প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
শ্রদ্ধাভাজন সভাপতি এবং উপস্থিত সুধীবৃন্দ, আমি সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুর-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। তারা সাহিত্যের চর্চার জন্য ৪০ বছর আগে একটি সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করেছেন এবং সেই কাঠামোতে এখনও কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। এখনকার কর্মকাণ্ড দেখে অনুধাবন করা যায়, সাহিত্য একাডেমি খুব বিস্তৃত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গত ১০ দিনব্যাপী যে ১৩টি অনুষ্ঠান করেছে, এর মধ্য দিয়ে সাহিত্য কথাটির প্রসারিত অর্থ প্রকাশ পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই অর্থ খুব প্রচার করেছিলেন যে, 'সাহিত্য' কথাটি এসেছে সহিত থেকে। সহিত থেকে এসেছে বলে সাহিত্য কথাটিকে আমরা সম্পর্ক তৈরি করা বা সম্পর্কিত হওয়া অর্থে ব্যবহার করতে পারি। এটি বৃহৎ অর্থে মানব-সম্পর্ক। মানব-সম্পর্ক প্রকাশ করার অনেকগুলো দিক ও ধরন আছে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথাকে প্রসারিত অর্থে নিয়ে বলা যায়, সাহিত্য হলো প্রকাশমূলক সম্পর্ক। মানে সাহিত্যের মাধ্যমে আমি নিজেকে আবিষ্কার ও প্রকাশ করি এবং অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হই। অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার যে সাহিত্য, সেটারই আমরা বহু ধরনের প্রকাশ দেখলাম চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির গত ১০ দিনে গৃহীত প্রায় ১৩টি আয়োজনে।
মানব-সম্পর্কের যে দিকটাকে আমরা সাহিত্য বলি, তা ভাষার মধ্য দিয়ে রূপ লাভ করে। রং-রেখা বা মিউজিক বা অডিও-ভিজুয়াল বা কম্বাইন্ড ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে নয়। ভাষাকে আশ্রয় করে সাহিত্য বিকশিত হয়েছিল অনেক শতাব্দী, সহস্রাব্দ আগে। যখন মানুষ লিখতে পারত না, তখনও জোরালোভাবে সাহিত্য ছিল। তার কিছু অংশ আমাদের সময়ে এসে পৌঁছেছে। সাহিত্যের সেই আদি সংজ্ঞাটি আমরা খানিকটা সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করতে চাই এবং ব্যবহার করছি এখনও। সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুর তার ঘোষিত লক্ষ্যের মধ্যে সে কথাটাকেই প্রধান করেছে বলে দেখা যাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, এই যে সাহিত্য একাডেমি বা অন্য সাহিত্য সংগঠন, তার সঙ্গে সাহিত্যচর্চা কিংবা সাহিত্যিক তৈরি হওয়ার সম্পর্কটা কেমন এবং কতটা। একটা তো হতে পারে সামাজিক আয়োজন। সমাজ প্রত্যেকেরই দরকার হয়, যারা সাহিত্য করেন, লেখেন, তাদেরও সমাজ দরকার আছে। তো এমন কিছু মানুষ সাহিত্য একাডেমি করলেন, সমাজের মধ্য দিয়ে একত্র হলেন, এটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো— এমন কিছু তৎপরতার মধ্য দিয়ে যাওয়া, যেটা যারা সাহিত্যে সক্রিয় আছেন তাদেরও সক্রিয় রাখবে, এবং যাদের আকাঙ্ক্ষা আছে; কিন্তু সক্রিয়তার অভ্যন্তরীণ প্রেরণা ঠিক ততটা লাভ করছেন না, তাদেরও প্রেরণা দিতে পারে। এই সক্রিয় রাখাটা খুব জরুরি। সক্রিয় থাকার জন্য ভেতরের একটা চাপ বোধ কর অত্যন্ত জরুরি। তার কারণ সাহিত্য পড়া, সাহিত্য লেখা, সাহিত্যচর্চা, আলোচনা, অন্যের সঙ্গে কথা বলা— এই প্রত্যেক ব্যাপারেই শ্রম ও সময় ব্যয় হয়, উদ্যম-উদ্যোগের প্রয়োজন হয়। ফলে সমাজে যদি এমন নানা ধরনের প্রক্রিয়া চলমান থাকে, যেখানে ওই সক্রিয়তার জন্য প্রয়োজনীয় অনুপ্রেরণা নানা জায়গা থেকে আসবে, তাহলে ওই সমাজে এই ধরনের চর্চার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এর ঐতিহাসিক প্রমাণ পৃথিবীর প্রায় সকল সমাজেই পাওয়া যায়। এই দিক থেকে আমরা বলব, সাহিত্য একাডেমি যে নিয়মিত তৎপরতার কথা বলেছে, এবং আমরা অনুমান করতে পারি এ ধরনের একটি সাহিত্য একাডেমি যে ধরনের কাজ করে থাকে— সেটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। গুরুত্বটা আপনার সাহিত্য প্রতিভা আছে কী নেই, সেটার সঙ্গে পুরোপুরি সম্পর্কিত নয়। গুরুত্বটা আপনি সাহিত্যের ব্যবহার ও ভোগ কোন স্তরে, কোন মাত্রায় করে থাকেন, সেটার সঙ্গেও পুরোপুরি সম্পর্কিত নয়। এর কারণ হলো, আমরা অনেকেই ভেবে থাকি যে, আপনার প্রতিভা আছে বলেই আপনি সাহিত্যচর্চা করেন। এই কথা কিন্তু পুরোপুরি ঠিক নয়। প্রতিভা সম্পর্কে একটি ঘোরতর কুসংস্কার আমাদের সমাজে, এমনকি সবচেয়ে শিক্ষিত সমাজেও বদ্ধমূল আছে। প্রতিভাকে প্রেরণা কিংবা ঐশ্বরিক ব্যাপার হিসেবে দেখার একটা প্রবণতা আছে। এ প্রবণতা খুবই জোরালো।
একথা শুনে অনেকে একটু চমকে উঠবেন— এটা কী বলা হচ্ছে! জানি, আপনারা বলবেন, এটা তো ঠিক নয়। আমি কিছুদিন আগে সমাজবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের যৌথতায় 'প্রতিভার সমাজতত্ত্ব' নামে একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রচার করেছি। আমি অন্যদের মত ও বিশ্লেষণ ধার করে লিখেছি, প্রতিভার একটা সমাজতত্ত্ব থাকে। একে আমরা বলতে পারি পারসপেকটিভস। এই যে পারিপার্শ্বিকতা থাকে, সেটা কীরকম? সেটা হলো, একটা সমাজে ধরুন পদার্থবিজ্ঞানের চর্চা কাঠামোগতভাবে বা আনুষ্ঠানিকভাবে খুব হাজির আছে, দেখবেন সেখানে বড় বড় পদার্থবিজ্ঞানী জন্ম নেয়। বাংলাদেশে সেই ধরনের কাঠামো তেমন নেই। ধরুন এক জায়গায় ফুটবল খেলার দারুণ আকর্ষণ, প্রচুর সম্ভাবনা ও সামাজিক প্রণোদনা রয়েছে। আপনি দেখবেন সেখানে বড় বড় ফুটবলার দশকের পর দশক, শতাব্দীর পর শতাব্দী জন্ম নিচ্ছে। অন্য জায়গায় জন্ম নেয় না। পৃথিবীতে প্রায় ২০০টি দেশ আছে, যার বেশিরভাগে একজনও গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেট খেলোয়াড় জন্মায়নি। কেন? আসলে ব্যাপারটা হলো, সমাজে মানুষের বিচিত্র প্রতিভা থাকে; আপনার প্রতিভা কোন দিকে বিকশিত হবে, আপনার প্রতিভা দুনিয়া আলোকিত করার মতো মানুষ জন্ম দিতে পারবে কি-না, এটা নির্ভর করবে আপনি চারপাশে কাঠামোগত ও সামাজিক নানা প্রণোদনা তৈরি করতে পারছেন কি-না। এ বিষয়ে আলাপ আমি আর দীর্ঘ করব না। কিন্তু আশা করি বলতে পেরেছি কেন বিশেষ ধরনের প্রতিভার উন্মেষ ও বিকাশের জন্য এবং তারও পরে তাকে অনবরত ক্রিয়াশীল, সৃষ্টিশীল, চর্চাশীল রেখে একটা পরিণতিতে পৌঁছানোর জন্য কাঠামোগত ও সামাজিক প্রণোদনা প্রয়োজন।
পৃথিবীতে এমন কোনো প্রতিভাবান নেই যিনি দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতি ও চর্চা ছাড়া প্রতিভার পরিচয় দিতে পেরেছেন। আসমানি প্রতিভা বলতে পৃথিবীতে কিছু নেই। সবচেয়ে প্রতিভাবান মানুষেরও দীর্ঘ অনুশীলনের ইতিহাস রয়েছে। তাহলে ওই যে দীর্ঘ অনুশীলনের একটা সামাজিক পারসপেক্টিভ তৈরি করে রাখা— এই ব্যাপারটা যেকোনো প্রতিভার উন্মেষ, বিকাশ ও দীর্ঘমেয়াদী চর্চা জারি রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি কাজ। অর্থাৎ, সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুরের মতো একাডেমিগুলো যে কাজ করে, সেগুলো চেতনে-অচেতনে বা অবচেতনে, সক্রিয় কিংবা কখনো কখনো নিষ্ক্রিয়ভাবে একটি প্রভাব তৈরি করে। রাস্তা দিয়ে একজন তরুণ বা তরুণী, শিশু বা কিশোর হেঁটে যাচ্ছে। আর সে দেখতে পাচ্ছে সাইনবোর্ডে একটি নাম আছে— 'সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুর'। এটাও কিন্তু একটা প্রভাব— সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয়ভাবে এটি অনুপ্রেরণা সঞ্চার করে। চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমি এ কাজটি ৪০ বছর ধরে করে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই তারা আমাদের ধন্যবাদ পাবেন।
সাহিত্য সম্পর্কে একটা ভুল কথা বহুবার বলা হয়েছে। এখনও বলা হয়, সবচেয়ে বেশি বলা হয়েছে ১৮-১৯ শতকের লিবারেল জমানায়। কথাটি হলো সাহিত্যের কোনো দেশকাল নেই, সাহিত্য চিরকালীন, সর্বকালীন ইত্যাদি। কথাটা বলার কারণ, আমাদের বড় সাহিত্যিকদের গুরুত্বপূর্ণ একাংশ লিবারেল ঘরানার লোক। যেমন রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁদের কথায় আপনারা প্রচুর শুনেছেন এবং বারবার শুনেছেন— সাহিত্যের কোনো দেশকাল নেই। এই কথাটা কিন্তু অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ও সচেতন বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রহণ করা দরকার। আমি গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছিলাম এবং আল মাহমুদ সম্পর্কে এই পয়েন্টটি বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেছি। আল মাহমুদ বিশেষভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কবি বলেই জাতীয় হয়েছেন এবং পরে একই কারণেই মহাকালের কবি হয়েছেন। একে দার্শনিকভাবে বলা হয় 'পার্টিকুলার অ্যান্ড ইউনিভার্সাল'। আপনি যদি পার্টিকুলারিটিকে, বিশেষকে গ্রহণ করতে পারেন, উপলব্ধি করতে পারেন, তাহলে তা সর্বজনীন হতে পারে। আপনার অন্তর্গত ও বহির্গত সত্তার সঙ্গে মানুষের সত্তার একটি ব্যক্তিগত রূপ আছে। এটি সবসময় একটি এঙ্টেন্ডেড ফর্মে কাজ করে। মানুষ চারপাশের প্রকৃতি ও নানান অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। একইসঙ্গে চারপাশের বিপুল পরিমাণ মানুষও উৎপাদন-কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। ফলে মানুষের ব্যক্তিগত সত্তা এবং সামষ্টিক সত্তার মধ্যে আপনি যদি পার্টিকুলার অবস্থাকে অনুধাবন করতে পারেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে অ্যাকচুয়াল অবস্থার মধ্যে আপনি জীবনযাপন করেন, ওই যাপনকে যদি অনুভব করতে পারেন, ওই পার্টিকুলারিটির মধ্যে নিজের অস্তিত্বের মধ্যে সেই অনুভবকে যদি রূপ দেন, ভাষায় প্রকাশ করেন এবং এরমধ্যে অন্তর্নিহিত সত্যগুলো জমা হয়, তবে সেটি ইউনিভার্সেল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই প্রকাশ দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, শৈল্পিক, যান্ত্রিক উৎপাদন বা যে মাধ্যমেই হোক, তা সৃষ্টিশীল কাজ। যেকোনো বড় শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী কিংবা সৃষ্টিশীল মানুষ এভাবেই পার্টিকুলারিটির মধ্য থেকে একটি সামষ্টিকতার মধ্যে ইউনিভার্সালিটি বা বিশ্বজনীনতা লাভ করে। এভাবে মানুষ বিশেষ থেকে সামান্যে উন্নীত হওয়ার দিকে যেতে পারেন।
কথাটা বিশেষভাবে আজ এ কারণে বললাম, আমরা সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুর নিয়ে যে আলাপ করছি তার একটি সুর্নিদিষ্ট বিষয় আছে। বিষয়টা কী? পার্টিকুলারলি চাঁদপুরের কেউ একজন, দুইজন, পাঁচজন, ১০ জন— আমরা যাদের চিনি-জানি, আবার চিনি না এমন অনেকেই— তারা নির্দিষ্ট পার্টিকুলারিটির মধ্যেই জীবনযাপন করছেন। তাদের একটি সাহিত্য-বাসনা ও অনুসন্ধিৎসা আছে। ধরা যাক, একজনের মধ্যে বিজ্ঞান-বাসনা আছে। সাধারণ বিজ্ঞান হলে চাঁদপুরের মতো পার্টিকুলার জোন থেকে দারুণ কৃষিবিজ্ঞানী জন্ম নিতে পারে। দারুণ মেকানিক্যাল কাজও হতে পারে এ জায়গায় বসেই। এটা মনে রাখতে হবে, প্রতিভা ও সৃষ্টিশীলতার কোনো বিশেষ প্রাঙ্গণ নেই। আমরা আজ সাহিত্য একাডেমিকে নিয়ে কথা বলছি বলে সাহিত্যকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দিচ্ছি। কিন্তু প্রতিভা ও সৃষ্টিশীলতা প্রকৃতার্থে বিচিত্র অঙ্গনে প্রায় একই রূপে কাজ করে। যিনি মেকানিক্যাল বিষয় নিয়ে কাজ করবেন, তার জন্য হয়তো ল্যাবরেটরি ও কিছু মেশিনারি দরকার হবে; যিনি সাহিত্য নিয়ে কাজ করবেন তার জন্য কাগজ-কলম দরকার হবে, কম্পিউটার স্ক্রিন দরকার হবে। উপকরণ আলাদা হতে পারে, কিন্তু প্রত্যেকটির আসলে একই ধরনের ব্যাকরণ থাকে। এখন আপনি যদি পার্টিকুলারিটিকে বিশেষভাবে অনুধাবন, উদ্যাপন এবং রূপায়িত করতে পারেন, তাহলে আপনার সাহিত্য সৃষ্টির সম্ভাবনা এবং অথেনটিসিটি, বিশ্বাসযোগ্যতা, অকৃত্রিমতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বৃদ্ধি পাবে।
কথাটা এজন্য বললাম যে, আমরা অনেক সময় মনে করি সাহিত্যের বাঁকবদল, মূল্যায়ন, স্বীকৃতির সঙ্গে কেন্দ্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তা নেই, আমি সেটা বলব না— এটা একধরনের থিওরিতে বলা হয়। আমি লুকাচের দস্তয়েভস্কি সম্পর্কিত একটা লেখা অনুবাদ করেছিলাম। সেখানে তিনি বলছেন দস্তয়েভস্কির আবির্ভাব বিস্ময়কর। কারণ দস্তয়েভস্কি সেই সময়ে পুঁজিবাদের সবচেয়ে অগ্রসর মানুষদের নিয়ে কাজ করে সেই সংকটগুলোকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো সাহিত্যিক উৎপাদন হিসেবে প্রকাশ করছিলেন। অথচ তখনও রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশই ঘটেনি। তার মানে লুকাচ বিস্মিত হয়েছেন এই ভেবে যে, পুঁজিবাদের কেন্দ্র নয়, বরং তুলনামূলক প্রান্তীয় অঞ্চলে থেকেই দস্তয়েভস্কি কেন্দ্রীয় কাজটা করলেন। অর্থাৎ, কাজটা কেন্দ্র থেকেই হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু এই কথাও তো আছে, মহানগরে, কেন্দ্রে মানুষ একেবারে ব্যক্তিগত যে ধরনের বাস্তবতার মধ্যে জীবনযাপন করে— মাটি-মানুষ সম্পর্ক, উৎপাদন সম্পর্ক, অপর বাস্তবতার সঙ্গে অথেনটিক ও মৌলিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যাওয়া— এটা আসলে আরবান সোসাইটিতে একটু পলকাভাবে ঘটে। কারণ ওখানে অনেক বেশি কৃত্রিমতা থাকে। জীবিকার লড়াই, অস্তিত্বের সংগ্রাম বেশি থাকায় মানুষের নিজস্বতা যাপনের প্রয়োজনীয় অবকাশ অনেকসময় কমই জোটে। অথচ যেকোনো সৃষ্টিশীলতার জন্য এগুলো খুব জরুরি। এ কথা খুব বলা হয়। কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা সে ধরনের মীমাংসায় আমাদের আজ যাওয়ার দরকার নেই। আমি শুধু বলতে চাচ্ছি, কেউ একজন ঢাকায় না থেকে, কলকাতায় না থেকে, দিল্লিতে না থেকে, নিউইয়র্কে না থেকে চাঁদপুরে থেকে সাহিত্যচর্চা করছে— এই কথার শিল্পগত দিক থেকেই অসামান্য তাৎপর্য আছে। তাৎপর্যটা এই যে, একটা পার্টিকুলার জায়গায় যাপিত জীবনকে অসাধারণভাবে আবিষ্কার ও উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে এমন ভাষার পুনর্গঠন হওয়ার সম্ভাবনা সবসময় থেকে যায়, যেটি কিছুতেই প্রান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সারা পৃথিবীতে এমন উদাহরণ প্রচুর আছে। এর প্রমাণ অনেক বড় সাহিত্যিক ও শিল্পী প্রান্তে জন্ম নিয়েছেন।
সামাজিক চর্চা হিসেবে আমরা যদি সাহিত্য একাডেমি বা সাহিত্য সংগঠনের চর্চার কথা বলি, তাহলে বলতে হবে, প্রতিভার সামাজিক ভিত্তি সম্পর্কে আলাপ কমই করা হয়। এটা সত্য, একজনকে শিখিয়ে-পড়িয়ে প্রতিভাবান বানানো যায় না। কিন্তু এও সত্য, প্রতিভার বিকাশের জন্য সামাজিক চর্চা খুবই জরুরি। কলম্বাস কিংবা ম্যাগিলানের মতো সাম্রাজ্য-বিস্তারকারী প্রতিভাবান নাবিক একমাত্র সাম্রাজ্যবিস্তারী ইউরোপেই জন্মাতে পারে। কারণ ওই সমাজ ওই ধরনের নাবিক তৈরির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল— রাজা থেকে প্রজা পর্যন্ত। সামাজিক চর্চার অংশ হিসেবে চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির সঙ্গে অনেক সাহিত্যিক ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত আছেন। তারা নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করে থাকেন। তাদের সাথে চাঁদপুরের স্থানীয় বিষয়াদির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার দিক আছে, আবার জাতীয় ঘটনা-পরম্পরার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। ধরুন আপনি নিউইয়র্কে থাকেন। আপনি সংবাদ পেলেন যে মামদানি মেয়র হিসেবে জয় লাভ করেছে। নিউইয়র্কবাসী হিসাবে আপনার কাছে এ ঘটনার আলাদা তাৎপর্য থাকবে। এখন, ঢাকায় বসে একজন লোক এই সংবাদ শুনলে তার কাছেও এর ভিন্নরকম তাৎপর্য থাকবে। আপনি কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত একটা নিউজ পেলেন, যেমন মানুষ চাঁদে গেছে; সমস্ত পৃথিবীর মানুষ কিন্তু এই তথ্যে প্রভাবিত হয়েছে। যাকে আমরা মূল বা অগ্রসর অংশ বলি— সে অংশের সঙ্গে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ নানাভাবে সম্পর্কিত থাকেন। যিনি চাঁদপুরে কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বসে সাহিত্য করছেন, তিনি এভাবে জাতীয় ব্যাপারগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কিত থাকবেন। আবার একইসঙ্গে যাকে আমরা বৈশ্বিক, সর্বজনীন ও স্থানকাল-নিরপেক্ষ বলতে পারি, সেরকম প্রচুর উপাদানও থাকে। আমার বলার কথা হলো, আপনি ঠিক যার সঙ্গে সম্পর্কিত, যেসব ব্যাপারকে যদি যাপিত জীবনের মধ্যে অনুভব, আবিষ্কার ও অনুবাহিত করতে পারেন, তাহলেই আপনার সাহিত্য সবচেয়ে ভালো হবে। 'আমি কেন ওখানে নেই, ওই পত্রিকায় আমার লেখা যায় না'— এগুলো মোটেই আক্ষেপ বা হাহাকারের ব্যাপার নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, আপনার একচুয়াল এক্সিস্টেন্সের সঙ্গে আপনি আপনার লেখাটাকে কীভাবে সম্পর্কিত করছেন। লেখা হলো অস্তিত্বের এক্সটেনশন। আপনি আপনার নিজের অস্তিত্বকে যেভাবে অনুভব করছেন, লেখার মাধ্যমে সেটি অন্যের কাছে দিচ্ছেন এবং বলছেন, তুমি এর মাধ্যমে আমার সঙ্গে সম্পর্কিত হও। এটাই আমরা প্রথমে বললাম, সাহিত্য সহিত থেকে এসেছে, সাহিত্য মানে সম্পর্কিত হওয়া। আপনার এখানকার উপলব্ধি যদি অথেনটিক হয়, আপনি যদি সেটা প্রকাশের জন্য একটা রূপকল্প তৈরি করতে পারেন, তাহলে নিঃসন্দেহে এটি অসামান্য সাহিত্যকর্ম হয়ে উঠতে পারে।
আমি এই প্রসঙ্গে আর কথা বাড়াব না। অন্য একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে চাই। কলকাতার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, কলকাতার একটু দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে প্রায়ই এমন অসামান্য লেখক, সাহিত্যিক, পণ্ডিত জন্মেছেন যারা কখনোই কেন্দ্রে না গিয়ে কেন্দ্রের সমীহ আদায় করেছেন। আপনাদের সিনিয়রদের মনে থাকার কথা, কলকাতার 'দেশ' পত্রিকা বহু লোক পড়ত। সম্পাদনার টেবিল থেকে যেসব লেখা আসত সেগুলোর জন্য নয়, মুখ্যত প্রথম কয়েক পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপা হওয়া চিঠিপত্রের জন্য। এগুলোর একটা বড় অংশ লেখা হতো কলকাতার বাইরে, প্রান্তগুলো থেকে।
আমাদের এখানেও এ ধরনের কিছু ঘটনা ঘটেছিল বলে আমি অনুমান করতে পারি। প্রধানত বামপন্থী রাজনীতি ও সংস্কৃতিচর্চার বিভিন্ন কেন্দ্রের কারণে বাংলাদেশের কয়েকটা মফস্বল জেলা শহর এবং বিভাগীয় শহর দারুণ ক্যারিশমা দেখিয়েছে। আমরা যেসব ছোটকাগজকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিই, তেমন কয়েকটা পত্রিকার প্রকাশনাস্থল ছিল এসব জেলা শহর বা বিভাগীয় শহর। সে ধরনের অনেক পত্রিকা ঢাকার বাইরে প্রকাশিত হয়েছে এবং কেন্দ্রের চূড়ান্ত রকম সমীহ আদায় করে নিয়েছে। বলা যায়, এই কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তারা কেন্দ্রকে প্রান্তে টেনে নিয়ে গেছেন, প্রান্ত কেন্দ্রে আসার প্রয়োজন বোধ করেনি। কিন্তু গত ৩০-৪০ বছর ধরে এই ব্যাপারটা বাংলাদেশে ভয়ঙ্করভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি অভিজ্ঞতা থেকে প্রায় নিশ্চিত হয়ে বলছি, এটি অনবরত ধ্বংস হচ্ছে। এই ধ্বংসের কারণ কী তা ব্যাখ্যা করা যাবে। কিন্তু আশা করছি আপনাদের মধ্যে যারা খোঁজখবর রাখেন তারা তথ্যের ভিত্তিতে আমার এ কথার সঙ্গে একমত হবেন, আমরা ৩০ বছর আগে বগুড়াকে যেভাবে একটা স্বতন্ত্র চর্চাকেন্দ্র হিসেবে দেখতাম, এখন আর সেটা পাচ্ছি না। সিলেট, চট্টগ্রাম ইত্যাদিকে ৩০-৪০ বছর আগে যেরকম চর্চাকেন্দ্র হিসেবে পেয়েছি, তা এখন অনেক কম পাচ্ছি, কিংবা অনেক জায়গায় পাচ্ছিই না।
একটা সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতির মধ্যে আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি। আমরা একটা ডিজিটাল উৎপাদন ব্যবস্থার যুগে আছি। এটা মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যে সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। যখন ছাপাখানা আবিষ্কৃত হয়েছিল, তখন মানুষের পারসেপশন অসাধারণভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল। যখন সিনেমা আবিষ্কৃত হয়েছিল তখনও মানুষের পারসেপশন-প্রক্রিয়া অসামান্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল। কিন্তু গত ১০ বছরে সারা পৃথিবীতে যে অনলাইন বিপ্লব ঘটে গেছে তার সঙ্গে এদের কোনোটিরই তুলনা হয় না। এই অনলাইনের মধ্য দিয়ে আমাদের শিল্পের উৎপাদন, বণ্টন ও ভোগ— এই তিনটা স্তর যেভাবে বিপুলভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, লেখক ও পাঠকের সম্পর্কিত হওয়ার ব্যাপারগুলো যেভাবে বৈপ্লবিকভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, খোদ শিল্পের উপকরণ, সমন্বয় ও বিন্যাসগত যে পরিবর্তন ঘটে গেছে, তা বিস্ময়কর। আমি শুরুতে এই কারণেই 'অডিও-ভিজুয়াল আর রিটেন' এই দুই আলাদা বর্গ ব্যবহার করেছিলাম। এই অডিও-ভিজুয়ালের সঙ্গে লিখিত রূপের মিলিত ফর্মে শিল্প-উৎপাদনের মধ্যে সমস্ত পৃথিবীর মানুষ মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে আচানক, আঁতকা এসে পড়েছে। মানুষের হাজার হাজার বছরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই অভিজ্ঞতার আসলে কোনো তুলনা হয় না।
এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এতক্ষণ ধরে যা নিয়ে কথা বলছি— বিশেষ ও সামান্য নিয়ে, কেন্দ্র-প্রান্ত নিয়ে, শিল্পের উৎপাদন-বণ্টন-ভোগের বিচিত্রতা নিয়ে— এই ব্যাপারগুলোতে কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই র্যাডিকাল বা বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। ওই পরিবর্তনের দিকটা যারা কোনো-না-কোনো ধারণাগত প্রান্ত, মধ্যবর্তী বা কিছুটা দূরবর্তী জায়গায় আছেন, তাদের খেয়াল রাখা উচিত। কথাগুলো আমি শুধু আপনাদের বলছি না, আমাকেও বলছি, এবং আমার কথা যারা শুনবেন তাদেরকেও বলছি। চর্চার ক্ষেত্রে এই প্রত্যয়টা বিশেষভাবে ধারণ করার একটা জরুরি মুহূর্ত আমাদের সামনে এসে গেছে, যে আগের মতো কেন্দ্র ও প্রান্তের ধারণা আর বিদ্যমান নেই। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও আর্থিক বিচলনের ক্ষেত্রে কেন্দ্র-প্রান্ত এখনও আছে। এটাকে আলাদাভাবে ভাবতে হবে, ধনী মানুষ আরও ধনী হচ্ছে, ফারাক বাড়ছে, সেটিও আছে। আমি বিশেষভাবে সাহিত্যের উৎপাদন, বণ্টন ও ভোগের এলাকা নিয়ে কথা বলছি। লেখক-পাঠক সম্পর্ক, উৎপাদন ও বণ্টন, বিপণনের ধরন যেভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং নতুন নতুন ফর্মের যেভাবে আবির্ভাব ঘটছে— এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের পুরোনো কেন্দ্র-প্রান্ত ধারণা, এডিটরের টেবিল ও পাঠকের যে ধারণা, এগুলোকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়ে এক নতুন ধরনের উৎপাদন ও ভোগের সম্পর্কের কথা আমাদের দ্রুত ভাবতে হবে। ভাবতে হবে মানে, আমরা আসলে তার মধ্যেই উপস্থিত আছি। যদি আমরা দ্রুত ভাবতে পারি, আমাদের জন্য ভালো হবে; যদি বিলম্ব করি, তাহলে আমরা ব্যক্তিগতভাবে কিংবা সামষ্টিকভাবে পিছিয়ে পড়ব।
আমি আশা করছি সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এবং খানিকটা মেটোনিমিক্যাল অর্থে চাঁদপুরবাসীরা এই নতুন মুহূর্তকে নতুনভাবে অঙ্গীকার করতে পারবেন এবং ব্যবহার ও ভোগ করতে পারবেন। আমি আপনাদের সবার মঙ্গল কামনা করি, শিল্পময় সুষমাময় জীবন কামনা করি। ধন্যবাদ।
[চাঁদপুর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ১১ জুলাই ২০২৬ শনিবার বিকেলে সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুরের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রদত্ত বক্তব্য]
অনুলিখন : মুহাম্মদ ফরিদ হাসান