ঢাকা মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

দেশ-বিদেশে নির্বাচনের বৈচিত্র্য

দেশ-বিদেশে নির্বাচনের বৈচিত্র্য

বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ উপলক্ষে প্রার্থী কিংবা ভোটার সবার মধ্যেই রয়েছে উৎসাহ-উদ্দীপনা। বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই নাগরিকরা ভোট দিয়ে নিজেদের প্রিয় প্রার্থীদের নির্বাচিত করে থাকেন। তবে এর ভিন্নতা রয়েছে প্রত্যেক দেশে। কোথাও বাসায় বসেই ভোট দিতে পারেন, কোথাও ভোট না দেওয়ার জন্য গুণতে হবে জরিমানাও।

বাধ্যতামূলক ভোট : বেলজিয়াম বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র, যারা ১৮৯২ সালে পুরুষদের জন্য এবং ১৯৪৯ সালে নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক ভোটের ব্যবস্থা চালু করে। এখন পর্যন্ত মোট ২২টি দেশে এ নিয়ম চালু রয়েছে। অর্থাৎ সেসব দেশের নাগরিকদের অবশ্যই নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে। নইলে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি পেতে হবে। যেমন- অস্ট্রেলিয়াতে ভোট না দেওয়ার শাস্তি হিসেবে গুণতে হবে ২০-৫০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার জরিমানা। আবার বেলজিয়ামে প্রথমে ৩০ থেকে ৬০ ইউরো জরিমানা করা হবে। তবে চারবারের বেশি ভোট প্রদানে ব্যর্থ হলে দশ বছরের জন্য ভোটাধিকার হারাতে হবে। এ ছাড়া সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানাবিধ সমস্যা হতে পারে। তবে বেলজিয়ামে নিজে উপস্থিত না থেকেও প্রক্সির মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ব্রাজিল এবং ইকুয়েডরে বাধ্যতামূলক ভোটের ব্যবস্থা নিরক্ষরদের জন্য শিথিল করা হয়েছে।

ভোটার হতে বয়স : বিশ্বের প্রায় ২০৫টি দেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর হতে হয়। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। ব্রাজিল ১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো ১৬ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের ভোট প্রদানের সুযোগ দেয়। এরপর অস্ট্রিয়া, ইকুয়েডর, আর্জেন্টিনাসহ প্রায় ১১টি দেশে ১৬ বছর থেকেই ভোট প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনায় বাধ্যতামূলক ভোটের ব্যবস্থা চালু। তা সত্ত্বেও ১৬-১৭ বয়স পর্যন্ত ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে ১৮ বছর বয়স থেকে ভোট না দিলে জরিমানা গুণতে হয়। ইন্দোনেশিয়া এবং ডমেনিক রিপাবলিকে ভোটার হতে বয়স যথাক্রমে ১৭ এবং ১৮ বছর হতে হয়। তবে বিবাহিতরা যেকোনো বয়সে ভোট দিতে পারেন। ২০০৭-এর আগে ইরানে ১৬ বছর থেকে ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল। ২০০৭ সালে তা পরিবর্তন করে করা হয় ১৮ বছর। তবে ১৯৮০ সালের পর থেকে বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করা হয়েছে সেটি। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় ১৮ বছর বয়স থেকেই ভোটের অধিকার পায় সবাই। তবে কারও বয়স ১৬ বা এর বেশি, কিন্তু সে যদি কোনো কর্মক্ষেত্রে যুক্ত থাকে, তবে সে ভোট দিতে পারবে। কিন্তু আরব আমিরাতে ভোট দিতে চাইলে ন্যূনতম ২৫ বছর বয়স হতে হয়।

অনলাইনে ভোট : অনলাইনে কোনো পণ্য বেচাকেনার মতো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন এস্তোনিয়ার নাগরিকরা। ২০০৫ সাল থেকে সে দেশে ই-ভোটিং ব্যবস্থা চালু আছে। ভোট দিতে নাগরিককে নির্বাচনের ওয়েবসাইটে গিয়ে একটি অ্যাপ ডাউনলোড করতে হয়। সেখানে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করে সহজেই নিজের পছন্দের প্রার্থীকে তারা ভোট দিতে পারেন। ভোটারদের পরিচয় গোপন রাখতে যথেষ্ট সচেতন থাকে কর্তৃপক্ষ। এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে দেশের নাগরিকরা নির্বাচন কেন্দ্রে গিয়ে ব্যালট পেপারে ভোট দিতেই বেশি আগ্রহী। ২০১৫ সালের নির্বাচনে দেখা যায়, মাত্র ৩০ শতাংশ নাগরিক অনলাইনে ভোট দিয়েছিলেন।

মার্বেল দিয়ে ভোট : প্রায় ২১ লাখ জনসংখ্যার দেশ গাম্বিয়াতে শিক্ষার হার প্রায় ৫৬ শতাংশ। নিরক্ষরতা যাতে ভোট প্রদানে বাঁধা না হয়ে দাঁড়ায়, তাই সে দেশে গত ৬০ বছর ধরেই মার্বেলের মাধ্যমে ভোট প্রদানের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। নির্বাচনে প্রত্যেক ভোটারকে ব্যালটের একটি স্বচ্ছ মার্বেল দেওয়া হয়। ব্যালট বক্সের পরিবর্তে সেখানে থাকে প্রার্থীর ছবিযুক্ত ড্রাম। ভোটারের যে প্রার্থীকে পছন্দ, সেই প্রার্থীর ড্রামে মার্বেলটি ফেলে দেন। ব্যস, তার ভোট দেওয়া হয়ে গেল। কিন্তু এত মার্বেল গুণতে তো ভুল হওয়ার সম্ভবনা বেশি। তাই তারা ভোট গণনায় ভিন্ন এক পন্থা অবলম্বন করেন। ভোট গণনার জন্য তারা একটি ট্রে ব্যবহার করেন। যাতে ২০০ বা ৫০০টি ছিদ্র থাকে। তারপর মার্বেলগুলো সেই ট্রেতে ঢেলে খুব দ্রুতই ভোট গণনা করে নিতে পারেন। সে দেশের নাগরিকরা একে সহজ এবং সাশ্রয়ী নির্বাচন ব্যবস্থা বলেই দাবি করেন।

প্রচারবিহীন নির্বাচন : বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন নির্বাচনের দিন সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা টিভি চ্যানেলে সারাদিন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকে, নিউজিল্যান্ড পুরোই উল্টো। নির্বাচনের সময়টাতে পুরো দেশই নিশ্চুপ হয়ে যায়। সে সময়ে যেকোনো প্রকারের প্রচারণা সে দেশে নিষিদ্ধ। এমনকি তখন প্রার্থীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়া নির্বাচনের সময় টিভি চ্যানেলগুলো প্রার্থী সম্পর্কে কোনো খবর বা কে জিততে চলেছে, সন্ধ্যা সাতটার আগ পর্যন্ত এসব কিছুই প্রকাশ করতে পারে না। প্রশ্ন জাগতে পারে, এত নিরাপত্তা কেন? সে দেশের নির্বাচন কমিশনের ভয়, এভাবে প্রচারণা বা সংবাদ পরিবেশনে ভোটারদের ভোট প্রদানে প্রভাব ফেলতে পারে। হয়তো বা তাদের ভোট প্রদানেই বিমুখ করে তুলতে পারে। আর যদি কেউ নিয়ম ভঙ্গ করে, তবে তার জরিমানা দশ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

নারীদের ভোটের সুযোগ : নিউজিল্যান্ডই বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র, যারা ১৮৯৩ সালে নারীদের ভোটের অধিকার প্রদান করে। এরপর অস্ট্রেলিয়া, নর্দান ইউরোপের পর ধীরে ধীরে পুরো বিশ্বের নারীরা ভোট প্রদানের সুযোগ পেতে থাকে। সৌদি আরবই এ তালিকায় সর্বশেষ নাম, যারা ২০১৫ সালে নারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেয়। বর্তমানে একমাত্র ভ্যাটিকান সিটিতেই নারীরা ভোট দিতে পারে না। পাকিস্তানের নির্বাচনে নারীদের সবচেয়ে কম অংশগ্রহণ দেখা যায়। ২০১৩ সালের নির্বাচনে ১৭টি আসনের নারী ভোটারদের উপস্থিতি ১০ শতাংশও ছিল না। মূলত পাকিস্তানের গ্রামাঞ্চলে নানা কুসংস্কারের কারণে নারীদের ভোট প্রদানে বিরত রাখা হয়। যদিও পাকিস্তান স্বাধীনতার পর থেকেই নারীদের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করেছিল। দেশটির সংসদে নারীদের জন্য ১৭ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত। অর্থাৎ ৩৪২টি আসনের মধ্যে ৬০টি আসন নারীদের। রাজনৈতিক দলগুলোতেও নারীদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক। তাই নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সাধারণ নির্বাচনে কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থা নেয়। যেকোনো নির্বাচনী এলাকায় মোট ভোটারের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশ নারী ভোটার হতে হয়। নইলে সে নির্বাচন বৈধ বলে গণ্য হয় না। ২০১৮ নির্বাচনে তাই আগের তুলনায় বেশ ভালো নারী উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৩ সালে নারী ভোটার ছিল শুধু একজন, ২০১৮ সালে সে অঞ্চলের ৩৮ শতাংশ নারী ভোটার ভোট দিয়েছিলেন।

প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন : উত্তর কোরিয়া নামে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও মূলত ১৯৪৮ সাল থেকে এটি ওয়ার্কার্স পার্টির একদলীয় শাসনেই চলছে। তাই কিম জং উনের দেশে কীভাবে নির্বাচন সম্ভব, এ প্রশ্ন মাথায় আসতেই পারে। উত্তর কোরিয়াতেও প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন হয়। তবে এ নির্বাচন পদ্ধতি অন্য সব দেশের নির্বাচন থেকে আলাদা। এ দেশের ব্যালট পেপারে থাকে শুধু একটিই নাম। অর্থাৎ ভোটারদের প্রার্থী বাছাইয়ের কোনো সুযোগ নেই। তাই নির্বাচিত প্রার্থী সবসময়ই শতভাগ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হবেন। উত্তর কোরিয়াতেও বাধ্যতামূলক ভোটের ব্যবস্থা রয়েছে। তাই ২০১৫ সালের নির্বাচনে সে দেশের ৯৯.৭ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণ করেছিল।

‘না’ ভোটের গল্প : বাংলাদেশে ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশের ভোটাররা। তখন ব্যালট পেপারের সর্বশেষ প্রার্থীর স্থানটিতে লেখা ছিল ‘ওপরের কাউকে নয়’। নির্বাচনের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সে নির্বাচনে সর্বমোট না ভোট পড়েছিল ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯২৪টি। যদিও পরবর্তীতে ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হয়। বাংলাদেশই একমাত্র রাষ্ট্র, যেখানে এ ব্যবস্থা চালু করার পর আবার তুলে ফেলা হয়। ভারত, ব্রাজিল, স্পেন, ফিনল্যান্ডসহ আরও বেশ কিছু দেশে ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা চালু আছে। যদিও আমেরিকার নেভাডা অঙ্গরাজ্যে ১৯৭৮ সালে প্রথম এ ব্যবস্থাটি চালু হয়েছিল। তবে ২০১৪ সালে চালু হওয়া ভারতেই এই ‘না’ ভোটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যবহার দেখা গেছে।

বড় জালিয়াতির নির্বাচন : লাইবেরিয়ার ১৯২৭ সালের সাধারণ নির্বাচনটি ১৯৮২ সালে জায়গা করে নেয় গিনেজ বুক অব রেকর্ডের পাতায়। সেটি ভোটার উপস্থিতি কিংবা অন্য কোনো ভালো কারণে নয়; জায়গা করে নেয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জালিয়াতির নির্বাচন হিসেবে। তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে চার্লস ডি.বি. কিং যেভাবে ভোট জালিয়াতি করলেন, তাতে পুরো বিশ্ব বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার ভোট পেয়ে তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে দেন। যিনি পেয়েছিলেন মাত্র ৯ হাজার ভোট। এখানে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অবাক তখনই হতে হবে, যখন জানা যাবে, সে নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যাই ছিল মাত্র ১৫ হাজার।

রেজিস্ট্রেশন বাদে ভোটার : ভোটাধিকার প্রয়োগের আগে ভোটার হওয়ার জন্য কমবেশি প্রত্যেক দেশেই নাগরিকদের একটু ব্যস্ত থাকতে হয়। আমাদের দেশেও তেমনই রেজিস্ট্রেশনের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা, স্বাক্ষর করা- এসব দেখা যায়। কিন্তু ফ্রান্স আর সুইডেন এদিক থেকে আলাদা। ভোটারদের রেজিস্ট্রেশনের জন্য কোনো চিন্তাই করতে হয় না। ফ্রান্সে ১৮ বছর বয়স হলেই সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার হয়ে যায়। আর সুইডেনে ট্যাক্স নিবন্ধনের ওপর ভিত্তি করে ভোটার হতে হয়। আমেরিকার শুধু অরিগন অঙ্গরাজ্যে এ ব্যবস্থা চালু আছে। আবার কানাডায় নির্বাচনের জন্য রেজিস্ট্রেশন করার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। প্রার্থী ভোট দিতে এসেই রেজিস্ট্রেশন করতে পারে।

ভোট প্রদানে পছন্দনীয় দিন : বাংলাদেশে দুটি জাতীয় নির্বাচন রোববারে হলেও এর আগের নির্বাচনে ধরাবাঁধা কোনো দিন ছিল না। তবে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই নির্বাচন হয় রোববারে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়াতে ভোট দিতে ব্যক্তিগত কাজে কোনো প্রভাব পড়ে না। তবে যাদের প্রাথমিক ভাষা ইংরেজি, তাদের ক্ষেত্রে এ নিয়মের ব্যতিক্রম দেখা যায়। যেমন- আমেরিকায় ভোটের দিন মঙ্গলবার, কানাডায় সোমবার, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে শনিবার। আমেরিকানদের নভেম্বর মাস এবং মঙ্গলবার ভোট দেওয়ার পেছনে একটি কারণ আছে। ১৮৪৫ সালে সরকার ঘোষণা করে, নভেম্বর মাসের প্রথম মঙ্গলবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর মূল কারণ ছিল, তখনকার কৃষক এবং দুর্বল যাতায়াত ব্যবস্থা। শীতের আগে যাতে ফসল কেটে ভোট দিতে পারে, সেজন্য নভেম্বর বেছে নেওয়া হয়। আর বাজারের দিন ছিল বুধবার, তাই যাতে বাজারে ফসল নিয়ে আসার পর একইসঙ্গে ভোট দিয়ে যেতে পারে, সেজন্য মঙ্গলবার বেছে নেওয়া হয়। তবে আমেরিকায় ছুটির দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়াতে মোট ভোট প্রদানের হার কম।

মহাশূন্য থেকে ভোট : ১৯৯৭ সালে পাস হওয়া টেক্সাসের একটি আইন অনুযায়ী, মহাকাশে অবস্থানকালে মহাকাশচারীরাও ভোট দিতে পারবেন। সে বছরই প্রথম ভোট দেন আমেরিকান মহাকাশচারী ডেভিড উলফ। তবে এ নিয়ম শুধু টেক্সাসের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

ভোটে জয় গন্ডারের : যদিও এটা জাতীয় নির্বাচনের ঘটনা নয়, তবু মানুষ রেখে গন্ডারকে কেন নির্বাচিত করবে মানুষ? ঘটনাটি ১৯৫৯ সালে ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরের। সে শহরের মানুষ সিটি কর্পোরেশনের দুর্নীতির ওপর এতটাই ক্ষেপেছিল যে, তারা কাকারেকো নামের পাঁচ বছরের একটি গন্ডারকে নির্বাচিত করে। কাকারেকো শুধু ভোটেই জেতেনি, প্রায় ১ লাখ ভোট পেয়ে তখন রেকর্ড করে। কাকারেকো ১৯৬২ সালে মারা গেলেও তাকে এখনও নির্বাচনে ‘প্রতিবাদ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ১৯৫৪ সালে ফ্র্যাগরেন্ট নামের এক ছাগলও জাবোয়াতাও সিটি কাউন্সিলের ভোটে নির্বাচিত হয়। ইকুয়েডরের একটি শহরে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিল একটি ফুটপাউডার।

নির্বাচন পদ্ধতির বৈচিত্র্য : দেশে দেশে রাষ্ট্রপতি, সংসদ বা আইনসভার সদস্যসহ বিভিন্ন সংস্থায় প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য নানা ধরনের নির্বাচন পদ্ধতি চালু রয়েছে। এসব পদ্ধতির নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ও সুবিধা পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক সময়ে সময়ে সংশোধন করে বিভিন্ন দেশ তাদের কাছে উত্তম বিবেচিত নির্বাচন পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এখনও প্রয়োজনের তাগিদে নির্বাচন পদ্ধতি কোনো কোনো দেশে সংস্কার বা সংশোধন হয়। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন নির্বাচনে প্রচলিত ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশ পদ্ধতিগুলো বেশ বৈচিত্র্যময়। কোনো কোনো দেশে ব্যালট পেপার খানিকটা জটিল। অনেক ক্ষেত্রে ভোট গণনা এবং বিজয়ী প্রার্থী নির্বাচন করতে জটিল গাণিতিক সূত্র ব্যবহার করা হয়। এমনকি কিছু দেশে আইনসভায় কোন দল কত আসন পাবে, তা নির্ধারণ করতে অত্যন্ত জটিল হিসাবের প্রয়োজন হয়। নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য কিছু পদ্ধতি হলো-

প্লুরালিটি ভোটিং : আমাদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত নির্বাচন পদ্ধতি এটি। প্লুরালিটি ভোটিং সিস্টেমে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন, তিনি বিজয়ী হবেন। মোট কাস্টিং ভোটের মেজরিটি অর্থাৎ শতকরা ৫০ ভাগ অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি ভোট পাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এ পদ্ধতির প্রধান দুটি ধরন। যথা- ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট এবং ব্লক ভোটিং।

ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট : যেখানে একটি পদ যেমন রাষ্ট্রপতির পদ বা আইনসভার প্রতিটি নির্বাচনি এলাকার জন্য একটি করে পদ পূরণের জন্য প্রার্থীগণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, সেখানে প্লুরালিটি ভোটিং পদ্ধতিটি ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট নামে পরিচিত। এ পদ্ধতিতে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন, তিনিই বিজয়ী। আর কোনো সমীকরণ এখানে বিবেচ্য নয়। এটি বিশ্বজুড়ে আইনসভার নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত নির্বাচনি পদ্ধতি; যা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ মোট ৫৮টি দেশে ব্যবহৃত হয়। যার অধিকাংশই বর্তমান বা প্রাক্তন ব্রিটিশ বা আমেরিকান উপনিবেশ বা অঞ্চল। এ পদ্ধতি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্যও ব্যবহৃত দ্বিতীয় সর্বাধিক সাধারণ পদ্ধতি। বর্তমানে ১৯টি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ব্লক ভোটিং : একটি নির্বাচনি এলাকায় যদি একাধিক পদ থাকে, একজন ভোটার একই ব্যালটে একাধিক প্রার্থীকে ভোট দেয় এবং একাধিক প্রার্থী বিজয়ী হয়, সেখানে প্লুরালিটি ভোটিং পদ্ধতিকে ব্লক ভোটিং বলা হয়। এ পদ্ধতিতে নির্বাচনি এলাকায় যতগুলো পদ আছে, প্রাপ্ত ভোটের দিক থেকে ওপরের দিকে থাকা ততজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। আমাদের দেশে স্থানীয় সরকারের সদস্য নির্বাচনে এ ব্লক ভোটিং সিস্টেম চালু ছিল। তখন একটি ওয়ার্ডে একাধিক সদস্য নির্বাচিত হতেন।

ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতি : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন একটি অনন্য, বিশেষ ধরনের পদ্ধতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়; যা ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ পদ্ধতি নামে পরিচিত। কোনো রাজ্যে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি পপুলার ভোট পান, তিনি সেই রাজ্যের সব ইলেকটোরাল ভোট লাভ করেন। এভাবে যে প্রার্থী সারাদেশে মোট ৫৩৮-এর অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ন্যূনতম ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট পান, তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ইলেকটোরাল কলেজ ব্যবস্থার কারণে কখনও একজন প্রার্থী সারাদেশে পপুলার ভোট বেশি পেয়েও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন না; যদি তিনি ইলেকটোরাল ভোটে পরাজিত হন। উদাহরণস্বরূপ ২০০০ এবং ২০১৬ সালের নির্বাচনে এটি ঘটেছে।

মেজরিটি বা রান-অব পদ্ধতি : এ সিস্টেমে প্রার্থীকে নির্বাচিত হতে হলে অবশ্যই কাস্টিং ভোটের মেজরিটি অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি ভোট পেতে হয়। এ পদ্ধতির দুটি প্রধান রূপ; যথা- দুই রাউন্ড পদ্ধতি ও ইন্সট্যান্ট রান-অব ভোটিং।

দুই রাউন্ড পদ্ধতি : মেজরিটি পদ্ধতির প্রধান একটি রূপ হলো দুই রাউন্ড পদ্ধতি; যা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নির্বাচন পদ্ধতি। ফ্রান্সসহ বিশ্বব্যাপী ৮৮টি দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য এবং ২০টি দেশে আইনসভার সদস্য নির্বাচনের জন্য এটি প্রচলিত। এ সিস্টেমে প্রথম রাউন্ডে যদি কোনো প্রার্থী কাস্টিং ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পান, তবে প্রথম রাউন্ডে শীর্ষ থাকা দুই প্রার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় রাউন্ড নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেহেতু দ্বিতীয় রাউন্ডে মাত্র দুজন প্রার্থী থাকে, সেহেতু যিনি বেশি ভোট পাবেন, তিনি অবশ্যই কাস্টিং ভোটের শতকরা ৫০ ভাগের বেশি পাবেন এবং তিনিই বিজয়ী হবেন।

ব্যালটেজ : কিছু দেশ দুই রাউন্ড পদ্ধতির একটি পরিবর্তিত রূপ ব্যবহার করে। যেমন- ইকুয়েডরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো প্রার্থী যদি কাস্টিং ভোটের ন্যূনতম ৪০ শতাংশ ভোট পান এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে অন্তত ১০ শতাংশ এগিয়ে থাকেন, তবে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। আর্জেন্টিনায় এ পদ্ধতিটি ব্যালটেজ নামে পরিচিত। এতে বিজয়ের জন্য প্রার্থীকে কাস্টিং ভোটের ন্যূনতম ৪৫ শতাংশ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে অন্তত ১০ শতাংশ বেশি ভোট পেতে হয়।

এক্সহস্টিভ ব্যালট : মেজরিটি পদ্ধতির আরেকটি ধরন হলো- এক্সহস্টিভ ব্যালট। এ পদ্ধতিতে প্রথম রাউন্ড শেষে যদি কোনো প্রার্থী মেজরিটি ভোট না পায়, তাহলে সর্বনিম্ন ভোট প্রাপ্ত প্রার্থীকে বাদ দিয়ে বাকিদের মধ্যে দ্বিতীয় রাউন্ড নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবারও যদি কোনো প্রার্থী মেজরিটি ভোট না পায়, দ্বিতীয় রাউন্ডে সর্বনিম্ন ভোট প্রাপ্ত প্রার্থীকে বাদ দিয়ে তৃতীয় রাউন্ড নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রক্রিয়াটি পুনরাবৃত্তি ঘটবে যতক্ষণ না কোনো প্রার্থী মেজরিটি ভোট পায়।

ইন্সট্যান্ট রান-অব ভোটিং : মেজরিটি বা রান-অব পদ্ধতির আরেকটি রকম হচ্ছে ইন্সট্যান্ট রান-অব ভোটিং সিস্টেম। দুই রাউন্ড সিস্টেমের সঙ্গে পার্থক্য হলো, এখানে ভোটার একবারই ভোট দেন, তবে প্রার্থীদের পছন্দক্রমে র‌্যাঙ্ক করেন। কোনো প্রার্থী যদি প্রথম রাউন্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট না পান, তবে সর্বনিম্ন র‌্যাঙ্কপ্রাপ্ত প্রার্থীকে বাদ দিয়ে তার প্রাপ্ত ভোটের দ্বিতীয় পছন্দ অনুযায়ী অন্য প্রার্থীদের গণনায় যুক্ত হয়। যদিও ভোটারগণ একবার মাত্র ভোট দেন, কিন্তু গণনা প্রক্রিয়া চলতে থাকে যতক্ষণ না কোনো প্রার্থী মোট ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি পান। অস্ট্রেলিয়া ও পাপুয়া নিউগিনির আইনসভা নির্বাচনে এ সিস্টেম ব্যবহৃত হয়।

কন্টিনজেন্ট ভোট : ইন্সট্যান্ট রান-অব ভোটিংয়ের একটি পরিবর্তিত রূপ হলো কন্টিনজেন্ট ভোট; যেখানে ভোটারদের সব প্রার্থীকে র‌্যাঙ্ক করতে হয় না; বরং সীমিতসংখ্যক পছন্দ দেওয়ার সুযোগ থাকে। প্রথম রাউন্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে শীর্ষ দুই প্রার্থী বাদে অন্য সব প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়।

বাদ পড়া প্রার্থীদের ভোটের পছন্দক্রম যুক্ত করে বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়। এ সিস্টেমে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যবহারের বিধান আছে, যেখানে ভোটারদের তিনটি পছন্দ দেওয়ার সুযোগ থাকে। তবে ১৯৮১ সালে এ পদ্ধতি প্রবর্তনের পর প্রতিবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম রাউন্ডেই একজন প্রার্থী মেজরিটি ভোট পেয়ে যাচ্ছে। ফলে পরবর্তী পছন্দক্রম গণনা পদ্ধতি প্রয়োগের সুযোগ হয়নি।

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ভোটিং : আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ভোটিং সিস্টেম বর্তমানে উন্নত পশ্চিমা গণতন্ত্রের মধ্যে আইনসভার সদস্য নির্বাচনের প্রধান পদ্ধতি। পশ্চিম ইউরোপের অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, সাইপ্রাস, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন এবং সুইজারল্যান্ডসহ পৃথিবীতে মোট ২১টি দেশ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব সিস্টেম ব্যবহার করে।

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ভোটিং পদ্ধতিতে দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন দেশভেদে জেলাভিত্তিক হয়; আবার জাতীয় ভিত্তিতেও হয়; আবার কোনো দেশে মিশ্র পদ্ধতিও চালু আছে। উদাহরণস্বরূপ ১০ আসনের একটি জেলায় যদি ‘ক দল’ ৫০ শতাংশ ভোট পায়, ‘খ দল’ ৩০ শতাংশ ভোট পায় এবং ‘গ দল’ ২০ শতাংশ ভোট পায়, তাহলে ‘ক দল’, ‘খ দল’ এবং ‘গ দল’ যথাক্রমে ৫টি, ৩টি ও ২টি আসন পাবে। জাতীয় ভিত্তিতে আসন বণ্টন একইভাবে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে হয়।

নির্বাচন,বৈচিত্র্য
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত