
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের সুপেয় পানির সংকট দূর করতে বান্দরবানের থানচি উপজেলার বলীপাড়া ইউনিয়নের দিংতে পাড়ায় প্রায় ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা সৌরচালিত পানি পরিশোধন ও সরবরাহ ব্যবস্থা উদ্বোধনের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই অচল হয়ে পড়েছে। প্রায় নয় মাস ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রকল্পের আওতাভুক্ত ৩৩টি পরিবারের ২০৫ জন মানুষ আবারও নিরাপদ পানির সংকটে পড়েছেন। সংশ্লিষ্টদের বারবার জানিয়েও সমাধান না পাওয়ায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। স্থানীয় সরকার বিভাগের স্থানীয় সরকার জলবায়ু পরিবর্তন উদ্যোগ (লজিক) -এর জলবায়ু সহনশীল স্কিমের আওতায় 'জিএফএস-ভিত্তিক সৌরচালিত ভূপৃষ্ঠস্থ পানি পরিশোধন প্লান্ট স্থাপন ও সরবরাহ ব্যবস্থা' নামক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পটির মোট বরাদ্দ ছিল ৪৮ লাখ ৯১ হাজার ৯৭৬ টাকা। এরমধ্যে লজিক প্রকল্পের পিবিসিআরজি বরাদ্দ ছিল ৪১ লাখ ৯১ হাজার ৯৭৬ টাকা এবং কমিউনিটি কন্ট্রিবিউশন ৭ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় পাহাড়ি ঝিরি থেকে জিএফএস পানির লাইন, ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার সুপেয় পানির ব্যবস্থা, খাবার পানির জন্য দুটি সংগ্রহ পয়েন্ট, গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য চারটি পয়েন্ট, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল, তিনতলা ফাউন্ডেশনের একটি পাকা রুম ও একটি সোলার স্ট্রিট লাইট স্থাপন করা হয়। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ছিল ২০২৫-২৬ সাল। ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর প্রথমদিকে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও মাত্র তিন মাসের মাথায় ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্লান্টটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৬ এর সেপ্টেম্বর চলে আসলেও সংস্কারের মাধ্যমে চালু করা হয়নি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। স্থানীয়রা জানান, প্রকল্পটি চালু হওয়ার পর তাদের দীর্ঘদিনের পানির কষ্ট অনেকটাই কমে গিয়েছিল। কিন্তু তিন মাসের মধ্যেই প্লান্টটি অচল হয়ে যাওয়ায় তারা আবারও আগের মতো দূরবর্তী পাহাড়ি ঝিরি ও অন্যান্য উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দিংতে পাড়ার বাসিন্দা পারাও ম্রো বলেন, প্রকল্প চালু হওয়ার সময় মনে হয়েছিল আমাদের পানির কষ্ট শেষ হয়েছে। কিন্তু তিন মাস যেতে না যেতেই প্লান্ট বন্ধ হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি, তারা মেরামত করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আরেক বাসিন্দা লংঙান ম্রো বলেন, এত টাকা খরচ করে প্রকল্প করা হলো, অথচ কয়েক মাসও টিকল না। আমরা যদি আবার পাহাড়ি ঝিরি বা দূরের উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করি, তাহলে এত টাকা ব্যয়ে প্রকল্প করার প্রয়োজন কী ছিল?
প্রকল্পটি অচল থাকার কারণ জানতে চাইলে লজিক প্রকল্পের উপজেলা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুকেন্দু ত্রিপুরা বলেন, প্রকল্পটি অচল থাকার বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছে। মূলত ইনভার্টার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পানি ফিল্টারিং করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে। দ্রুত প্লান্টটি সচল করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে লজিক প্রকল্পের প্রকৌশলী করুণাময় চাকমা বলেন, তিনি বর্তমানে রাঙামাটিতে রয়েছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না। পানি নিয়ে সমস্যা হয়ে থাকলে তা সমাধান করে দেওয়া যাবে। তবে এ বিষয়ে লজিক প্রকল্পের উপজেলা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ভালো জানবেন বলে জানান তিনি। উদ্বোধনের মাত্র তিন মাসের মধ্যে প্লান্টে ত্রুটি দেখা দেওয়ার কারণ এবং নির্মাণকাজ ও যন্ত্রপাতির মান যথাযথ ছিল কি না— এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলী কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেননি। এ বিষয়ে জানতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী আবু হানিফের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে সংযোগে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ-আল-ফয়সাল বলেন, বিষয়টি আমি অবগত নই। প্রকল্পটি কেন অচল হয়েছে এবং বর্তমানে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার ওপর রয়েছে, তা সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জেনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনগণের সুপেয় পানির মতো মৌলিক প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের সফলতা শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, প্রকল্পটি কতদিন কার্যকর থাকে এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা কতদিন সেবা পান, সেটিই এর সফলতার অন্যতম মাপকাঠি।