ঢাকা বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সাহিত্যিক রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী

সাহিত্যিক রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্য ছাত্র, বিশিষ্ট রবীন্দ্রগবেষক, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক, রাজনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারক, সাহিত্য সমালোচক, সংস্কৃতি সেবক, লোকগবেষক, প্রাবন্ধিক, কবি ও সাহিত্যিক রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর মহাপ্রয়াণ দিবস ছিল গত সোমবার। ১৯৮৮ সালের এই দিনে তিনি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী আজীবন সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন, দেশভাগ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন, কৃষকের তেভাগা আন্দোলন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর অবদান অনন্য। ১৯৪১ সালে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শেষ সাহিত্য সভায় তিনি অভিভাষণ রচনা ও পাঠ করার বিরল সম্মান অর্জন করেন। এছাড়া তিনি একাধিক সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করেছেন এবং বাংলা সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।

শরীয়তপুরের প্রশাসনিক বিকাশেও তার অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৭৭ সালে শরীয়তপুর মহকুমা নামকরণ এবং পালংয়ে মহকুমা সদর স্থাপনে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ শরীয়তপুরকে জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠায় এবং বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়ও তিনি ছিলেন একজন সফল জনপ্রতিনিধি। ১৯৫৭ সালে পালং ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং পরে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। সাহিত্যিক হিসেবে রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও সৃজনশীল। তিনি প্রায় তিন হাজার কবিতা, ১২৫টি ছোটগল্প, দুই শতাধিক প্রবন্ধ এবং একাধিক নাটক, নাটিকা ও প্রহসন রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে— পূর্বাপর, পদক্ষেপ, অভ্যুদয়, কয়েকজন লোককবি ও প্রসঙ্গত, রবীন্দ্র তরুমূলে, ঝরাপাতা এবং সুকান্তের হস্তাক্ষরে কবিতার পাণ্ডুলিপি। তার স্মৃতিকে ধরে রাখতে ১৯৮৮ সালের ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাহিত্যিক আবু ইসহাকের সভাপতিত্বে ‘রথীন্দ্র সাহিত্য পরিষদ’ গঠিত হয়। সংগঠনটি প্রতিবছরের ন্যায় এবারও তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাহিত্য প্রতিযোগিতা এবং পুরস্কার বিতরণসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে। তার ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার সকাল ৮টায় তার সমাধিতে রথীন্দ্র সাহিত্য পরিষদ, উদীচী, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ শরীয়তপুর, খেলাঘর শরীয়তপুর, প্রগতি লেখক সংঘসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের অংশগ্রহণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

বিকালে স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি মিলনায়তনে রথীন্দ্র সাহিত্য পরিষদের আয়োজনে আলোচনা সভা ও কবিতা পাঠের আয়োজন করা হয়।

রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর মহাপ্রয়াণ দিবসে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তার অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন শরীয়তপুরবাসী। বিশিষ্টজনদের মতে, তার সমৃদ্ধ সাহিত্যকর্ম ও জীবনাদর্শ নিয়ে আরও ব্যাপক গবেষণা, চর্চা ও প্রচার এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত