ঢাকা সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

স্কুল ব্যাগ নাকি বস্তা

ড. মাহবুবুর রহমান
স্কুল ব্যাগ নাকি বস্তা

প্রতিদিন সকালবেলা আমরা একটি খুব পরিচিত দৃশ্য দেখি- ছোট ছোট শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে, কাঁধে ঝুলছে বিশাল এক ব্যাগ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, তারা যেন বই নয়, বরং কোনো ভারী বোঝা বহন করছে। অনেক সময় ব্যাগের ওজন এমন হয় যে, শিশুটি ঠিকভাবে হাঁটতেও কষ্ট পায়। তখন প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে- এটা কি সত্যিই স্কুল ব্যাগ, নাকি বোঝার বস্তা?

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি ক্রমেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও প্রকট। এই বয়সে যেখানে শিশুরা খেলাধুলা, কৌতূহল আর আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখার কথা, সেখানে তারা প্রতিদিন এক ধরনের চাপের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে- যার দৃশ্যমান রূপ হচ্ছে তাদের ভারী স্কুল ব্যাগ।

সমস্যার গভীরে যেতে হলে আমাদের প্রথমেই দেখতে হবে- এই অতিরিক্ত বোঝার উৎস কোথায়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক পর্যায়ে একটি একক, সুসংগঠিত ও সর্বজনগ্রাহ্য সিলেবাসের অভাব দীর্ঘদিনের। সরকারি স্কুল, বাংলা ভার্সন, ইংরেজি ভার্সন, ইংরেজি মিডিয়াম- প্রতিটি ধারার জন্য আলাদা আলাদা পাঠ্যক্রম চালু রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেসরকারি স্কুলগুলোর নিজস্ব সিলেবাস নির্ধারণের প্রবণতা। অনেক ক্ষেত্রে এসব স্কুল তাদের পছন্দমতো বই নির্ধারণ করে, যা কখনও কখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি।

ফলে দেখা যায়, একটি ছোট্ট শিশুকে প্রতিদিন ৮-১০টি বই, একাধিক খাতা, ড্রয়িং কপি, প্রজেক্ট ফাইল-সবকিছু একসঙ্গে বহন করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় টিফিন বক্স, পানির বোতল। সব মিলিয়ে ব্যাগটি হয়ে ওঠে এতটাই ভারী যে, সেটি শিশুর জন্য শুধু অস্বস্তিকরই নয়, অনেক সময় ক্ষতিকরও হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাশের দেশ ভারতেও একই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। সেখানে সরকারিভাবে বলা হয়েছে, একটি শিশুর ব্যাগ তার শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই এই সীমা অতিক্রম করা হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রায়ই অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ওজন বহন করছে, যার ফলে তাদের শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে।

তবে উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা ভিন্ন একটি চিত্র দেখতে পাই। সেখানে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন সব বই বহন করতে হয় না। অনেক স্কুলে লকার সুবিধা রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের বই রেখে দিতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা হয়-ট্যাব বা ল্যাপটপের মাধ্যমে পড়াশোনা করা হয়, ফলে বইয়ের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। এছাড়া নির্ধারিত সময়সূচির মাধ্যমে প্রতিদিন সীমিত সংখ্যক বিষয় পড়ানো হয়, যাতে শিক্ষার্থীদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে সব বই বহন করতে না হয়।

বাংলাদেশে আমরা এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি। আমাদের এখানে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, নীতিমালার দুর্বলতা রয়েছে এবং সবচেয়ে বড় কথা-সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। অনেক বেসরকারি স্কুল নিজেদের মতো করে সিলেবাস নির্ধারণ করে, যার পেছনে কখনও কখনও বাণিজ্যিক স্বার্থও কাজ করে। অন্যদিকে, অনেক অভিভাবকের মধ্যেও একটি ভুল ধারণা কাজ করে-বেশি বই মানেই বেশি শিক্ষা। ফলে তারা নিজেরাও অতিরিক্ত গাইড ও সহায়ক বই কিনে দেন, যা শিশুর ব্যাগের ওজন আরও বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই অতিরিক্ত ওজনের প্রভাব কী? এটি কি শুধু একটি সামান্য অস্বস্তি, নাকি এর পেছনে আরও গভীর সমস্যা লুকিয়ে আছে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ভারী ব্যাগ শিশুদের মেরুদণ্ড, ঘাড় এবং কাঁধের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থায়ী শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুধু শারীরিক নয়- এর একটি মানসিক দিকও রয়েছে। যখন একটি শিশু প্রতিদিন এত ভার বহন করে স্কুলে যায়, তখন তার কাছে স্কুল আর আনন্দের জায়গা থাকে না; বরং এটি একটি চাপের প্রতীক হয়ে ওঠে। শেখার আগ্রহ কমে যায়, ক্লান্তি বাড়ে এবং ধীরে ধীরে সে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। এখানেই আমাদের থেমে ভাবা দরকার-আমরা কি সত্যিই শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছি, নাকি তাদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করছি?

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিশুর মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করা, তাকে আনন্দের সঙ্গে শেখার সুযোগ দেওয়া। কিন্তু যখন সেই শিক্ষা ব্যবস্থাই শিশুর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটি তার উদ্দেশ্য থেকে সরে যায়। এর সমাধান অবশ্যই আছে, তবে সেটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা ও সমন্বিত উদ্যোগ। বাংলাদেশে শিশুদের অতিরিক্ত ভারী স্কুল ব্যাগের সমস্যা কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি; বরং এটি নীতি, মানসিকতা, অবকাঠামো ও তদারকির ঘাটতির সমন্বিত ফল। তাই এর সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক, বাস্তবসম্মত এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য।

প্রথমত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি একীভূত ও নিয়ন্ত্রিত সিলেবাস ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বর্তমানে বিভিন্ন মাধ্যমণ্ডবাংলা, ইংরেজি ভার্সন, ইংরেজি মিডিয়াম এবং বেসরকারি স্কুল-নিজস্বভাবে পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করে থাকে। এর ফলে একই শ্রেণিতে পড়া শিক্ষার্থীদের বইয়ের সংখ্যা ও ধরনে ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়। সরকার যদি একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সব স্কুলকে নিয়ে আসে এবং নির্দিষ্ট করে দেয় কোন শ্রেণিতে কতগুলো বই থাকবে, তাহলে অপ্রয়োজনীয় বইয়ের চাপ অনেকাংশে কমে যাবে।

দ্বিতীয়ত, স্কুল ব্যাগের ওজন নির্ধারণ ও কঠোর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি মানদণ্ড হলো-শিশুর ব্যাগ তার শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিত তদারকি চালু করা দরকার। স্কুল কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে, যাতে তারা অপ্রয়োজনীয় বই ও খাতা চাপিয়ে দিতে না পারে।

তৃতীয়ত, বই ও খাতার সংখ্যা যৌক্তিকভাবে কমানো প্রয়োজন। অনেক সময় একটি বিষয়ের জন্য একাধিক বই, গাইড, ওয়ার্কবুক ইত্যাদি দেওয়া হয়, যা শিশুর জন্য অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করে। এর পরিবর্তে সমন্বিত ও সংক্ষিপ্ত পাঠ্যবই তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে মূল বিষয়গুলো সহজভাবে উপস্থাপন করা হবে। শিক্ষার্থীদের শেখার মান বাড়ানোর জন্য বইয়ের পরিমাণ নয়, বরং পাঠদানের পদ্ধতির উন্নয়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থত, স্কুলে লকার বা সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। উন্নত দেশগুলোর মতো প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা লকার না হলেও, শ্রেণিকক্ষে বই রেখে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন সব বই বহন করতে হবে না, এবং ব্যাগের ওজন স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে।

পঞ্চমত, ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার ধীরে ধীরে এই সমস্যার একটি টেকসই সমাধান দিতে পারে। ট্যাব, স্মার্ট ক্লাস বা ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে বইয়ের সংখ্যা কমানো সম্ভব। যদিও বাংলাদেশের সব জায়গায় এটি একসাথে বাস্তবায়ন করা কঠিন, তবে শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে এটি চালু করা যেতে পারে। তবে এখানে খেয়াল রাখতে হবে, ডিজিটাল বিভাজন যেন নতুন কোনো বৈষম্য সৃষ্টি না করে। ষষ্ঠত, স্কুলের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রতিদিন সব বিষয় না রেখে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট বিষয় পড়ানো হলে শিক্ষার্থীদের সব বই বহন করার প্রয়োজন হবে না। উদাহরণস্বরূপ, একদিনে ২-৩টি প্রধান বিষয় নির্ধারণ করা হলে ব্যাগের ওজন অনেকটাই কমে যাবে।

সপ্তমত, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। অনেক অভিভাবক মনে করেন, বেশি বই মানেই বেশি শেখা। এই ভুল ধারণা দূর করতে হবে। অভিভাবকদের বুঝতে হবে যে, শিশুর মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা শিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ। তারা যদি নিজেরাই অতিরিক্ত গাইড বা সহায়ক বই কিনে দেন, তাহলে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অষ্টমত, শিক্ষকদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ড. মাহবুবুর রহমান

প্রভাষক, রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত