প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে, ইতিহাস নতুন নতুন রূপে ফিরে আসে মানুষের মধ্যে। তেমনি এক ইতিহাসের ঘটনা বদলায়, তারিখ বদলায়, ক্ষমতার ভাষা বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের এক বিশেষ বাহিনীর আচরণ যেন একই পাতায় আটকে আছে। জুলাই ২০২৪ এর রাজপথে যে রক্ত ঝরেছিল, যে আর্তনাদ শোনা গিয়েছিল, তা এখনও বাতাসে ভাসে। সেই বাতাসই আজ আবার ভারী হয়ে উঠেছে ইনকিলাব মঞ্চে হাদি হত্যার বিচার চাওয়া সমাবেশে। ইতিহাস এখানে ধীরে হাঁটেনি, এ যেন ইতিহাসের দ্রুততম পুনরাবৃত্তি। নতুন পোশাক, নতুন ব্যানার, নতুন ব্যাখ্যা কিন্তু পুরোনো দমননীতি অক্ষত।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশ এক ভয়াবহ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়। সাধারণ জনগণ, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর রাষ্ট্রের রক্ষক বাহিনীর যে নির্মমতা নেমে এসেছিল, তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে অশান্তির নামে দমন করা হয়েছিল, আর সেই দমনের ভাষা ছিল লাঠি, গুলি, কাঁদানে গ্যাস ও নির্বিচার গ্রেপ্তার। রাজপথে পড়ে থাকা রক্তাক্ত শরীরগুলো শুধু ব্যক্তি নয় সেগুলো ছিল নাগরিক অধিকারের প্রতীক। সে সময় সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তি দাঁড় করালেও বাস্তবে দেখা গেল, ক্ষমতার ভয় আন্দোলনের কণ্ঠরোধে পরিণত হয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা প্রমাণ করেছিল সত্য দেখানোও তখন অপরাধ।
সময় বদলেছে, সরকার বদলেছে এমন দাবি শোনা যায়। কিন্তু ইনকিলাব মঞ্চের হাদি হত্যার বিচার চাওয়া সমাবেশে পুলিশের আচরণ দেখিয়ে দিল, বদলটা মূলত কাগজে-কলমে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, ন্যায়বিচারের দাবি এসবের জবাব আবারও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। লাঠিচার্জ, ধাক্কাধাক্কি, ভয় দেখান সব পরিচিত। যারা জুলাইয়ে আহত হয়েছিল, তাদের অনেকেই আজও বিচার পায়নি, আর সেই অসমাপ্ত বিচারের ভার নিয়েই নতুন করে দমন নামছে। এটা কি শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির ফল? যদি একই দৃশ্য বারবার ফিরে আসে, তবে সমস্যাটি ব্যক্তির না ব্যবস্থার। ইতিহাস বলে, যখন রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কথা শোনার বদলে শক্তি প্রয়োগে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন সংঘাত অনিবার্য হয়। জুলাইয়ের ঘটনার পর নানা তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল কিন্তু দৃশ্যমান বিচার কয়টাই বা হয়েছে? হাদি হত্যার ঘটনায়ও দেখা যাচ্ছে, বিচার চাওয়ার পথেই বাধা। উদাহরণগুলো স্পষ্ট, আন্দোলন হলে প্রথম প্রতিক্রিয়া হিসেবে পুলিশ মোতায়েন, ব্যারিকেড, এরপর বলপ্রয়োগ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদ-ে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ দমন গুরুতর লঙ্ঘন তবু আমাদের বাস্তবতায় সেটিই যেন নিয়ম। এই পুনরাবৃত্তির পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, জবাবদিহির অভাব। পুলিশি সহিংসতার প্রকৃত বিচার না হওয়ায় একই আচরণ উৎসাহ পায়। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাব। পুলিশকে নাগরিক সেবার বাহিনী না দেখে ক্ষমতার রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা। তৃতীয়ত, প্রশিক্ষণ ও মানসিকতার ঘাটতি। সমাবেশ ব্যবস্থাপনা ও মানবাধিকারভিত্তিক পুলিশিংয়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। চতুর্থত, সরকারি দ্বিচারিতা। একদিকে গণতন্ত্রের কথা, অন্যদিকে ভিন্নমত দমনে নীরব সম্মতি।
সমাধান কঠিন নয়, যদি সদিচ্ছা থাকে। জুলাই ২০২৪ এর সহিংসতার স্বাধীন ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ, পদোন্নতি ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা এবং সমাবেশ ব্যবস্থাপনায় বলপ্রয়োগকে সর্বশেষ বিকল্পে সীমিত রাখতে হবে। সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে স্বচ্ছতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ঘোষণা ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন রাষ্ট্রের শত্রু নয়’ নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন পোশাকে পুরাতন পুলিশের চরিত্র দৃশ্যমান হওয়া মানে রাষ্ট্র তার অতীত থেকে শিক্ষা নিচ্ছে না। ইতিহাস যদি বারবার ফিরে আসে, তবে তা কাকতালীয় নয়, এটি নীতিগত ব্যর্থতা। জুলাইয়ের রক্ত এখনও শুকায়নি। ইনকিলাব মঞ্চ সেই ক্ষত নতুন করে মনে করিয়ে দিল। সরকার যদি সত্যিই নতুন অধ্যায় শুরু করতে চায়, তবে দমন নয় শুনতে শিখতে হবে। বিচার চাওয়া অপরাধ নয়, ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলে তা অবিচারে রূপ নেয়। রাষ্ট্রের শক্তি লাঠিতে নয়, ন্যায়ে। আর সেই ন্যায় প্রতিষ্ঠা না হলে, ইতিহাস আবারও ফিরে আসবে আরও দ্রুত, আরও নির্মমভাবে।
নুসরাত জাহান (স্মরনীকা)
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়