ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ভ্রমণ

আগরতলা সীমান্তের পথে প্রান্তরে

আগরতলা সীমান্তের পথে প্রান্তরে

সাতসকালেই বন্ধুর কল। দোস্ত রেডিত। আবার জিগায়। বিমানবন্দর স্টেশন হতে দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে ট্রেন। ভরদুপুরে মায়ের হাতের সাদা পোলাও খেয়েই ভোঁ-দৌড়। রাইট টাইমেই পৌঁছে যাই রেলওয়ে স্টেশনে। কিন্তু বিধি বাম। ট্রেন লেট। কি আর করা। ঠিক এক ঘণ্টা দেরিতে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন স্টেশনে ঢুকে। মানুষের ভিড় ঠেলেঠুলে নির্দিষ্ট সিটে গিয়ে বসি।

ট্রেনটি ব্রাম্মণবাড়িয়া। এ জেলার পরতে পরতে রয়েছে সমবৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিসহ নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের প্রকৃতির ভান্ডার। আমি কোথাও ভ্রমণে গেলে শুধুমাত্র প্রকৃতি দেখেই ফিরি না। সঙ্গে সেইসব অঞ্চলের মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, আতিথীয়তা ও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করি।

ট্রেন পৌঁছে যায় গন্তব্যস্থল আখাউড়া জংশন। শুরুতেই আমাদের জন্য মোগরা বাজারে অপেক্ষায় ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা সাইফুল তানশেন। দেখা হতেই একগাল হেসে,ধরে নিয়ে গেলেন পোড়া রুটি আর মালাই চা খাওয়াতে। বিদায় নিয়ে ছুটলাম মূল গন্তব্যে। যেতে যেতে তুলাই শিমুল গ্রামে বেকি নগর জুলাই শহিদ জাবির ইব্রাহিমের দাদা বাড়ি পৌঁছি। বিশাল বাড়িটির এক কোণে পুরানা একটি মাটির ঘর। পরিবারটির সঙ্গে পূর্ব পরিচয় থাকায়, মাটির ঘরটিতে থাকার সুযোগ হলো। মাটির ঘর হওয়াতে শহিদ জাবিরের ছোট চাচা বেশ ইতস্তত। কিন্তু আমিত মনে মনে বিরাট খুশি। বলা যায় বাড়িটি একরকম পরিত্যাক্ত। ভ্রমণে গিয়ে এমন বাড়িতে রাত্রি যাপনে বাড়তি পাওনা হতে পারে, রাত গভীরে নুপুরের আওয়াজ কিংবা টেনে বাথরুমে নিয়ে যাওয়ার অনুভূতি। পুরাই হরর মুভি। ওরকম কিছুরই আশায় অনেক রাত অব্দি উঠানে বসে রই। নিরাশ হয়ে যখন ঘরে ঢুকে ঘুমের প্রস্তুতি নিতে থাকি, ঠিক ওমনি হাপাতে হাপাতে জবিয়ান বান্ধবী মুনিরার সঙ্গে চ্যাঁটিংয়ে ব্যস্ত থাকা বন্ধু এসে বলে দোস্ত কি জানি আসছে। বলিস কি দোস্ত। চল চল চল। টর্চের আলো ফেলতেই দেখি, কাঁঠাল তলায় পাতি শিয়াল দৌড়ায়। হা হা হা। যাহ বেটা ঘুমের মোঠটাই নষ্ট করলি। এবার ওরে সঙ্গে নিয়াই বিছানায় যাই। মজার ব্যাপার আম কাঁঠাল পাকা গরমেও লেপ মুড়িয়ে ঘুম। মাটির ঘরের এটাই হয়ত বৈশিষ্ট্য।

পরদিন সকালে তুলাই শিমুল গ্রামটা ঘুরতে বের হই। হাঁটতে হাঁটতে বইস খেলার মাঠে। একপাশে বিলের পানি। আরেক পাশে বিশালাকার মাঠ। রয়েছে পুরানা গাব গাছ। ঝিরঝির বাতাস বয়ে যায়। কথতি আছে একসময় এখানে মহিষের খেলা হত। কালের পরিক্রমায় নামের বিবর্তনে সেটাই এখন বইস নামে পরিচিত। নাম ধাম যাই হোকনা কেন,বহিস খেলার মাঠের চারপাশের প্রকৃতি অত্যন্ত চমৎকার। প্রথম দর্শনেই মনে হবে, প্রকৃতির কোলে একটুকরো সবুজ এঁটে রয়েছে। মাঠের পাশের বিলে ভরা বর্ষায় পদ্ম ফুটে জায়গাটা আরো বেশি নয়নাভিরাম হয়ে উঠে। যাই এবার খড়কুট গ্রামে। সীমান্ত রেল লাইন ধরে হাঁটতে থাকি। ওপারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা। তাদের রেল স্টেশনটা এপার থেকেও দৃশ্যমান। যেতে যেতে আগরতলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের মাটিতে। মনে পড়ে গেল আগরতলা ষড়যন্ত্রের ইতিহাস। নাম নিশ্চিন্তপুর হলেও আমাদের মাথায় দুশ্চিন্তা ভর করল। তাই আর সময়ক্ষেপন না করে নিজ ভূমেই ফিরে আসি। চোখ বুলিয়ে দেখি বাংলার আবহমান গ্রামিণ সৌন্দর্য। প্রকৃতির সঙ্গে সখ্যতা গড়তে গড়তে চলে যাই গঙ্গাসাগর দীঘি। প্রথম দর্শনেই চোখ ছানাবড়া। শতবর্ষী বৃক্ষের ছায়াঘেরা দীঘির টলটলে পানি। পাশেই নান্দনিক ডিজাইনের গঙ্গাসাগর রেলওয়ে স্টেশন। সাড়ে চার একরের দৃষ্টিনন্দন গঙ্গাসাগর দীঘিটি প্রায় ১,৫০০ বছর আগে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের তৎকালীন রাজা বীর বিক্রম ঈশ্বরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুর প্রজাদের সুপেয় পানির প্রয়োজনে দীঘিটি খনন করিয়েছিলেন। তৎকালীন সময় রাজা এ অঞ্চলে খাজনা আদায়ের জন্য এলে, গঙ্গাসাগর দীঘির ঘাটে বসে বিশ্রাম নিতেন। দীঘির পাশেই রয়েছে একটি জির্ণশীর্ণ কাচারি ঘর।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত