরল পুরোনো দুঃসহ স্মৃতিতে। প্রথম টেস্টে চার দিনে ১১ সেশনের লড়াইয়ের পর দ্বিতীয় টেস্টে দুই দিনও পার করতে পারেনি ম্যাচ। একদিকে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়, অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার পেস ও স্পিন আক্রমণের আধিপত্য-সব মিলিয়ে ৭৫০ বলেই শেষ হলো দুই ম্যাচের সিরিজের শেষ টেস্ট!

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত