প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৭ মার্চ, ২০২৬
ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি। এই উৎসব ঘিরে মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও পারিবারিক বন্ধনের এক অনন্য প্রকাশ ঘটে। সারা বছরের কর্মব্যস্ততার মধ্যে ঈদের সময়টুকুই অনেকের কাছে হয়ে ওঠে পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত। বিশেষ করে যারা কাজ, পড়াশোনা বা জীবিকার কারণে রাজধানী কিংবা বড় শহরে থাকেন, তারা ঈদের ছুটি পেলেই গ্রামের বাড়ির দিকে ছুটে যান। অনেকের কাছে এই ফিরে যাওয়াটা শুধু ভ্রমণ নয়; বরং শিকড়ে ফেরার এক গভীর অনুভূতি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই আনন্দের যাত্রা প্রায়ই পরিণত হয় দীর্ঘ ভোগান্তিতে। ঈদ এলেই দেশের প্রধান সড়কগুলোতে যে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়, তা যেন এখন এক পরিচিত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
ঈদের আগে কয়েকদিন এবং ঈদের পরপরই রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দিকে মানুষের এক বিশাল স্রোত তৈরি হয়। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন কিংবা লঞ্চঘাট সব জায়গাতেই দেখা যায় মানুষের উপচে পড়া ভিড়। তবে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে সড়কপথে। কারণ অধিকাংশ মানুষই যাতায়াতের জন্য বাস বা ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভর করেন। ফলে মহাসড়কগুলোতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি যানবাহন চলাচল শুরু করে। বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল সব মিলিয়ে সড়কে তৈরি হয় দীর্ঘ যানবাহনের সারি।
এই সময় প্রায়ই দেখা যায়, কয়েক কিলোমিটারজুড়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সেগুলো খুব ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় আটকে থাকতে হয় যাত্রীদের। অনেক ক্ষেত্রে পাঁচণ্ডছয় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লেগে যায় দশ বা বারো ঘণ্টা। এই দীর্ঘ যাত্রা শুধু শারীরিক কষ্টই বাড়ায় না, মানসিকভাবেও মানুষকে ক্লান্ত করে তোলে।
ঈদের সময় সড়কে এই অস্বাভাবিক যানজটের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, দেশের সড়ক অবকাঠামো এখনও ক্রমবর্ধমান যাত্রীর চাপ সামাল দেওয়ার মতো যথেষ্ট উন্নত নয়। যদিও গত কয়েক বছরে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় অনেক উন্নয়ন হয়েছে, তবুও ঈদের মতো বিশেষ সময়ে যখন একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ যাত্রা শুরু করেন, তখন সেই অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত, অনেক সময় মহাসড়কে চলমান নির্মাণকাজ বা সংস্কার কার্যক্রম যান চলাচলকে ধীর করে দেয়। রাস্তার কোনো একটি অংশে কাজ চললে সেখানে গাড়ির গতি কমে যায় এবং ধীরে ধীরে তা বড় যানজটে রূপ নেয়। আবার কোথাও কোথাও সেতু বা টোল প্লাজার সামনে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়, যা পুরো সড়কের যান চলাচলকে প্রভাবিত করে।
তৃতীয়ত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কিছু সীমাবদ্ধতাও এই সমস্যাকে জটিল করে তোলে। অনেক সময় দেখা যায়, মহাসড়কে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন একসঙ্গে চলাচল করছে। দ্রুতগতির বাসের পাশে ধীরগতির ট্রাক বা অন্যান্য যান চলাচল করলে স্বাভাবিকভাবেই যানবাহনের গতি কমে যায়। আবার কোথাও কোথাও সড়কের পাশে অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা কিংবা উল্টো পথে গাড়ি চালানোর প্রবণতাও জ্যামের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এর পাশাপাশি কিছু অসচেতন আচরণও যানজটকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ঈদের সময় অনেকেই দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়নায় ট্রাফিক নিয়ম অমান্য করেন। কেউ কেউ ওভারটেক করার জন্য উল্টো পথে গাড়ি চালান, কেউ আবার রাস্তার মধ্যখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করান। এসব অনিয়মের ফলে সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং যান চলাচল আরও ধীর হয়ে পড়ে।
ঈদের সময় ছোটখাটো দুর্ঘটনাও বড় ধরনের যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কোনো একটি গাড়ি বিকল হয়ে রাস্তার মধ্যখানে দাঁড়িয়ে গেলে বা সামান্য দুর্ঘটনা ঘটলেও পুরো সড়ক অনেক সময় অচল হয়ে যায়। তখন কয়েক কিলোমিটারজুড়ে যানজট সৃষ্টি হয় এবং যাত্রীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হন।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ যাত্রীরা। দীর্ঘ সময় বাসে বসে থাকা, তীব্র গরম বা ধুলোবালির মধ্যে যাত্রা করা, খাবার ও পানির সংকট সব মিলিয়ে ঈদের যাত্রা অনেক সময় হয়ে ওঠে অত্যন্ত কষ্টকর। শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ মানুষের জন্য এই ভ্রমণ আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক পরিবারই ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকেন, যা তাদের জন্য ভীষণ অস্বস্তিকর। এছাড়া ঈদের সময় পরিবহন খাতে কিছু অনিয়মও দেখা যায়। অনেক পরিবহন মালিক অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন। কখনও কখনও ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী বহন করা হয়, যা যাত্রীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কারণে যাত্রাপথের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। এই সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ। ঈদের সময় মহাসড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা এবং পণ্যবাহী ভারী যানবাহনের চলাচল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমিত করা হলে সড়কে চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
পাশাপাশি গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও অত্যন্ত জরুরি। যদি রেল ও নৌপথের যাত্রীসেবা আরও বাড়ানো যায়, তাহলে সড়কের ওপর চাপ অনেকটাই কমে যাবে। কারণ বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ সড়কপথের ওপর নির্ভর করায় মহাসড়কগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; নাগরিকদের সচেতন আচরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলা, অপ্রয়োজনে গাড়ি নিয়ে বের না হওয়া এবং ধৈর্য ধরে যাত্রা করা এসব ছোট ছোট বিষয়ও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আমরা যদি সবাই একটু দায়িত্বশীল হই, তাহলে ঈদের সময় সড়কে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তা অনেকটাই কমানো সম্ভব। ঈদ মূলত আনন্দ, ভালোবাসা ও মিলনের উৎসব। মানুষ এই সময়টাতে প্রিয়জনদের সঙ্গে হাসি-খুশি ভাগ করে নিতে চায়। কিন্তু যাত্রাপথে দীর্ঘ যানজট ও ভোগান্তি সেই আনন্দকে অনেক সময় ম্লান করে দেয়। তাই প্রয়োজন এমন একটি সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত যোগাযোগব্যবস্থা, যেখানে মানুষ নিরাপদ ও স্বস্তিতে তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। যেদিন ঈদের সময় মানুষ নির্বিঘ্নে, স্বাচ্ছন্দ্যে এবং সময়মতো বাড়ি ফিরতে পারবে, সেদিনই সত্যিকারের অর্থে এই উৎসবের আনন্দ পূর্ণতা পাবে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকার, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এবং সাধারণ নাগরিক সবাইকে একসঙ্গে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তখন হয়তো একদিন ঈদের যাত্রা আর ভোগান্তির প্রতীক হবে না বরং তা হয়ে উঠবে আনন্দ ও স্বস্তির এক সুন্দর পথচলা।
আরশী আক্তার সানী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়