ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণে ব্যস্ত কৃষক

আগাম জাতের মুড়িকাটা  পেঁয়াজ রোপণে ব্যস্ত কৃষক

পাবনায় ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হতাশ হলেও পেঁয়াজ চাষ ছাড়তে পারেননি জেলার অনেক কৃষক। মৌসুমে আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদে আবারও স্বপ্ন বুনছেন চাষীরা। তবে সার সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় সেই স্বপ্নে এবারও লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় বিঘাপ্রতি আবাদ খরচ বেড়েছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও মৌসুম শেষে পেঁয়াজের ন্যায্য দাম মিলবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

পাবনা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় এবার ৮ হাজার ৯৩০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ১৭১৬, আটঘরিয়ায় ৩৬০, ঈশ্বরদী ৮১১, চাটমোহর ৪৪০, ভাঙ্গুড়া ৪০, ফরিদপুর ৩৫৫, বেড়া ২ হাজার, সাঁথিয়া ১৬১৩ ও সুজানগর উপজেলায় ১৫৮৫ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এসব উপজেলা থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩২ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে কি-না, এ নিয়ে দ্বিধায় কৃষি বিভাগ। তবে এরই মধ্যে জেলার সদর ও সুজানগরসহ বিভিন্ন উপজেলায় এ পেঁয়াজ রোপণ শুরু হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, সদর উপজেলার চরতারাপুর ও ভাঁড়ারা ইউনিয়নের পদ্মার চরের উঁচু জমিগুলো থেকে প্রায় মাসখানেক আগে বর্ষার পানি নেমে গেছে। ফলে উঁচু এসব জমিতে অনেকেই এরই মধ্যে পেঁয়াজ রোপণ করেছেন। কারো কারো জমিতে অঙ্কুরোদগমও হচ্ছে। তবে অধিকাংশই জমি প্রস্তুত ও রোপণের মধ্যে রয়েছে। একইভাবে সুজানগরসহ অন্যান্য উপজেলাতেও বিল বা বর্ষার পানি নেমে যাওয়ায় জমি প্রস্তুত করছেন তারা। কৃষকরা জানান, এবছর পেঁয়াজ আবাদে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের। একদিকে চাহিদার তুলনায় সরকারি মূল্যে সার মিলছে না, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যয় বেড়েছে সেচ ও জমি চাষে। এরসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কীটনাশক ও লেবার বিল। এদিকে গতবছরের তুলনায় বীজের দাম প্রতি মণে ৫০০-৮০০ টাকা কম হলেও আকারে বড় হওয়ায় রোপণ করতে গিয়ে পরিমাণে বীজ লাগছে বেশি। পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুরের কোলচুরি এলাকার কৃষক ইয়াসিন আলী বলেন, এ বছর ১০ বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ লাগানো শেষ করেছি সপ্তাহ দুই তিনেক আগে। এখন চারা গজানোর সময়। গতবছর কিছু সার সরকারি রেটে পেলেও এবার ডিলারের থেকে আমরা সার পাই নাই। বিভিন্ন জায়গা থেকে সার ম্যানেজ করতে হয়েছে। প্রতি বস্তা ডিএপি সার কিনেছিলাম ২২০০ টাকায়। ৬০০ টাকার লেবার হয়েছে ৭০০ টাকা। এখন দেড় হাজার থেকে দুই হাজারের মধ্যে মিললেও আমাদের আবাদের সময় বীজের দাম ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকা লেগেছে। আবার আকারে বড় হওয়ায় এবার বীজ লাগছেও বেশি, বিঘাতে আমার কমপক্ষে ১৫ মণ লেগেছে। এভাবে বিঘায় ৫-১০ হাজার টাকা খরচ বেড়েছে। লিজের টাকাসহ বিঘায় এবার ৭০-৮০ হাজার খরচ যাবে। কিন্তু পেঁয়াজ বেচার সময় দাম নাই। একই এলাকার কৃষক বাকু খাঁ জানান, গত বছর লাভ না হলেও অন্তত লোকসান থেকে বাঁচা গেছে। কিন্তু এবার কী হবে কে জানে। এই কৃষক বলেন, সবকিছুতে এবার খরচ বেশি। তেলের দাম বাড়ায় এবার সিংগেল চাষে পাওয়ার ট্রিলারগুলোকে দিতে হচ্ছে ৯০০ টাকা, ১২০০ টাকার সেচে দিতে হবে ১৫০০-১৮০০ টাকা। এবার পেঁয়াজের দর মণ প্রতি ন্যূনতম আড়াই হাজার টাকা হওয়া লাগবে। না হলে আমাদের আবার বিপদ হবে। সুজানগর উপজেলার কামারদুলিয়া গ্রামের কৃষক আসলাম উদ্দিন বলেন, গাজনার বিলের পানি নেমে গেছে আগেই। তবে আমি এখনও রোপণ করিনি, জমি প্রস্তুত রয়েছে। দু'একবেলার মধ্যেই রোপণ করব। গাজনার বিলের এ কৃষক বলেন, পাবনা অঞ্চলে লাল তীর বা এ জাতীয় হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজের আবাদ বেশি হয়। এ বীজের দাম বর্তমানে আড়াই হাজার টাকা। বিঘায় ১৮-২০ বীজও মণ লেগে যাচ্ছে। গত বছর আকার ছোট হওয়ায় এতো লাগেনি। এতে দামে কম হলেও খরচ কমছে না। আবার সার কীটনাশকে ভোগান্তির শেষ নেই। বর্তমানে কড়াকড়ির জন্য সরকারি দামে ডিলারদের ওখান থেকে কিছু সার মিলছে। কিন্তু ৫-১০ বস্তা লাগলে সারাদিন লাইনে থেকে সর্বোচ্চ মেলে এক বস্তা। এভাবে আবাদ করাতো কঠিন। তিনি বলেন, এসব কারণে বাধ্য হয়ে বাইরের খুচরা দোকান থেকে বেশি দামে সার নিতে হচ্ছে। শুরুতেই সবাই বলে সার নাই। বেশি টাকা দিলে ঠিকই দেয়। এগুলোর অভিযোগ দিলে সার পাওয়া যায় না। আবার সব কীটনাশকের দাম বেড়েছে। সবমিলিয়ে ৭০-৯০ হাজার টাকা খরচ হবে এবার। গত বছর এই খরচ ছিল ৬০-৮০ হাজার টাকা। পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) লুৎফর রহমান জানান, আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ হয় চারা বা হালি পেঁয়াজ আসার আগে বাজারের চাহিদা মেটাতে। এবার এখনো কৃষকের ঘরে পেঁয়াজ রয়েছে। আবার গত কয়েক দফায় ভালো বাজার না পাওয়ায় অনেক কৃষক এবার মুড়িকাটার আবাদ কমিয়েছে। তবে আমরা ইতিবাচকভাবে তাদের উদ্বুদ্ধ করছি। খরচ বৃদ্ধি ও আবাদের সংকটের ব্যাপারে এ কৃষি কর্মকর্তা বলেন, এক বিঘায় ৩০-৪০ কেজি সার ব্যবহারের কথা থাকলেও কোনো কৃষক দেড় থেকে দুই বস্তাও ব্যবহার করেন। ফলে খরচ ও সারের প্রয়োজন অতিরিক্ত দেখা দেয়। বাইরে থেকে বেশি দামে সেই প্রয়োজন মেটান অনেকে। আবার এই অতিরিক্ত সার কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ভালো মানের পেঁয়াজ হচ্ছে না। ফলে সেগুলো ঘরে রাখা যাচ্ছে না, একসঙ্গে বাজারে তোলার কারণে দামও কম পাচ্ছে। এক্ষেত্রে সার কীটনাশক ব্যবহারে সুষম আবাদ পদ্ধতি অবলম্বন করলে খরচের পাশাপাশি ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত