
বা-দ আয্ আন বরখাস্ত ও আয্মে শাহ কার্দ
শাহ রা যান শাম্মেয়ী আগাহ কার্দ
এরপর (রোগীর শিয়র হতে) উঠে বাদশাহর কাছে করলেন গমন,
বাদশাহকে জানালেন রোগের কিঞ্চিৎ বিবরণ।
গোফত তদবীর আন বুওয়াদ কান মার্দরা
হাজের আরীম আয্ পেয়ে ঈন দার্দরা
বললেন, এর জন্যে করণীয় ব্যবস্থা হলো, ওই লোককে
রোগের চিকিৎসার স্বার্থে নিয়ে আসতে হবে এখানে।
মর্দে যারগার রা বেখান যান শাহ্রে দূর
বা যর ও খেলআত বেদেহ উ রা গুরুর
ওই দূরের শহর থেকে ডেকে আনুন স্বর্ণকারকে
স্বর্ণমুদ্রা ও শাহী খেলআত দিয়ে প্রলুব্ধ করুন তাকে।
শাহ ফেরেস্তাদ আন তারাফ য়্যক দো রাসূল
হাযেকান ও কাফিয়ানে বস্ উদূল
বাদশাহ সেদিকে পাঠালেন দু-একজন দূত
যারা বেশ দক্ষ, ঝানু, বিশ্বস্ত ও ন্যায়বান।
তা সামারকান্দ আমদান্দ আন দো রাসূল
আয বারায়ে যারগারে শাঙ্গো ফযূল
দুই রাজদূত এলেন সমরকন্দ পর্যন্ত
ব্যক্তিত্বহীন, হাস্যরসিক স্বর্ণকারের জন্য।
বয়েতটি এভাবেও উল্লেখিত হয়েছে-
তা সামারকান্দ আমাদান্দ আন দো আমীর
পীশে আন যারগার যে শাহানশাহ বাশীর
ক.ম. সমরকরন্দ পর্যন্ত এলেন দুই আমীর উভয়ে
স্বর্ণকারের কাছে বাদশাহর সুসংবাদ নিয়ে।
স্বর্ণকারের কাছে উপস্থিত হয়ে তারা বললেন :
কাই লাতীফ ওস্তাদে কামেল মারেফাত
ফাশ আন্দার শাহ্রহা আয তু সেফাত
ওহে দক্ষ ওস্তাদ স্বর্ণশিল্পী করিগর
দেশে দেশে মুখে মুখে আপনার গুণের খবর।
নাক ফোলান শাহ আয বারায়ে যারগারী
এখতেয়ারাত কার্দ যীরা মেহতারী
অমুক বাদশাহ এখন স্বর্ণকারের রাজকীয় পদে
আপনাকে মনোনীত করেছেন, শ্রেষ্ঠ শিল্পী বলে।
ঈন্ক্ ঈন খেলআত বেগীর ও যার্র ও সীম
চোন বেয়ায়ী খাস বাশী ও নাদীম
এখনকার মতো এই নিন রাজ খেলআ্ত স্বর্ণ ও রৌপ্য
যদি সেখানে আসেন হবেন সভাসদ, খাস অমাত্য।
মার্দ মাল ও খেলআতে বিসয়ার দীদ
গোররে শুদ আয শাহ্র ও ফারযান্দান বুরীদ
স্বর্ণকার দেখল প্রচুর স্বণ-রৌপ্য রাজকীয় উপহার
প্রলুব্ধ হলো, ছেড়ে গেল আপন শহর, ছেলে-মেয়ে সংসার।
মানুষ কি তার ভবিষ্যত গতি ও পরিণাম বুঝতে সক্ষম? স্বর্ণকার যদি জানত যে, এর আড়ালে তার জন্য কী ভয়াবহ পরিণাম অপেক্ষা করছে, তাহলে সে আর এই লোভে পড়ত না।
আন্দার আমাদ শাদমান দার রাহ্ মার্দ
বী খাবার কান শাহ কাস্দে জাঁশ কার্দ
খুশি টগবগে পথ বেয়ে চলে সম্মুখপানে লোকটি
জানে না যে বাদশাহ নিতে চায় তার প্রিয় প্রাণটি।
জীবন-মৃত্যুর অজানা রহস্যের শাশ্বত সত্যটি মওলানা ব্যক্ত করেছেন সংসার জীবনে মোহাসক্ত মানুষের জন্যে।
আস্পে তাযী বারনেশাস্ত ও শাদ তাখ্ত
খোন বাহায়ে খীশ রা খেলআত শেনাখ্ত্
আরবি ঘোড়ায় চড়ে স্বর্ণকার ছুটে টগবগ
আপন রক্তপণকে ভাবে সে খেলআত মহৎ।
এই শুদে আন্দার সফর বা সাদ রেযা
খোদ বপায়ে খীশ তা সূআল ক্বাযা
তুমি যে আজ সফরে যাচ্ছ শত সন্তুষ্ট মনে
পায়ে হেঁটে ছুটে যাচ্ছ সেই মৃত্যুর পানে।
দার খেয়ালাশ মূলক ও এজ্জো মেহতারী
গোফত আযরায়ীল রও আ’রী বারী
সে ভাবছে রাজত্ব সম্মান সর্দারী জুটবে কপালে
আজরাঈল বলেন, যাও, হ্যাঁ, লোভের প্রায়াশ্চিত্য পাবে।
মানব জীবনের একটি শাশ্বত সত্য ব্যক্ত হল স্বর্ণকারের রাজ-দরবারে যাবার বর্ণনা প্রসঙ্গে। মানুষ যখন পথ চলে, মৃত্যুর রথও তার সাথে চলে। অথচ সে কথা ঘুণাক্ষরেও তার মনে আসে না। তাই মানুষ লোভ-লালসায় এতটা বেপরোয়া।
চোন রাসীদ আয্ রা’হ আ’ন মার্দে গারীব
আন্দার আ’ওয়ার্দাশ বে পীশে শাহ তাবীব
বিদেশি লোকটি যখন পৌঁছল দীর্ঘ সফর শেষে
হেকিম তাকে নিয়ে গেলেন বাদশাহর কাছে।
সূয়ে শা’হানশা’হ বুরদান্দাশ বে না’য
তা’ বসূযাদ বার সারে শমএ তারা’য
বাদশাহর সম্মুখে হাজির করা হল সসম্মানে
সুদর্শন প্রদীপের ওপর পতঙ্গসম জ্বলবার জন্যে।
শা’হ দীদ ঊরা’ বাসী তাণ্ডযীম কার্দ
মাখযানে যার রা’ বেদূ তাসলীম কার্দ
বাদশাহ দেখে তাকে বড় সম্মান দেখালেন
স্বর্ণের রাজকোষ তার হাতে সঁপে দিলেন।
পাস হাকীমশ গোফত কাই সুলতা’নে মেহ্
আ’ন কানীযক রা’ বেদীন খা’জা’ বেদেহ
হেকিম এবার বললেন : ওহে বাদশাহ নামদার!
দাসীকে আপনি দিয়ে দিন স্বর্ণকারকে।
তা’ কানীযাক দার বেসা’লাশ খোশ শাওয়াদ
আ’বে ওস্লাশ্ দাফএ আ’ন আ’তাশ শাওয়াদ
দাসী যাতে তার মিলন পেয়ে সুস্থ সতেজ হয়
তার সান্নিধ্যের পানিতে বিরহের আগুন শান্ত হয়।
শাহ্ বেদু বাখশীদ আ’ন মেহ রূয় রা’
জুফ্ত কার্দ আ’ন হারদো সোহবাত জূয় রা’
সেই চাঁদমুখী দাসী দিয়ে দিলেন বাদশাহ তাকে
মিলনের প্রত্যাশী, দুজনকে দিলেন দুজনার বুকে।
এটি নিতান্তই গল্প। তবে গল্প হলেও তখনকার সমাজ বাস্তবতায় এ ঘটনা উদ্ভট, অবাস্তব ও অশ্লীল ছিল না। কারণ, বাদশাহ ছিলেন নেককার, আল্লাহর নির্দেশ মান্যকারী। সৌন্দর্যপ্রিয় স্বাভাবিক মানবিক আকাঙ্ক্ষার কারণেই তিনি সুন্দরী দাসীর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তিনি কামাসক্ত, খোদাদ্রোহী হলে জোরপূর্বকই দাসীর সাথে সেই আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে পারতেন। কেউ তাঁকে বাধা দেয়ার ছিল না। কিন্তু তিনি তা চাননি। ঘটনার শেষ পরিণাম দেখার জন্য তিনি হেকিমের পরামর্শে দাসীকে স্বর্ণকারের সাথে বিয়ে দিতে সম্মত হলেন। তদানিন্তন সমাজে এ ধারা মোটেই ঘৃণিত বলে বিবেচিত হত না। তবে আসল কথা হচ্ছে, গল্পের বিষয়বস্তু নয়, বরং গল্প বলার ফাঁকে ফাঁকে মওলানা রুমি (রহ.) যেসব ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষা উপস্থাপন করেছেন, সেগুলোই মুখ্য বিবেচ্য।
মুদ্দাতে শিশ মা’হ মী রা’ন্দান্দ কা’ম
তা’ বেসেহ্হাত আ’মাদ আ’ন দুখতার তামা’ম
দীর্ঘ ৬ মাস উভয়ে কাটাল পরম সুখে
তরুণী ফিরে পেল স্বাস্থ্য, যৌবন পূর্ণরূপে।
হেকিম এবার তার গোপন পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন শুরু করলেন।
বা-দ আয আ’ন আয বাহ্রে উ শরবত বেসা’খ্ত্
তা’ বখোর্দ ও পীশে দুখতর মী গুদা’খ্ত্
হেকিম এবার তৈরি করলেন তার জন্য এক সিরাপ
যখন খেল সে গলতে লাগল তরুণীর সম্মুখে।
স্লো-পয়জনযুক্ত সিরাপ পান করে দিন দিন স্বর্ণকারের স্বাস্থ্য ভাংতে লাগল।
চোন যে রাঞ্জুরী জামা’লে উ নামা’ন্দ
জা’নে দুখতার দার ওয়াবা’লে উ নামা’ন্দ
রোগে শোকে যখন তার রূপ যৌবন চলে গেল
তরুণীর প্রাণও তার প্রেম যন্ত্রণা হতে মুক্তি পেল।
চোঙ্ক যেশ্ত্ ও না’খোশ ও রোখ যার্দ শুদ
আন্দাক আন্দাক দার দেলে উ সার্দ শুদ
যখন বিশ্রী, অসুস্থ বিবর্ণ হলুদণ্ডমুখ হল
ধীরে ধীরে তরুণীর প্রেমে ভাটা পড়ল।
মওলানা এবার বুঝিয়ে বলছেন, রূপ-লাবণ্য যৌবনের আকর্ষণে যে প্রেম, তা আসলে প্রেম নয়, বড়-জোর যৌবনের উন্মাদনা, যা কিছুক্ষণের আনন্দ দেয়। তারপর অনুতপ্ত জীবনের গ্লানি বইতে হয়।
(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে ছায়াপথ প্রকাশনী, মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ১৪৯/এ, এয়ারপোর্ট রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন- CHAYAPATH PROKASHONI)