ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পাবনা–কুষ্টিয়া সীমান্ত চরাঞ্চলের মানুষ নিকট জেলায় অন্তর্ভুক্তির দাবি

পাবনা–কুষ্টিয়া সীমান্ত চরাঞ্চলের মানুষ নিকট জেলায় অন্তর্ভুক্তির দাবি

পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলার সীমান্ত এলাকার পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে বসবাসকারী অবহেলিত মানুষ নিকট জেলায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কয়েক যুগ কেটে গেলেও অবহেলিত এসব চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি। এসব অঞ্চলে নেই চিকিৎসা ব্যবস্থা, নেই পুলিশ ক্যাম্প, পোস্ট অফিস, ব্যাংক ও জরুরি সরকারি সেবা। রাস্তা-ঘাট, অবকাঠামোসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা।

দুই জেলার ১৬টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ প্রমত্তা পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে নিজ নিজ জেলায় যাতায়াত করেন। কাগজ-কলমে তারা এক জেলার বাসিন্দা হলেও হাটবাজার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনযাপন সবই করতে হয় অন্য জেলার সাথে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদ্মা নদীর জেগে ওঠা চরাঞ্চলের সীমানা ভাগাভাগির জটিলতায় পাবনা জেলার ৭টি গ্রাম পদ্মার ওপারে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলায় এবং কুষ্টিয়ার ৯টি গ্রাম পদ্মার এপারে পাবনা সদর উপজেলার সঙ্গে রয়ে গেছে। পাবনার সদর উপজেলার দোগাছি ও ভাড়ারা ইউনিয়নের চরভবানীপুর, খাসচর, কণ্ঠবজরা, ধাবড়াকোল, বলরামপুর গ্রাম পদ্মার ওপারে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর নিকটে অবস্থিত।

এসব গ্রামের বাসিন্দারা হাটবাজার, চিকিৎসাসহ দৈনন্দিন জীবনযাপন কুমারখালী ও কুষ্টিয়া শহরের ওপর নির্ভরশীল। শুধুমাত্র জরুরি জমির কাগজপত্র ও থানা-কাচারির কাজে পাবনা শহরে আসতে হয় তাদের। নদী বিচ্ছিন্ন এসব মানুষদের দুর্বিষহ কষ্ট নিয়ে নৌকায় ভেসে, পদ্মার উত্তপ্ত বালুচরে মাইলের পর মাইল হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়।

সরেজমিনে ৮ মে, শুক্রবার পাবনা সদরের কোমরপুর পদ্মা নদীর ওপার থেকে নৌকায় করে ঘাটে আসতে দেখা যায় পাবনা জেলার বাসিন্দাদের। পাবনা ধাবড়াকোল এলাকা থেকে মো. সুজন নৌকায় পদ্মা পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন কোমরপুর আসেন স্থানীয় ইটের ভাটায় কাজ করতে। তিনি জানান, প্রতিদিন যাতায়াতে নৌকার ভাড়া দিতে হয় একশ টাকা। শুষ্ক বালুচরে অটোবাইকের ভাড়া না থাকায় হেঁটে গন্তব্যে চলেন তিনি।

নদীর খেয়াঘাটে অটোবাইকে এসে নামতে দেখা যায় চর ঘোষপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের একটি ফুটবল দলকে। আকাশে কালো মেঘ, বৈরী আবহাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে এসব শিশুরা যাবে নিজ জেলা কুষ্টিয়ায় একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নিতে। এসব ক্ষুদে ফুটবলাররা জানায়, সময়মতো নদী পাড় হতে না পারলে টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া যাবে না।

কোমরপুর পদ্মা নদী ঘাটের খেয়া নৌকার মাঝি রমজান মোল্লা বলেন, প্রতিদিন কয়েকশ মানুষ প্রয়োজনীয় কাজে নিজ জেলায় যাতায়াত করে নৌকায়। শুষ্ক মৌসুমে নদীর চরে অনেকটা পথ তাদের অটোবাইকে যেতে হয়।

চরভবানীপুর থেকে পদ্মা পাড়ি দিয়ে পাবনায় জন্ম নিবন্ধনের কাজে এসেছেন মো. আবু শরিফ হাসনাত। তিনি বলেন, বর্ষার সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে নদীপথে আসতে হয়। পাবনা শহরে একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন মো. আশরাফ উদ্দিন। প্রতিদিন পদ্মা পাড়ি দিয়ে নিজ জেলায় আসা সম্ভব না হওয়ায় পাবনা শহরে ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। তিনি বলেন, নিকট জেলার সাথে অন্তর্ভুক্তিই সকল সমস্যার সমাধান হতে পারে।

পাবনা সদর উপজেলার গা ঘেঁষে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চরসাদিপুর ইউনিয়ন। চরসাদিপুর ইউনিয়ন থেকে নিজ জেলা কুষ্টিয়া শহরে যেতে ২৯ কিলোমিটার পদ্মার উত্তপ্ত ধুধু বালুচরে পায়ে হেঁটে ও নদী পাড়ি দিতে হয়।

চরসাদিপুর ইউনিয়নের ৯টি গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বসবাস করে। কুষ্টিয়া জেলার এই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের হাট-বাজার, শিক্ষা, চিকিৎসা সবই পাবনা শহরের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন তাদের কর্মসংস্থানের জন্য পাবনা শহরে আসতে হয়। চরসাদিপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তায় ইট-খোয়া বিলীন হয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে রাস্তায় হাঁটুসম ধূলায় চলাচল করে গাড়ি। গ্রীষ্মে ধূলার কারণে তাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় চরম অবহেলিত চরসাদিপুরের মানুষ।

প্রশাসনের নজরদারির অভাবে সেখানে মাদক, বাল্যবিবাহ, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানান অপরাধমূলক কাজ বাড়ছে। স্থানীয়রা বলেন, চরসাদিপুরের বাসিন্দাদের চলাচল, হাট-বাজার, শিক্ষা চিকিৎসা সবই পাবনায়। ইউনিয়নটি পাবনার সাথে সংযুক্ত হলে অবহেলিত জনগোষ্ঠী আলোর মুখ দেখবে। এই ইউনিয়নে পদ্মার দুর্গম চর পাড়ি দিয়ে পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তারা আসে না। যুগ যুগ ধরে সরকারি সেবা বঞ্চিত তারা।

চরসাদিপুরের বাসিন্দা মো. আলতাফ হোসেন বলেন, শতকরা ৯০ ভাগ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ইউনিয়নটি পাবনা জেলার সাথে সংযুক্ত করা হোক।

পাবনা সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী সামান্তা ইসলাম বলেন, এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র নদীর ওপারে। নদীপথে বাড়ি থেকে সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে না শিক্ষার্থীরা। সেজন্য অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে অনেক শিক্ষার্থী পাবনা জেলার বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি হয়।

গৃহিণী মমতা পারভীন বলেন, তিনি কুষ্টিয়া জেলার বাসিন্দা হলেও ৬০ বছরের জীবনে কুষ্টিয়া যাননি। নিজ চোখে কুষ্টিয়া শহরও দেখেননি। পাবনা জেলা শহরেই তাদের হাটবাজার, চিকিৎসাসহ সব কাজ হয়।

প্রমত্তা পদ্মা নদী বিচ্ছিন্ন বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অবস্থানের ভিত্তিতে নিকট জেলার সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিই হতে পারে এই সংকট সমাধানের একমাত্র উপায় বলে মনে করেন পদ্মা নদী বিচ্ছিন্ন অবহেলিত চরাঞ্চলের মানুষ।

এ বিষয়ে পাবনা সদর উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও নির্বাহী কর্মকর্তা তামারা তাসবিহা বলেন, নতুন যোগদানের কারণে বিষয়টি নিয়ে অবগত নই।

তবে পাবনা জেলা প্রশাসনের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে তিনি জানান, মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে নদী বিচ্ছিন্ন এসব অঞ্চলের সীমানা জটিলতা নিরসন করে নিকট জেলার সাথে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ চলছে।

অন্তর্ভুক্তির দাবি,জেলা,চরাঞ্চলের মানুষ,পাবনা–কুষ্টিয়া সীমান্ত
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত