ঢাকা সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

গুজব তকমা : সত্য চাপা দেওয়ার ন্যারেটিভ

জাহিদ হাসান
গুজব তকমা : সত্য চাপা দেওয়ার ন্যারেটিভ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘গুজব’ শব্দটি বর্তমানে একটি দ্বিমুখী তলোয়ারে পরিণত হয়েছে। একদিকে যেমন প্রযুক্তির অপব্যবহারে ভুল তথ্য ছড়িয়ে অস্থিরতা তৈরি করে উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে প্রকৃত অপরাধ, জনদুর্ভোগ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাকে আড়াল করতে ‘গুজব’ শব্দটিকে একটি ঢাল বা ‘ন্যারেটিভ’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই সংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, যখন কোনো সত্য ঘটনাকে গুজব বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেই সত্যের সঙ্গেই কবর দেওয়া হয়, ন্যায়বিচার এবং জননিরাপত্তাকে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুন, ধর্ষণ, প্রকাশ্য দিবালোকে মারামারি, রাজনৈতিক কাটাকাটি, লুণ্ঠন এবং চাঁদাবাজির মতো ঘটনাগুলো যখন মহামারি আকারধারণ করে, তখন সেগুলোকে জনমানসে গুরুত্বহীন করার প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে এই ‘গুজব’ তকমা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, দেশের কোনো প্রান্তরে যখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা কোনো খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, লুটপাটের ঘটনা ঘটে, তখন সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার প্রতিবাদ শুরু হওয়া মাত্রই একটি বিশেষ গোষ্ঠী সেটিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব’ হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই প্রোপাগান্ডা মেশিনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, এটি আসলে সরকারকে বা কোনো নির্দিষ্ট দলকে বিপাকে ফেলার একটি চাল। ফলে ভুক্তভোগী নারী বা তার পরিবার বিচার পাওয়ার বদলে উল্টো ‘গুজব সৃষ্টিকারী’ হিসেবে সামাজিক ও আইনি চাপের মুখে পড়ে। এভাবেই একটি জঘন্যতম অপরাধের অপমৃত্যু ঘটে তথ্যের গোলকধাঁধায়। ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়কে যখন রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে, কারণ তারা জানে যে তাদের অপরাধ শেষ পর্যন্ত একটি ‘রাজনৈতিক বিতর্ক’ বা ‘গুজব’ হিসেবে ফাইলবন্দি হয়ে থাকবে। কিছুদিন আগে গাজীপুরে মাদ্রাসাছাত্রীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অপহরণ করা হলে এটিকে গুজব বলে প্রচার করা হয়।

অনেক সময় দেখা যায়, দিনের আলোয় হাজার হাজার মানুষের সামনে কোনো হত্যাকাণ্ড বা নৃশংস হামলা ঘটছে, যার ভিডিও ফুটেজ মুহূর্তেই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষ্য করা যায়, সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই একদল বুদ্ধিজীবী বা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট প্রচার করতে শুরু করেন যে ভিডিওটি বা ছবিটি গুজব ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত, অথবা একজনের দায় আরেকজনকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই যে তথ্যের বিকৃতি এবং সত্যকে গুজব বলে প্রমাণের নিরন্তর চেষ্টা, এটি সরাসরি অপরাধীকে সুরক্ষা প্রদান করে। যখন একটি ভিডিও বা প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানকে গুজব বলে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর থেকেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ কমে যায়। ফলে তদন্ত প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতার কবলে পড়ে এবং একসময় জনস্মৃতি থেকে সেই নৃশংসতা ধুয়ে মুছে যায়। দেখা গেছে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা কোনো টার্গেটেড ব্যক্তি বা দলকে দমন করতে সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের নামে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে তাকে হয়রানি করা হয়। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী এই অপ-প্রচার ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানির শিকার হয়েছে। তার নামে ছড়ানো গুজব মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পরও তার উপর মব লেলিয়ে দিয়ে তাকে হেনস্তা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বিষফোঁড়া হলো চাঁদাবাজি এবং লুটপাট। বাজারব্যবস্থা থেকে শুরু করে বড় বড় মেগা প্রকল্প সর্বত্রই দুর্নীতির কালো ছায়া দৃশ্যমান। যখনই কোনো সাহসী গণমাধ্যম বা অনুসন্ধানী সাংবাদিক এই লুটপাটের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ জনসমক্ষে নিয়ে আসেন, তখনই রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক পর্যায় থেকে সেটিকে ‘দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র’ বা ‘গুজব’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সাধারণ মানুষের হাহাকার যখন চরমে পৌঁছায়, তখন সেই বাস্তবতাকে স্বীকার না করে সেটিকে ‘কৃত্রিম সংকট’ বা ‘গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এই ধরনের ন্যারেটিভ তৈরির ফলে মূল অপরাধী যারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বা যারা হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে, তারা আলোচনার আড়ালে থেকে যায়। এই ‘গুজব ন্যারেটিভ’ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে এবং নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে। পাড়া-মহল্লায় যখন রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘুন বা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারামারি হয়, তখন সেটিকে আড়াল করতে ভিন্ন কোনো ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক রঙ চড়ানোর চেষ্টা করা হয় অথবা পুরো বিষয়টিকে একটি সাজানো নাটক বা গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে সমাজ কাঠামোর ভেতরে যে ঘুন ধরেছে, তা আর মেরামত করার সুযোগ থাকে না। অপরাধীরা যখন দেখে যে তারা বড় কোনো অপরাধ করে সেটিকে ‘গুজব’ তকমা দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারছে, তখন তাদের অপরাধের মাত্রা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে।

সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত না করে সরাসরি গুজব বলে প্রচার করা হয়। মিডিয়াতে এই নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হলে তা আবার সেই মিডিয়া সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এখানে মিডিয়ার স্বাধীনতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নিঃসন্দেহে প্রশ্নফাঁস শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটা বিষফোঁড়া। অতীতে বাংলাদেশে এমন প্রশ্নফাঁসের ঘটনা বহু ঘটেছে যার কারণে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশের সবথেকে স্বচ্ছ পরীক্ষা ধরা হতো বিসিএসকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই বিসিএস পরীক্ষায়ও প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে আড়াল করা হয়েছে এবং এটিকে গুজব বলে প্রচার করা হয়েছে রাজনৈতিক দুর্নামের ভয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতার প্রশ্নে এই বিষয় নিয়ে আইনি তদন্ত করা উচিত ছিল।

‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব’ তকমা দিয়ে প্রকৃতপক্ষে প্রশ্ন ফাঁস হয়ে থাকলেও সেটিকে আড়াল করে রাজনৈতিক স্ট্যান্ড ও মন্ত্রণালয়ের সুনাম ধরে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করা হচ্ছে। মিডিয়ায় প্রচারিত প্রতিবেদনটা দলিল প্রমান নির্ভর হওয়ার পরও গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং এটিকে বিরোধীদলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত গুজব বলে বিরোধীদলের উপর দায় দিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল এইটা নিয়ে একটা নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং প্রকৃতপক্ষে প্রশ্নফাঁস হয়ে থাকলে সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। এবং ভবিষ্যতে এমন প্রশ্নফাঁস যাতে না হয় সেই বন্দোবস্ত করা। কিন্তু আমরা এটির সম্পূর্ণ বিপরীত দেখছি। এটি গুজব ন্যারেটিভের আড়ালে সত্য গোপন করার প্রবণতা ছাড়া কিছুই না।

বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সত্যের চেয়ে মিথ্যার গতিবেগ বেশি। এই সুযোগটিকেই কাজে লাগাচ্ছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। তারা জানে যে, কোনো একটি সত্য ঘটনাকে সরাসরি অস্বীকার করার চেয়ে সেটিকে ‘গুজব’ হিসেবে বিতর্কিত করে তোলা অনেক বেশি কার্যকর। যখন কোনো ঘটনার সত্যতা নিয়ে মানুষের মনে সামান্যতম সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তখন সেই ঘটনার গুরুত্ব অর্ধেক নাই হয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ‘অদৃশ্য মরণফাঁদ’ আজ বিচারহীনতার এক সংস্কৃতি তৈরি করেছে। যেখানে অপরাধ চাপা পড়ে যায় গুজবের আড়ালে, যেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে লুটপাট বৈধতা পায় ‘ষড়যন্ত্রের’ তকমায়, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আজ চরম হুমকির মুখে। সত্যকে বার বার গুজবের কবরে দাফন করার এই প্রবণতা যদি বন্ধ না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে সমাজ থেকে ন্যায়বিচারের ধারণাটি চিরতরে হারিয়ে যাবে। সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হলে সত্যকে তার নিজস্ব মহিমায় প্রকাশ করার সুযোগ দিতে হবে এবং অপরাধীকে রাজনৈতিক পরিচয় বা গুজবের ঢাল ব্যবহার করে বাঁচার পথ বন্ধ করতে হবে।

জাহিদ হাসান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত