
ঘনিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবার দেশের ভোটারদের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নির্বাচনি অঙ্কে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। নির্বাচনে প্রবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে তা শুধু ভোটের হিসাব-নিকাশই নয়, বরং সামগ্রিক নির্বাচনি ফলাফলেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শেষ পর্যন্ত ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এরইমধ্যে নিবন্ধিত ভোটারের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠানোর কাজ সম্পন্ন করেছে ইসি।
জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পেছনে প্রবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিল। সেজন্য অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরেই প্রবাসীদের ভোট নিশ্চিত করার কথা বলে, সেই অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন প্রবাসীদের ভোট নিশ্চিত করতে বেশকিছু উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থানরত লাখো প্রবাসী বাংলাদেশির ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়টি এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নে প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে বিদেশে বসবাসরত ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোও প্রবাসী ভোটারদের সমর্থন আদায়ে সক্রিয় হয়েছে। বিভিন্ন দেশভিত্তিক সংগঠনের মাধ্যমে সভা-সমাবেশ, মতবিনিময় ও অনলাইন প্রচারণা জোরদার করা হচ্ছে। প্রবাসীদের ভোটের প্রবণতা নির্বাচনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) আশা করছে, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেবেন। নিবন্ধনকারী ৯০ শতাংশেরও বেশি প্রবাসী ভোটার এবার ভোট দেবেন। এছাড়া, দেশের অভ্যন্তরে ‘ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোট’ ক্যাটাগরিতে ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো শুরু হবে।
ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরে নিবন্ধনকারীদের মধ্যেও ৯০ শতাংশের বেশি ভোট দেবেন। এই পরিস্থিতিতে পোস্টাল ভোট নির্বাচনের ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের মতে, যেসব আসনে ৫ হাজারের বেশি পোস্টাল ভোট পড়বে, সেখানে জয়-পরাজয় নির্ধারণে এই ভোটগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, ১৮১টি আসনে ৪ হাজারেরও বেশি পোস্টাল ভোট পড়বে। এর মধ্যে ১৮টি আসনে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। ৯টি আসনে ৯ হাজারের বেশি, ১০টি আসনে ৮ হাজারের বেশি, ১১টি আসনে ৭ হাজারের বেশি এবং ২১টি আসনে ৬ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এ ছাড়া ৪৬টি আসনে ৫ হাজারের বেশি এবং ৬৬টি আসনে ৪ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেন। সব মিলিয়ে ১১৬টি আসনে ৫ হাজারের বেশি পোস্টাল ভোট পড়বে, যা ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আসন ও জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান: আসনভিত্তিক নিবন্ধনে ফেনী-৩ আসন সবার শীর্ষে, এখানে ১৬ হাজার ৯৩ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এরপরই চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ১৪ হাজার ৩০১ জন নিবন্ধন করেছেন।
এদিকে, জেলাভিত্তিক নিবন্ধনে শীর্ষে রয়েছে কুমিল্লা। সেখানে ১ লাখ ১২ হাজার ৯০ জন ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন। এরপর ঢাকায় ১ লাখ ৮ হাজার ৭৫৫ জন এবং চট্টগ্রামে ৯৫ হাজার ২৯৭ জন ভোটার পোস্টাল ভোটে নিবন্ধন করেছেন। আউট অব কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন (ওসিভি-এসডিআই) প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান বলেন, ‘ফেনী-৩ আসনে ১৬ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন। নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে ৫ হাজার ভোটই অনেক বড় ফ্যাক্টর হতে পারে। দেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম পোস্টাল ভোট এবং আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি।
এখন ব্যালট পাঠানোর পর কি পরিমাণ ফিরে আসে সেটি দেখার বিষয়। তবে আমরা আশাবাদী যে ৯০ শতাংশের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন।’ তিনি জানান, প্রায় ৩ হাজার প্রবাসী সঠিক ঠিকানা না দেওয়ায় তাদের কাছে ব্যালট পাঠানো সম্ভব হবে না। বাকিদের কাছে দ্রুত ব্যালট পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেশের ভেতরের ভোটারদের ক্ষেত্রে ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর ব্যালট পাঠানো হবে। তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরে পোস্টাল ভোট দিতে ব্যালট পাঠানো ও ফেরত আসা মিলিয়ে মোট ৭ দিন সময় লাগতে পারে।
গোপনীয়তা ও সর্তকতা: পোস্টাল ব্যালটের গোপনীয়তা রক্ষা করা ভোটারের দায়িত্ব। কেউ এটি লঙ্ঘন করলে তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্লক করা হতে পারে বলে সালীম আহমাদ খান সতর্ক করে দেন।
ভোট দেওয়ার নিয়মাবলী : ইসির পরিপত্র অনুযায়ী, পোস্টাল ব্যালট পেপারে সব প্রতীক মুদ্রিত থাকবে এবং প্রতীকের পাশে ফাঁকা ঘর থাকবে। ভোটাররা ভোটাধিকার প্রয়োগের আগে নির্দেশনাপত্র পড়ে ঘোষণাপত্রে ব্যালটের ক্রমিক নম্বর, নিজের নাম, এনআইডি নম্বর লিখে স্বাক্ষর করবেন। ঘোষণাপত্র ছাড়া ব্যালট বৈধ হবে না। নিরক্ষর বা অক্ষম ব্যক্তি অন্য একজন বৈধ ভোটারের সাহায্য নিয়ে ফরমণ্ড৮ এর সংশ্লিষ্ট অংশ পূরণ ও সত্যায়ন করতে পারবেন। প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হওয়ার পর ভোটাররা ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে লগইন করে নিজ আসনের প্রার্থীদের তালিকা দেখতে পাবেন। সেখানে ব্যালটের প্রতীকের পাশে ফাঁকা ঘরে টিক বা ক্রস চিহ্ন দিয়ে ভোট দেবেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে অ্যাপে ভিডিও টিউটোরিয়াল বা ডিজিটাল কন্টেন্ট থাকবে। ভোট দেওয়ার পর ব্যালটটি একটি ছোট খামে ভরে বন্ধ করতে হবে। এরপর ওই ছোট খাম ও স্বাক্ষরিত ঘোষণাপত্রটি রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা লেখা একটি বড় খামে ভরে ডাকযোগে পাঠাতে হবে। উভয় খামেই সেলফ অ্যাডহেসিভ (আঠা) অংশের উপরিভাগের টেপটি খুলে নিলেই খাম বন্ধ হবে। এই খাম পাঠানোর জন্য ভোটারকে কোনো ডাক মাশুল বা খরচ দিতে হবে না, এটি সরকার বহন করবে।
গণনা ও পর্যবেক্ষণ : পোস্টাল ভোটগণনা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রাপ্ত সব ব্যালটই গণনার আওতায় আসবে। ভোটাররা অ্যাপের মাধ্যমেই তাদের ব্যালটের অবস্থান ট্র্যাক করতে পারবেন। রিটার্নিং অফিসার ব্যালট পাওয়ার পর কিউআর কোড স্ক্যান করে রেকর্ড রাখবেন এবং সফটওয়্যার থেকে ‘ফরমণ্ড১২’ জেনারেট করে স্বাক্ষর করবেন। ভোট গণনার সময় রিটার্নিং অফিসার প্রথমে ঘোষণাপত্রটি পরীক্ষা করবেন। স্বাক্ষর না থাকলে সেটি বাতিল করা হবে। গণনার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে আলাদা কক্ষ থাকবে এবং প্রার্থী বা তাদের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও পর্যবেক্ষকরা সেখানে উপস্থিত থাকতে পারবেন। রিটার্নিং অফিসার সফটওয়্যারে লগইন করে পোস্টাল ভোটের সামগ্রিক চিত্র দেখতে পাবেন। প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ২৩ হাজার ৬০৯ জন নিবন্ধন করেছেন। এছাড়া মালয়েশিয়ায় ৭৬ হাজার ৬৬০ জন, কাতারে ৭৩ হাজার ৪৬৮ জন, ওমানে ৫১ হাজার ১৬৩ জন এবং কুয়েতে ৩৩ হাজার ৬০৭ জন প্রবাসী ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম মনে করেন, এবারের নির্বাচনে আসনভিত্তিক জয়-পরাজয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে পোস্টাল ব্যালট। পোস্টাল ব্যালটের কারণে ভোট পড়ার হার বেড়ে নির্বাচনি ফলাফলের ইতিহাসে বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। পোস্টাল ব্যালট ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়াবে বলেও জানান এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ।