
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে কুমিল্লার চান্দিনা অংশে পৌঁছালে দুই পাশে চোখে পড়ে দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ। কোথাও সারি সারি শিম গাছের মাচা, কোথাও ফুলকপির বিশাল মাঠ, আবার কোথাও টমেটোর ভারে নুয়ে পড়া গাছ। এই সবুজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ আর হাজারো কৃষকের নিরলস শ্রমের গল্প। চান্দিনা আজ শুধু একটি উপজেলা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সবজি ভান্ডার হিসেবে নিজের নাম লিখিয়ে নিয়েছে। প্রতিদিন এখান থেকে শত শত ট্রাক সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়, যা মেটায় আমাদের প্রতিদিনের পুষ্টির চাহিদা।
চান্দিনার এই ব্যস্ততার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো এর ঐতিহ্যবাহী সবজি বাজারগুলো। এখানকার কৃষকদের দিন শুরু হয় যখন সারাদেশ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘড়ির কাঁটায় রাত ৩টা কি ৪টা বাজতেই চান্দিনার গ্রামগুলোতে শুরু হয় কর্মচাঞ্চল্য। টর্চের আলোয় খেত থেকে তাজা সবজি তোলার ধুম পড়ে যায়।
কৃষকদের লক্ষ্য একটাই ভোরের আলো ফোটার আগেই তাদের পরম মমতায় ফলানো ফসল নিয়ে বাজারে পৌঁছানো। কুয়াশাভেজা ভোরে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে বা ভ্যানে করে কৃষকদের বাজারে আসার দৃশ্যটি এক নান্দনিক আবহ তৈরি করে। কাঁচা সবজির সুবাস আর মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে বাজার প্রাঙ্গণ। চান্দিনা সদরের পাইকারি বাজার ছাড়াও মাধাইয়া, বদরপুর, মহিচাইল, নবাবপুর, রামমোহন এবং পার্শ্ববর্তী বাজারগুলোতে গেলে দেখা যায় এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। মহাসড়কের পাশেই বসে এই অস্থায়ী কিন্তু বিশাল বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানে কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই, আছে শুধু ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম আর শ্রমিকের হাঁকডাক। দূরদূরান্ত থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীরা ট্রাক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। চলে দ্রুততার সঙ্গে সবজি লোড করার কাজ। ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, বেগুন আর কাঁচা মরিচের বস্তাগুলো যখন একের পর এক ট্রাকে উঠতে থাকে, তখন বোঝা যায় এখানকার অর্থনীতির চাকা কতোটা সচল।
তবে এই ঝকঝকে সবজির পেছনের গল্পটা সব সময় মসৃণ নয়। একজন কৃষকের কাছে একেকটি ফসল তার সন্তানের মতো। চারা রোপণ থেকে শুরু করে নিড়ানি দেওয়া, সার প্রয়োগ এবং পোকা দমন, প্রতিটি ধাপে থাকে হাড়ভাঙা খাটুনি। রোদণ্ডবৃষ্টি মাথায় নিয়ে মাঠে কাজ করা এই কৃষকদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। কখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আবার কখনও বাজারে ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার ভয় তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। বিশেষ করে যখন ফলন খুব বেশি হয়, তখন অনেক সময় উৎপাদন খরচ তোলাও কঠিন হয়ে পড়ে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে অনেক সময় সাধারণ কৃষক তাদের ঘাম ঝরানো ফসলের সঠিক দাম থেকে বঞ্চিত হন। তবুও পরদিন ভোরে তারা আবার নতুন উদ্যমে মাঠে নামেন, কারণ মাটিই তাদের ধ্যান আর জ্ঞান। চান্দিনার সবজি চাষের একটি বিশেষ দিক হলো এখানকার আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার। অনেক কৃষক এখন বিষমুক্ত সবজি চাষে ঝুঁকছেন। জৈব সার এবং সেক্স ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করে ক্ষতিকর পোকা দমনের মাধ্যমে তারা স্বাস্থ্যসম্মত ফসল উৎপাদন করছেন। এটি শুধু পরিবেশের জন্যই ভালো নয়, বরং শহুরে ভোক্তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে এখানকার চাষিরা এখন বছরজুড়েই উচ্চফলনশীল বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করছেন, যার ফলে কোনো ঋতুতেই বাজার শূন্য থাকছে না। এই বিশাল সবজি বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান। ভ্যানচালক, ঝুড়ি বিক্রেতা, লোড-আনলোড করা শ্রমিক থেকে শুরু করে আড়তদার সবার সংসার চলে এই সবজিকে কেন্দ্র করে। চান্দিনার এই কৃষি বিপ্লব প্রমাণ করে যে, সঠিক সুযোগ ও পরিশ্রমের সমন্বয় ঘটলে গ্রামীণ অর্থনীতি কতোটা শক্তিশালী হতে পারে। মহাসড়কের পাশের এই কর্মব্যস্ততা শুধু পণ্য কেনাবেচা নয়, এটি বাংলার কৃষকের টিকে থাকার লড়াই আর সাফল্যের এক জীবন্ত মহাকাব্য। যতদিন চান্দিনার মাঠগুলো সবুজ থাকবে, ততদিন আমাদের রান্নাঘরগুলো সতেজ সবজিতে ভরে থাকবে, আর এভাবেই সচল থাকবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।