ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার বাড়ি জামে মসজিদ

কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার বাড়ি জামে মসজিদ

কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁয়িয়ে আছে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর জমিদার বাড়ি জামে মসজিদ। ১৭৮০ সালে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও মসজিদ নির্মাণে সময় লেগে যায় প্রায় ২১ বছর। মসজিদটি এরইমধ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় ২০০৬ সালে অন্তর্ভুক্ত হলেও এখনও পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।

ঠাকুরগাঁও জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ। জেলায় ছড়িয়ে থাকা অনেক পুরাকীর্তির মধ্যে প্রায় ২৫০ বছরের পুরোনো জামালপুর জমিদার বাড়ি জামে মসজিদ। নির্মাণশৈল্পী আর অপূর্ব কারুকাজ মুগ্ধ করে যেকোন মানুষকে। ১৭৮০ শতাব্দীতে মসজিদটির ভিত্তি স্থাপন করেন তৎকালীন জমিদার জামাল উদ্দীন চৌধুরী। জামাল উদ্দীনের নামে নামকরণ করা হয় জামালপুর জামে মসজিদ এবং এলাকার নাম বসন্তনগর থেকে হয়ে যায় জামালপুর। আর জামালপুর থেকে জামালপুর ইউনিয়ন।

জামালপুর চৌধুরী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিম বাংলার তৎকালীন উত্তর দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট মহকুমার রায়গঞ্জ থানার বারোর পরগনা তাজপুর গ্রামে পীর বংশে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল হালিম। ১৭৬৫ শতাব্দীর দিকে আব্দুল হালিম কাপড়ের ব্যবসার উদ্দেশে তাজপুর থেকে বসন্ত নগরে আসেন। যার বর্তমান নামকরণ করা হয়েছে জামালপুর এবং সেখানে তিনি বসতি স্থাপন করেন।

কাপড়ের ব্যবসা করতে করতে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের জমিদার লালা মুক্তি প্রসাদ নন্দের কাছে লাটের পারপূগী মৌজার প্রায় ১ হাজার বিঘা জমি কেনার মাধ্যমে জমিদারি পান আব্দুল হালিম চৌধুরী। ১৭৭০ দশকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া প্রশাসন তাকে চৌধুরী উপাধিতে ভূষিত করে। জমিদার থাকাকালীন পর্যায়ক্রমে তিনি মোট ২৬ হাজার একর জমি কিনেছিলেন। বর্তমানে সেই জমিগুলো ৩ জেলার ৮ থানায় পড়েছে। থানাগুলো হলো-আটোয়ারি, বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর, রায়গঞ্জ, রাণীশংকৈল, পীরগঞ্জ, বীরগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁও। তখন তিনি ব্রিটিশ চৌধুরী নামে খ্যাত ছিলেন।

জানা যায়, আব্দুল হালিম চৌধুরী ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে তার রাজ প্রাসাদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। রাজ প্রাসাদের দ্বিতীয় তলার নির্মাণ কাজ চলাকালীন ১৭৮০ দশকে ভারতের উত্তর প্রদেশের এলাহবাদ থেকে মিস্ত্রী এনে এই মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন তিনি।

এর কিছুদিন পর আব্দুল হালিম চৌধুরীর মৃত্যু হলে জমিদারত্ব পান তার ছেলে রওশন আলী চৌধুরী। পরে রওশন আলী চৌধুরীর মৃত্যু হলে তার ছেলে জামাল উদ্দীন চৌধুরী জমিদারির দায়িত্বভার বহন করেন এবং মসজিদ নির্মাণ কাজ চলমান রাখেন। জামাল উদ্দীন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার ছেলে নুনু মোহাম্মদ চৌধুরী ১৮০১ দশকে মসজিদটির নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। মসজিদটি নির্মাণ করতে চার পুরুষের প্রায় ২১ বছর সময় লাগে। মসজিদ নির্মাণের প্রধান দুই মিস্ত্রী হংস রাজ ও রামহিৎ হিন্দু ধর্মের ছিলেন। জমিদারবাড়ির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার ফলে মসজিদের ব্যয়বহুল নির্মাণ কাজ শেষ হলেও জমিদার বাড়িটির নির্মাণ অসমাপ্ত থেকে যায়।

জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ অঙ্গনে প্রবেশমুখে বেশ বড় সুন্দর একটি তোরণ রয়েছে। মসজিদটির শিল্পকলা দৃষ্টিনন্দিত, মনোমুগ্ধকর ও প্রশংসাযোগ্য। মসজিদে বড় আকৃতির তিনটি গম্বুজ আছে। গম্বুজের শীর্ষদেশ পাথরের কাজ করা। এই মসজিদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো মিনারগুলো। মসজিদের ছাদে ২৪টি মিনার আছে। একেকটি মিনার ৩৫ ফুট উঁচু এবং প্রতিটিতে নকশা করা রয়েছে। গম্বুজ ও মিনারের মিলনে সৃষ্টি হয়েছে অপূর্ব সৌন্দর্য। এত মিনার সচরাচর কোনো মসজিদে দেখা যায় না। মসজিদটির চারটি অংশ হলো মূল কক্ষ, মূল কক্ষের সঙ্গে ছাদসহ বারান্দা, ছাদবিহীন বারান্দা এবং ছাদবিহীন বারান্দাটি অর্ধ প্রাচীরে বেষ্টিত হয়ে পূর্বাংশে মধ্যখানে চার থামের উপর ছাদ বিশিষ্ট মূল দরজা। খোলা বারান্দার প্রাচীরে এবং মূল দরজার ছাদে ছোট ছোট মিনারের অলংকার রয়েছে। মসজিদটির মূল দৈর্ঘ্য ৪১ ফুট ৬ ইঞ্চি। প্রস্থ ১১ ফুট ৯ ইঞ্চি। মসজিটির বারান্দা দুইটি। প্রথম বারান্দার দৈর্ঘ্য ৪১ ফুট ২ ইঞ্চি ও প্রস্থ ১১ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং দ্বিতীয় বারান্দার দৈর্ঘ্য ৪১ ফুট ২ ইঞ্চি, প্রস্থ ১৯ ফুট ৫ ইঞ্চি। মূল কক্ষের কোণগুলো তিন থাম বিশিষ্ট। এর জানালা দুটি, দরজা তিনটি, কুলুঙ্গি দুটি। মসজিদটির ভিতরে দরজায়, বারান্দায় এবং বাইরের দেয়ালগুলোতে প্রচুর লতাপাতা ও ফুলের সুদৃশ্য নকশা রয়েছে। একসঙ্গে এই মসজিদে ৩০০ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে। ১৮৮৫ সালের দিকে ইমদাদুর রহমান চৌধুরী সেই স্থানটির নাম বসন্ত নগর পরিবর্তন করে জামাল উদ্দীন চৌধুরীর নামানুসারে জামালপুর নামকরণ করা হয়। বর্তমানে এটি জামালপুর এষ্টেট নামে পরিচিত।

মসজিদ দেখতে আসা সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যা আগে কখনও দেখিনি তা এখানে এসে দেখে অভিভূত হলাম। যেহেতু এটি অতি পুরাতন একটি মসজিদ, তাই এটিকে সংরক্ষণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই। মসজিদটি সংরক্ষণ করা গেলে এটির স্থায়ীত্ব বৃদ্ধি পাবে।’

এখানে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা মসজিদটির কারুকাজ দেখে অবাক হয়ে বলেন, সরকার যদি মসজিদটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাহলে এটি ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে থাকবে ও ভবিষৎ প্রজন্মও এটি দেখতে পারবে।

জামালপুর জমিদার বাড়ি জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা নূরুল আনোয়ার চৌধুরী বলেন, ১৯৬৫ সালের দিকে মসজিদটির ১১টি মিনার ঝড় বৃষ্টিতে ভেঙ্গে যায়। তার মধ্যে ৭টি মিনার তৎকালিন চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা মেরামত করেন এবং আরও ৪টি মিনার এখনও ভাঙ্গা অবস্থায় আছে।

তিনি আরও বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নিলেও এখন পর্যন্ত মসজিদটি সংরক্ষণে তারা কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। স্থানীয় প্রশাসন ও সরকার যদি মসজিদটি সংরক্ষণের জন্য সুদৃষ্টি দিত তাহলে এটি আরও দৃষ্টিনন্দিত হয়ে থাকবে বলেও মনে করেন তিনি।

১৯৯৫ সাল থেকে মসজিদের ইমামতি করে আসছেন হাফেজ মো. রুহুল আমীন। তিনি বলেন, ‘মসজিদটি দেখতে শুধু বাংলাদেশ থেকে নয় বিদেশ থেকেও মানুষ আসেন। এখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ আসেন।’

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ইরশাত ফারজানা বলেন, জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদটি সংস্করণ করার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। যাতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটি সংস্কারের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন তার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত