ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

শিমুলের লাল গালিচায় ঢাকা চান্দিনার প্রকৃতি

শিমুলের লাল গালিচায় ঢাকা চান্দিনার প্রকৃতি

বসন্তের আগমনে প্রকৃতির যে রূপান্তর ঘটে, তার সার্থক প্রতিফলন দেখা যায় কুমিল্লার চান্দিনার প্রান্তরে। একসময় চান্দিনা মানেই ছিল দিগন্তজোড়া ঝোপঝাড় আর ঘন সবুজ অরণ্যের এক লীলাভূমি। সেই অরণ্যের বুক চিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত অসংখ্য বিশালাকার শিমুল গাছ। ফাল্গুনের আগুনঝরা দিনে যখন এসব গাছের সব পাতা ঝরে গিয়ে শুধু টকটকে লাল ফুল ফুটত, তখন মনে হতো যেন পুরো জনপদ এক রক্তিম উৎসবে মেতেছে। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তে আজ সেই দৃশ্যপট অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে মানুষ যখন তার মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছে, তখন কোপ পড়েছে প্রকৃতির সেই আদিম অরণ্যে। একের পর এক ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি ও কলকারখানা, যার বলি হয়েছে অগণিত শিমুল গাছ।

কালের পরিক্রমায় চান্দিনার সেই চিরচেনা শিমুলের জঙ্গল এখন শুধু কল্পিত ইতিহাস। এখন আর মাইলের পর মাইল লাল আভার দেখা মেলে না। তবে ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে এখনও কিছু কিছু বাড়ির আঙিনায় কিংবা পরিত্যক্ত ভিটায় দু-একটি শিমুল গাছ টিকে আছে। বিশেষ করে গ্রামীণ রাস্তার ধারে এখনও কদাচিৎ চোখে পড়ে নিঃসঙ্গ কোনো শিমুল বৃক্ষ, যা বছরের অন্য সময়ে অবহেলিত থাকলেও বসন্তের ছোঁয়ায় নিজের অস্তিত্বের জানান দেয় সগৌরবে। যখন ডালে ডালে রক্তিম শিমুল ফোটে, তখন বোঝা যায় প্রকৃতির প্রাণশক্তি এখনও পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। এই ফুলগুলো যেন চান্দিনার বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যের এক একটি রঙিন বিজ্ঞাপন।

শিমুল গাছ শুধু সৌন্দর্যের আঁধার নয়, এটি জীববৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। এই রক্তিম আভার টানে ছুটে আসে কাক, শালিক, ফিঙে ও বুলবুলিসহ নাম না জানা অনেক প্রজাতির পাখি। শিমুলের মধু পান করতে পাখির দল যখন কিচিরমিচির শব্দে মেতে ওঠে, তখন এক অদ্ভুত প্রাণচঞ্চল মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। পাখির কলকাকলি আর বাতাসের দোলায় ঝরে পড়া পাপড়ির নৃত্য দেখে মনে হয় প্রকৃতি যেন তার নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রে সুর তুলেছে। এই দৃশ্যটি বিশেষ করে সকালের স্নিগ্ধ রোদে এক মায়াবী রূপধারণ করে, যা যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তিকে নিমিষেই ভুলিয়ে দেয়।

শিমুলকে কেন্দ্র করে চান্দিনার গ্রামীণ জনপদে গড়ে উঠেছে এক অনন্য সামাজিক সংস্কৃতি। যখন গাছ থেকে টকটকে লাল ফুলগুলো টুপটাপ শব্দে মাটিতে ঝরে পড়ে, তখন গ্রামের ছোট ছোট শিশুদের আনন্দের সীমা থাকে না। সাতসকালে উঠে তারা দলবেঁধে শিমুলতলায় ভিড় জমায়। ঝরে পড়া সেই সতেজ ফুলগুলো কুড়িয়ে নিয়ে তারা মেতে ওঠে এক অনাবিল খেলায়। কেউ মালা গাঁথে, কেউবা ফুল সাজিয়ে ঘর বানায়। শৈশবের এই সহজ-সরল আনন্দ এখনকার স্মার্টফোনে মগ্ন প্রজন্মের কাছে এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। আবার শিমুল ফুলের উপযোগিতা শুধু শিশুদের খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় প্রবীণ মহিলাদের কাছে এই ঝরা ফুলের রয়েছে ভিন্ন গুরুত্ব। যখন ফুলগুলো একটু পুরোনো বা শুকিয়ে আসে, তখন তারা সেগুলো পরম যত্নে কুড়িয়ে নেন। গ্রামাঞ্চলে শিমুল ফুলের পাপড়ি রান্নার কাজে লাকড়ি হিসেবে ব্যবহারের প্রচলন এখনও টিকে আছে। অনেকে মনে করেন, শিমুলের কুঁড়ি বা পাপড়ির ঔষধি গুণ রয়েছে যা পেটের পীড়া উপশমে সহায়ক।

তবে শিমুলের আসল গুরুত্ব অনুভূত হয় এর তুলা থেকে। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত শিমুল তুলা দিয়ে তৈরি বালিশ ও লেপ স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক ও পরিবেশবান্ধব। সিনথেটিক তুলার ভিড়ে শিমুল তুলার কদর শহরকেন্দ্রিক বাজারে কমলেও চান্দিনার গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর চাহিদা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, বর্তমানে নতুন করে শিমুল গাছ লাগানোর হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ধীরগতিতে বড় হওয়া এবং তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক লাভ কম হওয়ার কারণে মানুষ আর এই গাছ রোপণে উৎসাহী হচ্ছে না। ফলে চান্দিনার বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বসন্তের এই প্রাণভোমরা।

পরিশেষে বলা যায়, শিমুল শুধু একটি ফুল নয়, এটি চান্দিনার গ্রামীণ জনজীবনের স্মৃতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদিও আধুনিকতার আগ্রাসনে ঝোপঝাড় কমে গেছে এবং বসতি বেড়েছে, তবুও অবশিষ্ট যে কটি শিমুল গাছ টিকে আছে, সেগুলো রক্ষা করা আজ সময়ের দাবি। শিমুলের লাল গালিচায় ঢাকা চান্দিনার এই রূপটি যদি আমরা টিকিয়ে রাখতে না পারি, তবে আগামী প্রজন্ম হয়তো শুধু স্থিরচিত্রেই দেখবে- কেমন ছিল বসন্তের সেই রক্তিম মায়া। প্রকৃতির এই অনন্য দানকে আগলে রাখলে তবেই টিকে থাকবে পাখিদের কলতান আর শিশুদের শৈশব রাঙানো সেই সোনালি দিনগুলো।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত