
আপনি যদি শহরের কোলাহল ও কর্মব্যস্ত জীবন থেকে মুক্ত হয়ে একটু প্রশান্তি খুঁজছেন? তাহলে কোন চিন্তা না করে বেরিয়ে পড়েন শ্রীমঙ্গলের দিকে। যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা শ্রীমঙ্গলে নয়ানাবিরাম সৌন্দর্য্য উপভোগ করবেন। প্রতিবারের ন্যায় বলতে গেলে আমাদের গল্প একি হঠাৎ করে কোন পরিকল্পনা ছাড়া এবারের গন্তব্যস্থল শ্রীমঙ্গল। এ যাত্রায় আমার সফরসঙ্গী ছিল মারুফ, আকাশ, সাখাওয়াত, রাশেদ, শফিক, মিশু, কাফি, তামিম।
কক্সবাজার থেকে সরাসরি সিলেটর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম সবাই। সিলেট এর আগে তিনবার এসেছিলাম ঘুরতে। সিলেট আমার সবসময় পছন্দের জায়গার মধ্যে অন্যতম। এক রাত সবাই সিলেট অবস্থান করে সকালে শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। রাতের সিলেট পৌঁছে আরও একটা মজার ঘটনা কি জানেন ছোট ভাই আবিদ তাদের বন্ধুদের নিয়ে সিলেটে ছিল তার সঙ্গে রেল স্টেশনে দেখা। ট্রেনের টিকিট পেতেও আরও একটু বেগ পেতে হয়েছে কারণ আমরা আগে থেকে টিকিট করতে পারি নাই। গিয়ে অনেক চেষ্টা করে সকালের টিকিট পেলাম, আমাদের ট্রেন ছিল কালনী এক্সপ্রেস। এটি সাধারণত সিলেট শহর থেকে সকাল ৬:১৫ মিনিটে যাত্রা শুরু করে। যদি কোন সিডিউল পরিবর্তন না হয় তাহলে সকাল ৮:৩০ মিনিটে শ্রীমঙ্গল পৌঁছায়।
সিলেট থেকে শ্রীমঙ্গলের ট্রেন যাত্রাটি সত্যি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। জীবনে কিছু কিছু স্মৃতি আছে আপনি চাইলে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবেন নাহ। কিন্তু ঐ সময় এবং মূহুর্ত সবসময় আপনার স্মরণে থাকবে এ যাত্রাটি ঠিক তেমন। এ যাত্রায় ট্রেনে বসে আপনি উপভোগ করতে পারবেন দু'পাশে সবুজ চা বাগানের মাঝ দিয়ে রাস্তা। সামনেই চোখে পড়বে পথের দু'পাশে উঁচু-নিচুঁ পাহাড়, লেবু ও আনারসের বাগান। উপভোগ করতে পারেন পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য এ প্রাকৃতিক সৌন্দয্য দেখলে আপনি হারিয়ে যাবেন এক স্বপ্নের রাজ্যে। এ দৃশ্য উপভোগ করতে করতে আমরা শ্রীমঙ্গল পৌঁছালাম। ঐ দিকে শ্রীমঙ্গল স্টেশনে আমাদরে অপেক্ষায় ছিলেন নির্ঝর, স্বচ্ছ। তারা দু'জন অমায়ীক ছেলে, তারা আমার নেপাল ভ্রমণের সফর সঙ্গী ছিল। নেপালের গল্প একদিন আপনাদের শোনাব সময় করে।
আমাদের সফর যেহেতু একদিনের ছিল সেই জন্য আমরা আগে থেকে পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। আমাদের যেকোন ভ্রমণের যাবতীয় সবকিছুর পরিকল্পনা ও খরচের দায়িত্বে থাকেন বন্ধু মারুফ। আমরা পৌঁছে চাঁদের গাড়িতে করে সারাদিনে শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, নুরজাহান চা বাগান, মাধবপুর লেক, লাল টিলা, বধ্যভূমি, শমশের নগর গলফ মাঠ, খাসিয়া পান পুঞ্জি ইত্যাদি জায়গায় ভ্রমণ করলাম। আমাদরে এ যাত্রায় আরও আনন্দ ময় করেছিল আমাদের ড্রাইভার মামা। সে গুরু জেমসের পিউর ভক্ত। সারা রাস্তায় সে আমাদের গান শুনিয়ে অনেক উজ্জিবীত করেছিল।
প্রতিটি ভ্রমণে গেলে আমার বারবার মনে পড়ে প্রখ্যাত অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক একটি কথা তিনি তার শিষ্য লেখক লেখক আহমদ ছফাকে বলেছিলেন— যখন কোন নতুন জায়গায় যাইবেন পয়লা দুইটা জিনিস জানার চেষ্টা করবেন, ওই জায়গার মানুষ কি খায় আর পড়ালেখা কি করে। কী পরে আর কী খায় এ দুইটা জিনিস না জানলে একটা জাতির কোন কিছু জানন যায় না। আমি সবসময় এ দুটি বিষয় ঘুরে দেখার চেষ্টা করি। এইবার আসা যাক আমাদের মূল ভ্রমণের গল্পে। সারি সারি চা বাগানের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়ক ধরে ৯ কিলোমিটার পথ এগিয়ে আমারা প্রথমে গিয়েছিলাম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। যাওয়ার পথে আপনি পাহাড়ি রাস্তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। গাড়ি থেকে নেমে আমরা সকলে টিকেট সংগ্রহ করে এ জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ করলাম। আমার মনেহয় এ উদ্যানে হচ্ছে শ্রীমঙ্গলের আরেক বিস্ময়। দেশের সবচেয়ে সৌন্দর্যমন্ডিত পাহাড় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। ১ হাজার ২শ' হেক্টর এলাকা জুড়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের উঁচু-নিচুঁ টিলায় কয়েক হাজার প্রজাতির লক্ষ লক্ষ সুউচ্চ বৃক্ষ আপনাকে বিমোহিত করবে। একটু ভেতরের দিকে গেলেই দেখা যাবে বড় বড় বৃক্ষরাজির মগডালে উল্লুক, বানরসহ নানা প্রাণীর লাফালাফি। উদ্যানে রয়েছে আরও বিস্ময় চোখে পড়তে পারে মেছোবাঘ, ভাল্লুক, হরিন, বিভিন্ন জাতের সাপ, বনমোরগ, বন বিড়াল, উল্লুক, বানর, খাটাস প্রভৃতি প্রাণী। এ বনে রয়েছে আড়াই হাজারের অধিক প্রজাতির পাখি, দশ প্রজাতির সরিসৃপ এবং বাঘ, ভাল্লুক, সিভিটকেট, বানর, হরিণসহ অর্ধ শতাধিক প্রজাতির বন্যপ্রাণী। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ভেতরে মাগুরছড়া খাসিয়া পান পুঞ্জি রয়েছে। এ খাসিয়া পান পুঞ্জিতে পৌঁছাতে হলে আপনাদের প্রায় ১ঘন্টা হাটতে হবে।
শ্রীমঙ্গলের সবুজ ঘেরা অপরূপ এক প্রান্তর নুরজাহান টি-গার্ডেন বা নুরজাহান চা বাগান। কথিত আছে মোঘল সম্রাজ্ঞী নুরজাহান বেগমের নাম অনুসারে এ চা বাগানের নামকরণ করা হয়েছে। চা বাগানগুলো শ্রীমঙ্গলকে সবুজ চাদরে ঢেকে রেখেছে। চা বাগনগুলোর নান্দনিক সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বাগানের বুক চিড়ে চলে যাওয়া ছড়া ও হ্রদগুলো। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাধপুর লেক।
সকাল থেকে বিভন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে আমরা ক্লান্ত ছিলাম সেই জন্য আমরা রওনা দিলাম লাঞ্চ করতে। যেহেতু আমাদের আজকে আবার ব্যাক করতে হবে সেই জন্য আমরা লাঞ্চ শেষ করে রওনা দিলাম নিজেরদের ক্লান্তি দূর করতে। পুরো শ্রীমঙ্গলের মনোমুগ্ধকর সব স্থান দেখতে দেখতে আপনিও যদি ক্লান্ত হয়ে পড়েন তাহলে আপনিও আমাদের মতো চলে যেতে পারেন রমেশের নীলকন্ঠ চা কেবিনে। রমেশ ২০০০ সালে কাকিয়াছড়া চা বাগানের বাজারে এক গ্লাসে দু'স্তরের চা তৈরি করে আলোড়ন তুলেছিলো। একে একে নিজের গড়া রেকর্ড নিজেই ভেঙ্গে চলেছে রমেশ। বর্তমানে রামনগর মনিপুরী পাড়ার সম্মুখস্থ নীলকন্ঠ চা কেবিনে তৈরি হচ্ছে এক গ্লাসে ৭ স্তরের চা। এ ছাড়া ৯ প্রকারের চা তৈরি হয় তার চা কেবিনে। চা খেয়ে আমাদের সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। এরপর আমরা নিজেদের পরিবারের জন্য কিছু কেনাকাটা করলাম।
শ্রীমঙ্গলে যাওয়ার উপযুক্ত সময় সাধারণত সারা বছরই, তবে ঋতুভেদে এর সৌন্দর্য ও অভিজ্ঞতা আলাদা হয়। সবচেয়ে উপযুক্ত সময় নির্ভর করে আপনাদের নিজের পছন্দের উপর। শীত ও বসন্তকাল (নভেম্বর থেকে মার্চ) আবহাওয়া সবচেয়ে আরামদায়ক, ঠান্ডা ও মনোরম থাকে। এ সময় বনের ভেতরে হাইকিং, চা বাগানে ঘোরাঘুরি এবং বাইক্কা বিলে অতিথি পাখি দেখা সবচেয়ে ভালো হয়। স্থানীদের ভাষ্য অনুযায়ী এ সময় পর্যটকদের সমাগম বেশি থাকে। বর্ষাকাল (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) চারপাশের সবুজ প্রকৃতি ও চা বাগান সবচেয়ে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। পাহাড়ের ওপর ভেসে থাকা মেঘ এবং হামহাম জলপ্রপাতে ভরপুর পানি দেখতে এ সময়টি চমৎকার। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে চলাচলে কিছু অসুবিধা হতে পারে।