ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

প্রধানমন্ত্রী ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ‘পেইড’ অপপ্রচারের অভিযোগ

প্রধানমন্ত্রী ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ‘পেইড’ অপপ্রচারের অভিযোগ

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদ সবেমাত্র পাঁচ মাস অতিক্রম করেছে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেশে নজিরবিহীন ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমান একের পর এক জনগুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সরকারের এসব কর্মকাণ্ড দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

তবে এতে ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক গোষ্ঠী ভিন্ন কৌশলে মাঠে নেমেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে, আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোন কোন নেতা তার সঙ্গে দেশে ফিরবেন, তার একটি তালিকাসহ ‘ডিসেম্বর টু মার্চ’ রূপরেখা বা রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। শেখ হাসিনার নির্দেশে তার দেশে ফেরার অনুকূল প্রেক্ষাপট তৈরি করতে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার মিশন নিয়ে তার দোসররা মাঠে নেমেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমান সরকারকে দুর্বল ও দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে তারা পরিকল্পিতভাবে নানামুখী প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ষড়যন্ত্রকারীদের এই চক্রান্তের ফাঁদে পা দিচ্ছেন বিএনপির কিছু অসাধু ও সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তি। সরকারের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা করতে না পারা কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত মানুষদের টার্গেট করে ‘পেইড’ প্রোপাগান্ডায় মেতে উঠেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে পরিচালিত এই পেইড প্রোপাগান্ডার পেছনে বর্তমান সরকারেরই এক মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিবের (এপিএস) প্রত্যক্ষ হাত রয়েছে। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ‘রিউমার স্ক্যানার’-এর এক জরিপের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ৩৫১টি এবং প্রধানমন্ত্রীর কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে ৫০টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন গুজব ছড়ানো হয়েছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংসহ তার আস্থাভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক এসব পরিকল্পিত অপপ্রচারের অন্যতম শিকারে পরিণত হয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম এবং শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। মূলত সরকারকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কের মুখে ফেলতে ও অসন্তোষ সৃষ্টি করতে এই দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীকে টার্গেট করে একের পর এক মনগড়া ইস্যু তৈরির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, বিগত ১৭ বছর ধরে দেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সর্বস্তরে দলীয় বিবেচনায় নিজস্ব লোক নিয়োগ দিয়েছিল বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকার। তৎকালীন সরকারকে বেআইনিভাবে টিকিয়ে রাখা, ভোটচুরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপকর্মে তারাই মূল ভূমিকা পালন করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত সেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বহাল রয়েছেন। তারা বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলে শেখ হাসিনাকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে প্রচ্ছন্ন চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে তারা ভেতরে ভেতরে বিএনপির মন্ত্রী ও এমপিদের বিতর্কিত করার মিশন অব্যাহত রেখেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম এবং শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন মূলত এই প্রশাসনিক চক্রান্তের শিকার হচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সাম্প্রতিক সময়ে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত বা পুনর্বিন্যাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনটিকেও এই ষড়যন্ত্রের একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলনকে পেছন থেকে উসকে দিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছে একটি চক্র। সড়ক অবরোধের সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় অছাত্র, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি বেশি ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।

জানা গেছে, শুরু থেকেই চক্রান্তকারীদের প্রধান টার্গেট ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি কিছু আমলার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। এতে একটি আমলাতান্ত্রিক চক্র ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বলে দাবি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিএনপির ভেতরের একটি অংশও তার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তাকে বিতর্কিত ও অসৎ হিসেবে উপস্থাপন করতে একটি মহল সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদের সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় ‘পেইড প্রোপাগান্ডা গ্রুপ’ এবং আওয়ামী লীগসহ বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের নেতারাও যুক্ত হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।

মীর শাহ আলম তার পরিবারের কারও নামে কোনো প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনা না করার জন্য লিখিত নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো সত্ত্বেও, সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে তাকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় ফেলতে তার পরিবারের সদস্যের নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব পাঠানো হয় বলে জানা গেছে। পরে সেই তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে তাকে ব্যাপকভাবে ট্রোল ও অপপ্রচারের শিকার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রকৃত তথ্য না জেনে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীও সেই প্রচারণায় যুক্ত হন বলে দাবি করা হয়েছে। শুধু দেশেই নয়, বিদেশে অবস্থান করেও কিছু ব্লগার অর্থের বিনিময়ে প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছেন, যার পেছনে সরকারের এক মন্ত্রীর এপিএসের নাম উঠে আসছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় কোনো বৃক্ষকে উপড়ে ফেলতে হলে আগে তার ডালপালা ছাঁটাই করতে হয়। পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা বর্তমান সরকারকে দুর্বল করার জন্য একই কৌশল অবলম্বন করছে বলে তারা মনে করেন। সেজন্যই তারা প্রধানমন্ত্রীর চারপাশের বিশ্বস্ত মানুষদের টার্গেট করে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যাতে সরকারের প্রতি জনআস্থায় চিড় ধরে।

কারণ প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হলে সাধারণ মানুষ সহজেই তা বিশ্বাস করে ফেলে। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি এই দুর্বলতাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী বলেন, “আমি মনে করি এটা এক ধরনের গভীর ষড়যন্ত্র। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ও অপপ্রচার ছড়ানো অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। যারা এসব অপকর্মে লিপ্ত, তারা মানসিক দিক থেকে খুবই হীনমন্য এবং পরশ্রীকাতর। সরকারের উচিত অবিলম্বে এসব প্রোপাগান্ডাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।”

বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও বক্তা মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলেন, “তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া যেকোনো অপপ্রচার ছড়িয়ে দেওয়া সমাজে বিভ্রান্তি, ফিতনা ও পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। ইসলামে এ ধরনের কাজকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গুজব ছড়ানোকে অশ্লীলতা ও ফিতনার শামিল মনে করা হয়।”

তিনি আরও বলেন, “গুজব ও প্রোপাগান্ডা থেকে বেঁচে থাকার বিষয়ে ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশনা হলো—যেকোনো সংবাদ সত্য কি না তা ভালোভাবে যাচাই করা, সত্য ছাড়া মিথ্যা কিছু না বলা, অন্যের সম্মান রক্ষা করা এবং অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ সুতরাং আমাদের সবার উচিত এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রোপাগান্ডা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখা।”

অপপ্রচারের অভিযোগ,‘পেইড’,প্রধানমন্ত্রী ও তার ঘনিষ্ঠ
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত