
শিল্পবর্জ্য ও অপরিশোধিত বর্জ্য মিশ্রণে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর পানি দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, যা প্রতিদিনের বর্জ্য অপসারণের (প্রায় ৬০,০০০ ঘনমিটার) কারণে মারাত্মকভাবে বাড়ছে। এরমূল কারণ হচ্ছে জেলার ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ শিল্পাঞ্চলের কলকারখানাগুলোর অধিকাংশই ইটিপি প্লান্ট নেই। যাদের আছে সে সকল কারখানাও নিয়মিত ইটিপি মেশিন চালায় না- খরচের ভয়ে। এ জন্য নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ও বিকেএমইএসহ বিভিন্ন মহল থেকে সেন্ট্রাল ইটিপি’র বিষয়টি বার বার আলোচনায় আসলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে শিল্প দূষণ চলছেই।
এরফলে শীতলক্ষ্যার পানিতে হাত ডুবালে আর চেনা যায় না। নদীর পানিতে মাছের খেলা করার সেই দৃশ্য বহু আগেই হারিয়ে গেছে। বরং পানির রং কালো, গন্ধে ভরপুর। যে নদী এক সময় জেলেদের জীবিকা, শহরের মানুষের খাওয়ার পানির ভরসা ছিল, এখন সেটি হয়ে উঠেছে শিল্পবর্জ্যরে ‘ড্রেন।
ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ শিল্পাঞ্চলের টেক্সটাইল, ডাইং, প্রিন্টিং, কেমিক্যাল, লেদার প্রসেসিং কারখানা প্রতিদিন অগণিত লিটার তরল বর্জ্য ফেলে দিচ্ছে শীতলক্ষ্যায়। কোনো প্রকার প্রক্রিয়াজাত না করে, সোজা পাইপ দিয়ে। শুধু শীতলক্ষ্যা নয়, সেই কালো পানির ঢেউ গিয়ে মিশছে বুড়িগঙ্গায়ও। ফলাফল দুই নদীর পানিতে অক্সিজেন কমছে, মাছ মারা যাচ্ছে, নদী হচ্ছে জীবহীন।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী প্রতিটি শিল্পকারখানার জন্য এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলে অন্তত দেড় হাজার টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েক ডজন কারখানায় ইটিপি স্থাপন করা হলেও, সেগুলো নিয়মিত চালু থাকে না।
কারখানার মালিকরা বলেন, ইটিপি চালানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রতিদিন কয়েক হাজার লিটার বর্জ্য পরিশোধন করতে গেলে বিদ্যুৎ, কেমিক্যাল, প্রযুক্তিবিদের বেতন সব মিলিয়ে ব্যয় হয় লাখ টাকার বেশি। এই অতিরিক্ত খরচ মেটাতে চাই না অনেকেই। তাই কাগজে-কলমে ইটিপি থাকলেও বাস্তবে তা অচল। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রস্তাব দিচ্ছেন সেন্ট্রাল ইটিপি। অর্থাৎ ছোট ছোট প্রতিটি কারখানার আলাদা ইটিপি না রেখে, পুরো শিল্পাঞ্চলের জন্য একটি বা একাধিক কেন্দ্রীয় পরিশোধনাগার তৈরি করা। সব কারখানার তরল বর্জ্য নির্দিষ্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে এসে সেই সেন্ট্রাল ইটিপিতে জমা হবে। পরে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত হয়ে পরিশোধিত পানি আবার নদীতে ফেলা যাবে।
২০১৪ সাল থেকেই এই সেন্ট্রাল ইটিপি নিয়ে আলোচনার শুরু। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, বিকেএমইএ (বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন), পরিবেশ অধিদপ্তর সবার বৈঠকেই বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিশ্রুতি এসেছে অনেক। তবে বাস্তবে আজও কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি।
২০১৭ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর একটি সমীক্ষা চালায়। সেখানে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে অন্তত তিনটি সেন্ট্রাল ইটিপি স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা) সহ কয়েকটি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনাও হয়।
কিন্তু এরপর আর অগ্রগতি নেই। বরং বিষয়টি বারবার ফাইলের মধ্যে চাপা পড়ে গেছে। প্রতি বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবস কিংবা নদী রক্ষা দিবসে নতুন করে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি ছোড়া হয়। সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়, শিগগিরই নারায়ণগঞ্জে সেন্ট্রাল ইটিপি।’ কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যপট একই থেকে যায়।
শীতলক্ষার পানি শুধু নোংরা নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি। নারায়ণগঞ্জ শহরের বেশ কিছু এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে গেছে। ফলে অনেকে নদীর পানি প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। এই দূষিত পানি ব্যবহার করার কারণে চর্মরোগ, পেটের অসুখ, এমনকি কিডনি রোগ বাড়ছে।
নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. নুরুল আমিন বলেন, শিল্পবর্জ্যে বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতু থাকে আর্সেনিক, সীসা, ক্রোমিয়াম। এগুলো শরীরে ঢুকলে ধীরে ধীরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়তে দেখছি। এর সঙ্গে শিল্পবর্জ্যের সম্পর্ক অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
শীতলক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার জেলের জীবন। এক সময় এই নদীতে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। এখন সেই দিন নেই। ইলিশ তো দূরের কথা, ছোট মাছও আর মেলে না। ফতুল্লার কুতুবপুর ইউনিয়নের জেলে খোকন দাস বলেন, আমরা এখন নদীতে জাল ফেলি, কিন্তু মাছ পাই না। নদীর পানি কালো, মাছ মরেও ভেসে ওঠে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এক জরিপে জানিয়েছে, শীতলক্ষার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা (ডিও) স্বাভাবিকের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। অর্থাৎ এই পানিতে মাছ বাঁচতে পারে না।
কারখানার মালিকদের যুক্তি, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে খরচ কমানো জরুরি। ইটিপি চালাতে গেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। আবার বিদেশি ক্রেতারা এই বাড়তি খরচ মেনে নিতে চায় না। ফলে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়েই ইটিপি বন্ধ রাখেন।
বিকেএমইএ’র এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের সদস্য কারখানাগুলোর অধিকাংশ ছোট ও মাঝারি আকারের। তারা আলাদা ইটিপি চালাতে পারে না। এজন্য সেন্ট্রাল ইটিপি দরকার। কিন্তু সরকার থেকে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না।
পরিবেশবাদীরা এ ধরনের অজুহাত মানতে নারাজ। তাদের মতে, শিল্পকারখানার মুনাফার জন্য নদীকে মেরে ফেলা কোনোভাবেই ন্যায্য নয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নারায়ণগঞ্জ শাখার কয়েকজন নেতা বলেন, সরকারি সংস্থাগুলো ব্যবসায়ীদের চাপে নরম থাকে। এজন্য আইন প্রয়োগ হয় না। অথচ পরিবেশ আদালত আছে, আইনে কঠোর শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু বাস্তবে কয়েকটা প্রতীকী জরিমানার বাইরে কিছু হয় না।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, ইটিপি ছাড়াই কারখানা চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে নারায়ণগঞ্জে নিয়মিত নজরদারি নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা হঠাৎ করে অভিযানে গেলেও আগেভাগেই খবর পৌঁছে যায় কারখানা মালিকদের কাছে। তখন তারা কয়েক ঘণ্টার জন্য ইটিপি চালু করে দেয়। পরিদর্শকরা চলে গেলে আবার বন্ধ। এভাবে বছরের পর বছর চলছে এক প্রকার ‘চোর-পুলিশ খেলা’। অথচ এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে- দূষিত পানি, অসুস্থ জীবন, নদীর মৃত্যু।
সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, আমরা শুধু ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাপনা দেখি। শিল্পবর্জ্যের ব্যাপারে আইনগত ক্ষমতা নেই। তবুও আমরা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে সেন্ট্রাল ইটিপির কথা বলি। কিন্তু সরকারের নীতি নির্ধারকরা পদক্ষেপ নেন না।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বিদেশি ক্রেতারা এখন পরিবেশবান্ধব উৎপাদনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। গ্রিন ফ্যাক্টরির সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনুপস্থিত। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনাম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন কয়েক বছর আগে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানিয়েছিল, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত টেকসই হতে হলে শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কার দরকার। নইলে বাজার হারানোর ঝুঁকি বাড়বে।
বার বার ইটিপি’র কথা আলোচনার টেবিলে ঝড় তোলে। কিন্তু ২০২৫ সালেও সেই পরিকল্পনা বাস্তব হয়নি। আলোচনা হয়েছে অসংখ্য; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই নয়। যেন এক প্রকার ‘আলোচনার কারখানা’ চালু আছে, বাস্তবায়ন নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমত সরকারকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে। দ্বিতীয়ত শিল্প মালিকদের খরচ ভাগাভাগি করার জন্য একটি কার্যকর মডেল তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সহযোগিতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজা হক বলেন, শিল্পায়ন থামানো যাবে না; কিন্তু টেকসই না হলে সেটা ধ্বংস ডেকে আনবে। সেন্ট্রাল ইটিপি ছাড়া শীতলক্ষ্যাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জবাসীর দাবি আর আলোচনা নয়, এবার বাস্তব পদক্ষেপ চাই।