প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলাদেশের জনজীবনে গণপরিবহন এক অনিবার্য বাস্তবতা। প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে লাখো মানুষ বাস, ট্রেন, লঞ্চসহ বিভিন্ন গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই নির্ভরতার মাঝেই লুকিয়ে আছে এক গভীর উদ্বেগ- নিরাপত্তাহীনতা। দিন দিন এই সমস্যা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গণপরিবহনে ওঠার আগে যাত্রীদের মনে এক ধরনের অজানা ভয় কাজ করে। সড়কে বের হলেই চোখে পড়ে বেপরোয়া গতির বাস, প্রতিযোগিতামূলকভাবে যাত্রী তোলার প্রবণতা এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের অসংখ্য উদাহরণ। চালকদের মধ্যে দায়িত্ববোধের ঘাটতি এবং অদক্ষতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, চালকরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়াই দীর্ঘ সময় গাড়ি চালান, যার ফলে তাদের মনোযোগ কমে যায় এবং সামান্য ভুলই বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে, যা যাত্রীদের জীবনের জন্য সরাসরি হুমকি। গণপরিবহনে নিরাপত্তাহীনতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী ও শিশুদের প্রতি হয়রানি। প্রতিদিনই বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন ঘটনা উঠে আসে, যেখানে নারীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। অনেক সময় ভিড়ের সুযোগ নিয়ে অসাধু লোকজন অসদাচরণ করে থাকে। এর ফলে নারীরা গণপরিবহন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হন এবং অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে বিকল্প, ব্যয়বহুল পরিবহন ব্যবহার করতে হয়। এটি তাদের আর্থিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক চলাচলেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। চুরি, ছিনতাই এবং পকেটমারের ঘটনা গণপরিবহনে নতুন কিছু নয়।
বিশেষ করে ভিড়ের মধ্যে যাত্রীদের অজান্তেই তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র হারিয়ে যায়। দূরপাল্লার যাত্রায়ও নিরাপত্তাহীনতার অভাব স্পষ্ট- রাতে যাত্রার সময় অনেক যাত্রীই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন। কিছু ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র যাত্রীদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন কৌশলে প্রতারণা বা ডাকাতির ঘটনা ঘটায়, যা সাধারণ মানুষের আস্থাকে আরও দুর্বল করে দেয়। এছাড়া গণপরিবহনের ভেতরের পরিবেশও অনেক সময় নিরাপদ নয়। অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, দাঁড়িয়ে যাত্রা করা, দরজায় ঝুলে থাকা- এসব দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে।
এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি যাত্রীরা শারীরিকভাবে অসুবিধার সম্মুখীন হন। অনেক সময় জরুরি অবস্থায় দ্রুত নেমে যাওয়ার সুযোগও থাকে না, যা বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
নিরাপত্তাহীনতার এই চিত্র শুধু যাত্রীদের জন্যই নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের পরিবহন ব্যবস্থার জন্য একটি নেতিবাচক বার্তা বহন করে। যখন মানুষ গণপরিবহনের ওপর আস্থা হারায়, তখন তারা ব্যক্তিগত যানবাহনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে সড়কে যানজট বাড়ে, পরিবেশ দূষণ বৃদ্ধি পায় এবং নগর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়।
এই সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সড়ক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স প্রদান এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা কঠোরভাবে পরিচালনা করা দরকার। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে গণপরিবহনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা যেতে পারে, যাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সহজে শনাক্ত করা যায়। যাত্রীদের সচেতনতা বাড়ানোও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্ক থাকা, সন্দেহজনক কিছু দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে কর্তৃপক্ষকে জানানো- এসব অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে ভুক্তভোগীরা নির্ভয়ে তাদের সমস্যা জানাতে পারেন। নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নির্দিষ্ট সিট সংরক্ষণ, প্রয়োজনে নারীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা বাড়ানো এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। সমাজের মানসিকতার পরিবর্তনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে- নারীর প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা গড়ে তোলা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সবশেষে বলা যায়, গণপরিবহনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও বটে। সরকার, পরিবহন মালিক, চালক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ যাত্রী- সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে মানুষের আস্থা ফিরে আসবে, যাতায়াত হবে সহজ ও স্বস্তিদায়ক এবং দেশ এগিয়ে যাবে, একটি সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে।
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়