ঢাকা রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২২ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ভ্রাম্যমাণ আদালত ও পুলিশি তৎপরতা : জ্বালানি সংকট সমাধানের টেকসই পথ নয়

ভ্রাম্যমাণ আদালত ও পুলিশি তৎপরতা : জ্বালানি সংকট সমাধানের টেকসই পথ নয়

বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি নিরাপত্তা একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতায় দেশে জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে লোডশেডিং, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট- ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা কিংবা পুলিশি তৎপরতা জ্বালানি সংকটের মতো একটি কাঠামোগত ও অর্থনৈতিক সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারে না। জ্বালানি সংকট কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়; এটি বছরের পর বছর জমে থাকা ভুল নীতি ও অদূরদর্শিতার ফল। আমরা যখন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবির ছিলাম, তখন অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভর এলএনজি (LNG) ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে ঝুঁকেছি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমাদের পুরো জ্বালানি খাত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।

এই গভীর সমস্যার সমাধানে যখন মাঠ পর্যায়ে পুলিশ নামিয়ে তদারকি করা হয় বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দোকানপাট বন্ধে জরিমানা করা হয়, তখন তা কেবল রোগের উপসর্গ নিরাময়ের চেষ্টা মাত্র। মূল রোগটি এতে সারে না। পুলিশ দিয়ে হয়তো রাত ৮টার পর দোকান বন্ধ নিশ্চিত করা যায়, কিন্তু তাতে করে জ্বালানির সামগ্রিক ঘাটতি পূরণ হয় না বা উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ে না। একটি জটিল অর্থনৈতিক ও কারিগরি সমস্যাকে যখন কেবল ‘আইন-শৃঙ্খলার’ চশমায় দেখা হয়, তখন কিছু মৌলিক অসামঞ্জস্য তৈরি হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি না করে কেবল জরিমানার ভয় দেখিয়ে সাশ্রয় নিশ্চিত করা কঠিন। পুলিশি অভিযানের সময় বাতি নিভলেও পুলিশ চলে যাওয়ার পর পুনরায় অপচয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। জ্বালানি সংকটের মূল কারণ হলো উৎপাদন সক্ষমতার অভাব এবং আমদানির ডলার সংকট। পুলিশ দিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানো সম্ভব নয়, কিংবা তারা খনি থেকে গ্যাস তুলে আনতে পারবে না। প্রায়ই দেখা যায় ভ্রাম্যমাণ আদালত রাস্তার পাশের ছোট দোকান বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ধরপাকড় করছে। অথচ শিল্পখাতের বড় অপচয় বা সিস্টেম লসের পেছনে থাকা রাঘববোয়ালরা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। অতিরিক্ত পুলিশি তদারকি অনেক ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে নতুন করে হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে দেয়।

জ্বালানি খাতের সংকট সমাধানে প্রয়োজন কারিগরি দক্ষতা, সঠিক পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ। বর্তমানে আমরা যে সংকটে আছি, তার পেছনে সিস্টেম লস (System Loss) এবং অবৈধ সংযোগ একটি বড় কারণ। এটি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা থাকলেও, মূল দায়িত্বটি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের কারিগরি কর্মীদের। দীর্ঘদিনের পঞ্জীভূত এই জঞ্জাল কেবল স্বল্পমেয়াদী অভিযানের মাধ্যমে পরিষ্কার করা অসম্ভব। তাছাড়া, পুলিশি অভিযানের মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি মিললেও এটি জনমনে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। সাধারণ মানুষ যখন দেখে যে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নামে তাদের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে কিন্তু বড় বড় প্রজেক্টে অপচয় থামছে না, তখন সরকারি উদ্যোগের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পুলিশের ডান্ডার চেয়ে বিশেষজ্ঞের বুদ্ধিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের প্রয়োজন বঙ্গোপসাগরসহ দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমদানিনির্ভরতা না কমালে জ্বালানি নিরাপত্তা কখনোই নিশ্চিত হবে না। সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের মতো টেকসই উৎসে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে আমদানির চাপ কমাবে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের আধুনিকায়ন করতে হবে যেন অপচয় বা সিস্টেম লস সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়। শাস্তির বদলে যারা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে তাদের জন্য বিশেষ রিবেট বা পুরষ্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, পুলিশ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত একটি জরুরি পরিস্থিতিতে সাময়িক শৃঙ্খলা ফেরাতে পারে, কিন্তু তা জ্বালানি সংকটের সমাধান নয়। সংকটের শিকড় অনেক গভীরে- যা আমাদের জ্বালানি নীতি, আমদানিনির্ভরতা এবং সুশাসনের অভাবের সাথে যুক্ত। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে যে, লাঠি দিয়ে গ্যাস বা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। আইন প্রয়োগের কঠোরতার চেয়ে নীতি প্রয়োগের দূরদর্শিতাই আমাদের এই সংকট থেকে মুক্তি দিতে পারে। আমরা যদি এখনো কেবল পুলিশি তৎপরতার ওপর নির্ভর করে বসে থাকি, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে। সময় এসেছে জ্বালানি খাতকে আমলাতান্ত্রিক ও পুলিশি বেষ্টনী থেকে বের করে এনে বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি নেতৃত্বের হাতে তুলে দেওয়ার।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত