
পাবনার কৃষি প্রধান এলাকা নবীণ গ্রামে বসবাসকারী প্রায় ৪ শতাধিক পরিবারের মানুষ যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে চরম দুর্ভোগে ভুগছেন। বছরের পর বছর ধরে এই গ্রামের মানুষ দুর্ভোগ ও অবহেলার শিকার হলেও কোনো মাথা ব্যাথা নেই জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসনের। চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম নবীণ। চলনবিল বেষ্টিত এই গ্রামের চারিদিকে ধু-ধু বিল। বর্ষকালে এই গ্রামের চারিদিকে থই থই পানি, আর শুকনো মৌসুমে মাটির পায়ে হাঁটা পথ। বৃটিশ আমলে এই গ্রামে বসতি গড়ে উঠলেও এখনো শত শত বছর পিছিয়ে আছেন এই গ্রামের মানুষের জীবনযাপন। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৪ বছর পার হলেও নবীণ গ্রামে বিদ্যুৎ ছাড়া পৌঁছায়নি আধুনিক কোনো সুযোগ সুবিধা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রামে নেই কোনে কংক্রিটের রাস্তা। নেই কোনো স্বাস্থ্য সেবা। নবীণ গ্রামের মানুষ জন্মের পর থেকে কখনো দেখেননি কোনো যানবাহন। একটি মাত্র ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে গ্রামে। কেউ অসুস্থ হলে বা কোনো মালামাল পরিবহণের জন্য সেই একটি মাত্র ঘোড়ার গাড়ি-ই ভরসা। শুধু তাই নয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় এই গ্রামে বিয়ে দিতে চান না কনে পক্ষের লোকজন। কৃষি প্রধান এলাকা হিসেবে উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে সমাদৃত নবীণ গ্রাম। অথচ যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন তারা।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বিশাল জলরাশির মাঝে একখন্ড দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে আছে নবীণ গ্রাম। এই গ্রামে ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শিক্ষার্থীরা যাচ্ছে নৌকা নিয়ে অথবা কাদা মাটির মধ্যে দিয়ে পায়ে হেঁেট। এর বাইরে নেই কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। গ্রামের মাঝখানে ‘ভায়রা বাজার’ নামে একটি বাজার আছে। সেখানে ৩টি চা স্টল ছাড়া কিছুই নেই। সবজি বা মুদিখানার বাজার করতে বর্ষাকালে নৌকায় করে ছাইকোলা বা হান্ডিয়াল বাজারে যান এই এলাকার সাধারণ মানুষ। বাড়িতে কোনো স্বজন এলে অ্যাপায়নের কোনো সুযোগ নেই।
কয়েকবছর আগে নবীণ গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছালেও সেখানে নেই কোনো স্বাস্থ্য সেবা। জরুরি প্রয়োজনে বা কেউ অসুস্থ হলে নৌকায় করে রোগিদের আনা হয় ছাইকোলা অথবা হান্ডিয়াল বাজারে। সেখান থেকে প্রায় ১৫/১৬ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে অসুস্থ রোগিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। এই গ্রামে বিগতদিনে বেশ কয়েকজন প্রসূতি মা ও সদ্যজাত শিশু সন্তান শুধুমাত্র চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। নবীণ গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ কৃষি পেশার সাথে জড়িত। কিন্তু যুগ যুগ ধরে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল ফলানোর পর শুধুমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় ফসলের নায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফড়িয়ারা গ্রামে গিয়ে নামমাত্র মূল্যে কৃষকের মূল্যবান ফসল খুব অল্প দামে কিনে আনছেন। এতে অর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন ওই এলাকার কৃষক।
এখানেই শেষ নয়, সন্ধ্যার পর নবীণ গ্রামটিতে ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করে। বিগত সরকারের আমলগুলোতে শুধুমাত্র ভোটের সময় বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীরা গ্রামটির উন্নয়নে কাজ করবেন বলে কথা দিয়ে আসলেও সেখানে যাননি কোনো জনপ্রতিনিধি। তাদের দেওয়া কথাও রাখেননি! চরনবীণ থেকে নবীণ গ্রামের শুরু পর্যন্ত একটি ব্রিজ ও বিলের মধ্যে দিয়ে হান্ডিয়াল অভিমুখে সাবমারসেবল (কংক্রিটের রাস্তা) রাস্তার দাবি জানিয়ে আসছেন এলাকার শত শত মানুষ। কিন্তু আশ্বাস ছাড়া কিছুই মেলেনি এই গ্রামের মানুষের ভাগ্যে।
নবীণ গ্রামের কৃষক হাশেম আলী বলেন, বর্ষকালে নৌকা আর শুকনো মৌসুমে বিলের মধ্যে দিয়ে কাঁচা রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসতে হয়। ভোটের সময় কিছু নেতা এসে বলে, ভোটে জিতলে সব করে দেবে। কিন্তু ভোট ফুরালে তাদের আর দেখা যাওয়া যায় না। আমাদের এলাকায় সবচেয়ে বেশি ফসল ফলে। কিন্তু পরিবহণ ব্যবস্থা না থাকায় আমরা শহরে নিতে পারি না। যে কারণে খুব অল্প দামে গ্রামে বসেই ফসল বিক্রি করতে হয়।
ইনতাজ প্রামানিক বলেন, আমাদের নবীণ গ্রামে কেউ কনে দেখতে এসে গ্রামের অবস্থা দেখেই ফিরে যায়। কেউ বিয়ে দিতে চায় না। আধুনিক সভ্যতার কোনো ছোঁয়া লাগেনি আমাদের গ্রামে। একটা সাবমারসিবল রাস্তা ও একটা ব্রিজ পারে আমাদের কষ্ট দূর করতে।
এ ব্যাপারে পাবনার চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুসা নাসের চৌধুরী বলেন, আসলেই নবীণ গ্রামের মানুষ খুব কষ্টে জীবনযাপন করে।
এতোদিন কেন ওই গ্রামে উন্নয়ন হয়নি সেটা না খুঁজে নবীণ গ্রাম নিয়ে কাজ করছি। কীভাবে গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ কমানো যায় সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ওই গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ লাগঘবে কিছু একটা হবে।