ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বাঁশখালীতে পানি নামলেও থামছে না দুর্ভোগ

সাত খাতে ক্ষতি ২০০ কোটি টাকা
বাঁশখালীতে পানি নামলেও থামছে না দুর্ভোগ

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ৯ দিনের বন্যায় ১ লক্ষ মানুষ পানিবন্দি ছিল। ঘরবাড়ি, রাস্তা ঘাট (সড়ক), কৃষি, মৎস্য, বেড়িবাঁধসহ সাতটি খাতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অন্তত প্রায় ২০০ কোটি টাকার। উপজেলা প্রশাসনের করা প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। শুক্রবার বিকালে বাঁশখালীর বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনকালে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিকট তালিকাটা হস্তান্তর করা হয় বলে জানা গেছে। বাঁশখালীতে ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ৯ দিন মুষলধারে বৃষ্টি হয়। এর সঙ্গে পাহাড়ি ঢল যুক্ত হয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যা দেখা দেয়। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি স্পটে পাহাড় ধসের ঘটনাও ঘটে। ১২ জুলাইয়ের পর বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এখনো অনেক মানুষ পানিবন্দী।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্যার পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের চলাচলের সমস্যা হচ্ছে। দুর্গত এলাকার অনেক মানুষ সুপেয় পানিসহ খাদ্যের সংকটে রয়েছে। তবে ত্রাণসহায়তা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার প্রভাবে উপজেলার ১২ টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় ৫৪ টি ওয়ার্ডে কমবেশি প্লাবিত হয়েছে। ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ১২টি ইউনিয়নের বাসিন্দারা বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। বন্যায় এই উপজেলার অন্তত এক লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ৪ শিশুর , ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে আসবাহার বেগম (৩৫) ও মরিয়ম বেগম (১৮) নামে দুই নারীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন। সাপের কামড়ে আহত হয়েছে ২১ জন।

এতে সরকারিভাবে শুকনো খাবার ও চাল বিতরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিনই মানুষ সহায়তা নিয়ে বন্যাকবলিত মানুষের পাশে ছুটে আসছেন। তবে সমন্বয়হীনতার কারণে ত্রাণের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ তুলেছেন। তবে ত্রাণ বিতরণের চেয়ে এখন পুনর্বাসন সামগ্রীর প্রয়োজনীয়তা বেশি বলে দাবী জানান বন্যাকবলিত মানুষের। বন্যায় বসতঘর ভেঙ্গে যাওয়া কালীপুর পালগ্রাম ইজ্জত নগর এলাকার বাসিন্দা গুলজার বেগম জানান, গত বুধবার রাতে ঘরে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। এর মধ্যেই চার সন্তান নিয়ে পানির ওপরই বসবাস করছি।

ঘরে রান্না করা যাচ্ছে না। পাঁচ দিন ধরে শুকনা খাবার খেয়ে বেঁচে আছি। উপজেলায় এ পর্যন্ত ত্রাণ হিসেবে ১০ হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনা খাবার, ৭ হাজার প্যাকেট রান্না খাবার ও ১৭৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। ১ লক্ষ ৩০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ১০০টি হাইজিন বক্স, পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার স্যালাইন ও ১৫৬ টি জেরিকেন পানি সহ পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার স্যালাইন বিতরণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ও মজুদ রাখা হয়েছে ২ শত প্যাকেট শুকনা খাবার ও সদ্য বরাদ্দ প্রাপ্ত ৫০.০০ মেট্রিক টন চাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরো বাড়তে পারে বলে জানা যায়। উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার ৭০ শতাংশ, তার মধ্যে ১,৭, ২, ৩ ও ৯ নং ওয়ার্ড এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে বাহারছড়া, কাথরিয়া, শেখেরখীল ও ছনুয়া এলাকায় । উপজেলার ১১ হাজার ১১০ টি বসতবাড়ি বন্যায় প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা যায়। তবে এই তালিকা আরো দৈর্ঘ্য হতে পারে বলে জানা যায়। উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তৌসিব উদ্দিন বলেন, উপজেলার ১৪ টি ইউনিয়নের প্রায় ৪ হাজার ২ শত পুকুর, ১৮ শত ৮০.৫৭ হেক্টর আয়াতন ও ১২৮৫.৭০ হেক্টর ৩১০ টি চিংড়িঘেরের মাছ ভেসে গেছে। তাতে ৫ হাজার জন খামারির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

ঢলের পানিতে উপজেলার গবাদি পশুর ১ হাজার ২৭০ টি খামার, পোল্ট্রি খামার ৭৪০ টি। এতে প্রাণী সম্পদের ৯ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা প্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জুয়েল মজুমদার।

বন্যার পানিতে উপজেলায় গ্রীষ্মকালীন সবজি ১ হাজার ১০০ হেক্টর, আউশের ২ হাজার ২৩৫ হেক্টর, আমন বীজতলা ৫৫ হেক্টর, পেঁপে ২০ হেক্টর, আদা ২০ হেক্টর ও হলুদ ৬.৫ হেক্টর এবং ১০ হেক্টর পানের বরজ সহ মোট ৩ হাজার ৪৪৬.৫ হেক্টর জমির ফসল ডুবে অন্তত ২৬ হাজার ৮০০ জন কৃষকের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। তাদের বীজ, সার ও প্রণোদনা সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দিতে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এতে ফসলে ক্ষতিগ্রস্তের আর্থিক মূল্য প্রায় ৫৫ কোটি টাকা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল বলেন, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঢলের পানিতে ১৪৯.৮৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অন্তত ২৩ টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তার মধ্যে বড় ধরনের ভাঙন ১১টি, ছোট ধরনের ভাঙন ১২টি, মেরামত সম্পন্ন ৯টি ও কাজ চলমান ৯টি ও (সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে) কাজ শুরু হয়নি ৫টি। এর মধ্যে গন্ডামারা ইউনিয়নে ৫০০ মিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৭০ টি স্লুইসগেটের মধ্যে ১১টি সম্পূর্ণ অচল, অবশিষ্ট ৪৬ টি স্লুইচগেইট কোন রকম সচল থাকলেও তারমধ্যে ১৩ টির কার্যকারিতা অনেকটাই কমে গেছে। এর মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ উপকূলীয় বাঁধ ৩৬.৪৯ কি:মি:, অভ্যন্তরীণ বাঁধ ১০৩.৩৬ কি: মি: ও সাংগু নদী তীর: ২৫.১৫ কি: মি: বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে পুকুরিয়া তেচ্ছিপাড়া সাংগু নদীর বাম তীরে ২০০ মিটার ও তেচ্ছিপাড়াতে ১২০ মিটার নদী তীর ভাঙ্গন হয়েছে। এ ছাড়া ও ৮ টি স্পটে সাতটি খালের পাড়ের ব্রিজ ও একটি বাধের ব্রিজ ভাঙনের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরোও বলেন, বাঁশখালীর স্লুইস গেইটগুলোর বেশিরভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

তাই এগুলো পর্যায়ক্রমে প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি সংখ্যাও বাড়াতে হবে। স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো বন্ধ করার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদে স্লুইস গেইট প্রতিস্থাপন, জলকদর খাল ও ছোট ছনুয়া খালের পুনঃখনন এবং কয়েকটি স্থানে বাঁধ পুনর্বিন্যাস (রিসেকশনিং) কাজ অন্তর্ভুক্ত করে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হচ্ছে। যার সম্ভাব্য ব্যয় ২০ কোটি টাকা।

ঢলের পানিতে উপজেলার দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৮ কিলোমিটার সড়ক ৫৮ টি রাস্তা এবং ৬০ টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে পাকা গ্রামীণ সড়ক সহ স্লুইসগেট ও অন্যান্য কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বমোট সারফেসসহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০৯ কিলোমিটার। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পুইছুড়ি, ছনুয়া, বাহারছড়া, পৌরসভা ও শেখেরখীল এলাকায়। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে এ পর্যন্ত প্রায় ৫ শতাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এসব মানুষ বাড়িতে ফিরতে পারছে না। বন্যার পানির তীব্র স্রোতে সড়কগুলোর নিচের মাটি পর্যন্ত ধুয়ে গিয়ে অনেক গ্রাম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে ১৫ কোটি ৭ লাখ টাকা টাকা প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এখন ও শেখেরখীল, বাহারছড়া ও গন্ডামারা এলাকায় পানি রয়ে গেছে। পানি নেমে গেলে হয়তো এটার পরিমাণ আরো বৃদ্ধি হবে বলে জানান উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইফরাদ বিন মুনির। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমীন ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, জুলাই মাসে চট্টগ্রামে স্বাভাবিক গড় বৃষ্টির পরিমাণ ৯২৪ মিলিমিটার, অথচ ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ৯ দিনে উপজেলায় বৃষ্টি হয়েছে ৪১২ মিলিমিটার। এই অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টি এবং পাহাড়ি থেকে নেমে আসা ঢলের পানির কারণে উপজেলায় এবার ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এ কারণে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়ে জনজীবন, মৎস, কৃষি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয় করে বন্যা পরিস্থিতি সামাল দেয়া হচ্ছে। যেখানে পানি আটকে থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। বন্যাকবলিত মানুষের জন্য খাবারও সরবরাহ করা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় আড়াই শতাধিক মানুষ এখনও আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। বৃষ্টি বন্ধ থাকায় গত দুই দিনে বন্যার পানি নেমে গেছে। বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি সিন্ডিকেট তৈরি করে মৎস্য প্রজেক্ট বা মাছের ঘেরের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি স্লুইস গেইটগুলো বন্ধ করেছেন। এ কারণে বন্যার পানি দীর্ঘ সময় জমে থাকছে এবং এতে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির অভাবে এসব স্লুইস গেইট গুলো কার্যত মাছের ঘেরে পরিণত করেছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা ২০টি স্থানে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছি। তিনি আরও বলেন, বিগত ১৭ বছর বাঁশখালী মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত জলকদর খালটি খনন না করে উল্টো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় এই বন্যা হয়েছে।

আমি নির্বাচিত হওয়ার পরপরই জলকদর খাল খনন কাজ শুরু করেছি এবং অকেজো স্লুইস গেইট সংস্কারের ব্যাপারে সংসদে বক্তব্য দিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। বন্যা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে আরও যা কারণ আছে তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত