ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রাজনীতির কালিতে বিকৃত রক্তে লেখা ইতিহাস

মো. মাজহারুল ইসলাম
রাজনীতির কালিতে বিকৃত রক্তে লেখা ইতিহাস

গ্রিক ঐতিহাসিক থুসিডিডিস তার রচনায় ইতিহাসকে ভবিষ্যতের জন্য একটি চিরন্তন সম্পদ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু সেই সম্পদ যখন রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ারে পরিণত হয় তখন তা জাতির জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনে। ইতিহাস শুধু অতীতের দলিল নয় এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়। তার সংস্কৃতির ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ গড়ার দিকনির্দেশনা। তাই ইতিহাসের সত্যতা ও নিরপেক্ষতা রক্ষা করা শুধু একাডেমিক দায়িত্ব নয় এটি একটি জাতীয় কর্তব্য।

ইতিহাস বিকৃতির সবচেয়ে সাধারণ পদ্ধতি হলো সত্যকে আংশিকভাবে উপস্থাপন করা। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা ব্যক্তিত্বের ইতিবাচক দিক বাড়িয়ে তোলা হয়। আর নেতিবাচক দিকগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে চেপে রাখা হয়। কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনকে গৌরবান্বিত করতে তার সীমাবদ্ধতা আড়াল করা হয় । কোনো নেতাকে মহিমান্বিত করতে তার ব্যর্থতা মুছে ফেলা হয়। এর ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একটি পক্ষপাতদুষ্ট চিত্র বহন করে । যা ধীরে ধীরে জাতীয় চেতনাকে বিভ্রান্ত করে। অতিরঞ্জন ও অপব্যাখ্যাও এই বিকৃতির আরেকটি মারাত্মক রূপ। জাতীয়তাবাদ বা ধর্মীয় পরিচয়ের নামে ইতিহাসের নির্দিষ্ট অংশকে অতিমাত্রায় জোর দিয়ে উপস্থাপন করা হয় । যা শুধু ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করে না সমাজে বিভেদের বীজও বপন করে।

পাঠ্যপুস্তক ও গণমাধ্যম এই বিকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। একটি শিশু যখন বিদ্যালয়ে বিকৃত ইতিহাস পড়ে তখন সেই মিথ্যা তার মনে সত্য হিসেবে গেঁথে যায়। পরিণত বয়সে সেই বিভ্রান্তি থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে গণমাধ্যমের ক্রমাগত পক্ষপাতমূলক উপস্থাপনা সমাজে এমন এক মানসিকতা তৈরি করে যেখানে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য ঘুচে যায়। আর এই বিভ্রান্তিকে পুঁজি করেই কিছু রাজনৈতিক শক্তি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ায় । সমাজে স্থায়ী বিভাজন তৈরি করে এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখে।

বিকৃত ইতিহাসের ক্ষতি শুধু সাংস্কৃতিক নয় এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্যও অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশ যখন ইতিহাস বিকৃত করে তখন তার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয় এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতিহাস যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার হয় তখন একটি জাতি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ হারায় এবং বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে। আমাদের দেশের ইতিহাসই এই সত্যের সবচেয়ে বেদনাদায়ক সাক্ষী। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব উপমহাদেশে মুসলিম জাতিসত্তার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার ভিত্তি রচনা করে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পূর্ববঙ্গকে পাকিস্তানের অংশ করে। কিন্তু শুরু থেকেই শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক নীতি বাঙালির মনে গভীর অসন্তোষ তৈরি করে। সেই ক্ষোভের প্রথম সংগঠিত বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে মাতৃভাষার দাবিতে তরুণ প্রাণের আত্মদান বাঙালির জাতীয় চেতনার ভিত রচনা করে। যা আজ টঘঊঝঈঙ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। এরপর ১৯৬৬ সালের ছয় দফা স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে বাঙালির মুক্তির সনদ হয়ে ওঠে এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সেই আন্দোলনকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে। সবশেষে ১৯৭১ সালে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অগণিত ৩০ লক্ষ্য শহিদের আত্মদানের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। এই প্রতিটি অধ্যায় পরস্পর সংযুক্ত একটি জাতির ক্রমবিকাশমান মুক্তিসংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দশকের পর দশক ধরে নিজেদের সুবিধামতো এই ইতিহাস উপস্থাপন করেছে । যা জাতীয় ঐক্যকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

বিশ্বপরিসরেও ইতিহাস বিকৃতির ভয়াবহ নজির আছে। নাৎসি জার্মানিতে ইতিহাসকে? জাতিবিদ্বেষের হাতিয়ার বানিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের মতো মানবতাবিরোধী বিপর্যয় ডেকে আনা হয়েছিল। যা আজও মানবজাতির জন্য একটি কঠিন অধ্যায় হয়ে আছে। উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো শাসিত জনগোষ্ঠীর ইতিহাস মুছে দিয়ে তাদের পরিচয়সংকটে ফেলেছিল। যার ক্ষত আজও অনেক জাতি বহন করছে।

এই ধ্বংসাত্মক প্রবণতা থেকে মুক্তির পথ একটিই সত্যের প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে সমালোচনামূলক চিন্তার সক্ষমতা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে জাতি তার ইতিহাস সংরক্ষণ করতে পারে না সে জাতি তার ভবিষ্যৎও নির্মাণ করতে পারে না। ইতিহাসের সত্য রক্ষা করা তাই কোনো দলের নয় এটি গোটা জাতির দায়িত্ব।

মো. মাজহারুল ইসলাম

শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত