
শীতের সকাল, তখন পূর্ব আকাশে সূর্য ওঠেনি। শিশিরভেজা মেঠো পথে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন শ্যামল মৃধা। তারা এক হাতে কলস আর অন্য হাতে বড় একটি বালতি। তিনি মূলত যাচ্ছেন, তাদের নিজস্ব গোলগাছের বাগানে, রস সংগ্রহ করতে। তার মতো পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের নবীপুর গ্রামের অর্ধশতাধিক চাষি প্রতিদিন সকাল হলেই ছুটে যায় গোল বাগানে। একইসঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ওইসব পরিবারের গৃহবধূরা। কেউ কলস কিংবা বালতি নিয়ে যাচ্ছে। কেউ রস ভর্তি কলস বালতি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। কেউ কেউ সংগৃহীত রস বাড়ির উঠানে নিয়ে আসছেন। আবার সেই রস গৃহবধূর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ছেঁকে ঢোঙ্গায় রাখছেন। এরপর তারা সংগৃহীত রস তাফালে খরকুটো দিয়ে অধিক তাপে ফুটিয়ে তৈরি করেছেন সুস্বাদু গুড়।
স্থানীয়রা জানান, নাম গোলগাছ হলেও দেখতে কিছুটা নারিকেল পাতার মতো। নোনা জলে জন্ম, অঙ্গপ্রতঙ্গ সবই নোনা। অথচ এর ডগা থেকে বেরিয়ে আসছে মিষ্টি রস। সেই রস দিয়ে তৈরি হচ্ছে গুড়। সুস্বাদু এই গুড়ের চাহিদাও ব্যাপক। মুখে নিলেই বুঝতে পারেন এর স্বাদের ভিন্নতা। এটি পাম গোত্রের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদ বলে জানান কৃষিবিদরা। গোলগাছ চাষিদের সূত্র জানা গেছে, এ উপজেলায় অন্তত ৩০০ পরিবার গোলগাছের রস সংগ্রহ করার পর তা দিয়ে গুড় তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই এই মৌসুমে গোলের গুড় তৈরি করে প্রতিটি পরিবার বারতি ৫০-৬০ হাজার টাকা আয় করছেন।
সংশ্লিষ্ট কৃষকদের তথ্য মতে, কলাপাড়া উপজেলায় প্রায় ৬৫ হেক্টর জমিতে গোলগাছের বাগান রয়েছে। শীতের মৌসুমে নীলগঞ্জ, মিঠাগঞ্জ ও চাকামইযা ইউনিয়নের বেশ কয়েটি গ্রামের বাসিন্দা রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করছেন। চলতি মৌসুমে এখান থেকে অন্তত ২০০ টন গোলের গুড় উৎপাদিত হচ্ছে। এই গুড়ের বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা।
গোলগাছের রস দিয়ে গুড় তৈরির সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গোলগাছের পরিচর্যা করতে তেমন কোনো খরচ নেই। গুড় উৎপাদন ছাড়াও রয়েছে এ গাছের বহুবিধ ব্যবহার। তবে এর রসের পিঠা বা পায়েস অতি মুখরোচোখ হয়। এক সময় গুড়ের পরিচিতি তেমন একটা না থাকলেও এখন বাণ্যিজিকভাবে এর প্রসারতা লাভ করেছে। সুমিষ্ট এ গুড় পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন হাট বাজারে। গুড় উৎপাদন ছাড়াও রয়েছে এ গাছের বহুবিধ ব্যবহার। এদিকে বনবিভাগের পক্ষ থেকে এ উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে বেশকিছু গোল গাছের বীজ রোপণ করেছেন বলে জানা গেছে।