ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পা-ই তার হাতিয়ার

বিচারক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন ক্ষেতলালের বিউটি

বিচারক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন ক্ষেতলালের বিউটি

একদিন বিচারকের আসনে বসে মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন এমন স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে চলেছেন বিউটি খাতুন। সেই স্বপ্নের পথে ইতিমধ্যে অর্জন করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। এখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের (বিজেএস) পরীক্ষার জন্য। তবে তার এই পথচলা আর দশজনের মতো সহজ ছিল না। জন্ম থেকেই দুটি হাত না থাকায় পা দিয়েই লিখে গড়তে হয়েছে নিজের শিক্ষাজীবন। প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প। জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামের মেয়ে বিউটি খাতুন। দরিদ্র কৃষক বায়েজিদ হোসেন ও রহিমা খাতুন দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে তিনি ছোট।

বড় ভাই বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বিউটির জন্মের পর পরিবার প্রথম যে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তা হলো তাঁর দুটি হাত নেই। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন মা-বাবা। বিশেষ করে পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজ কীভাবে সামলাবেন, তা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ ছিল। কিন্তু বিউটি নিজেই ধীরে ধীরে সেই অনিশ্চয়তার উত্তর খুঁজে নেন। ছোটবেলা থেকেই পা দিয়ে লেখার অভ্যাস গড়ে তোলেন। একসময় পা-ই হয়ে ওঠে তাঁর লেখাপড়ার প্রধান অবলম্বন। প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই শুরু হয় তাঁর শিক্ষাজীবনের এগিয়ে চলা। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন।

পাশাপাশি বৃত্তিও লাভ করেন। এরপর ২০১৭ সালে আখলাশ শিবপুর শ্যামপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। ২০১৯ সালে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ২০২৬ সালের অক্টোবরে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর এই অর্জন শুধু একটি শিক্ষাগত সনদ নয়, বরং দীর্ঘদিনের চেষ্টা ও আত্মবিশ্বাসের ফল।

পড়াশোনার বাইরেও নিজের দৈনন্দিন কাজগুলো পা দিয়ে সামলান বিউটি। শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও শিক্ষানুরাগীদের সহযোগিতা পেয়েছেন। তবে অন্যের দয়া বা করুণার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের মেধা ও যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়াই তাঁর লক্ষ্য।

বিউটি খাতুনের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, শৈশব থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি মানুষের কটু কথাও শুনতে হয়েছে। কিন্তু সেসব কথায় ভেঙে না পড়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। নিজের যোগ্যতায় আত্মনির্ভরশীল হতে চান তিনি। বর্তমানে বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

বিউটির বাবা বায়েজিদ হোসেন বলেন, মেয়ে যখন দুটি হাত ছাড়াই জন্ম নিল, তখন তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। সে লেখাপড়া করতে পারবে, এমনটা ভাবতেও পারিনি। শুধু চিন্তা হতো, মেয়েটি নিজের প্রয়োজনীয় কাজগুলো একা সামলাতে পারবে কি না। আজ তার অর্জনে আমরা গর্বিত। আখলাশ শিবপুর শ্যামপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক একরামুল ইসলাম উজ্জ্বল বলেন, বিউটির এই অর্জন শুধু তাঁর পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য অনুপ্রেরণার। অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় থাকলে শারীরিক সীমাবদ্ধতাও যে সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না, বিউটি তার দৃষ্টান্ত। এখন বিউটির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। আইন বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে চান তিনি। নিজের জীবনের প্রতিকূলতা জয় করে এবার অন্য মানুষের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার প্রত্যয় তাঁর।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত