ঢাকা শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিশুদের কাঁধে বইয়ের বোঝা : স্কুলব্যাগ নাকি বস্তা

ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
শিশুদের কাঁধে বইয়ের বোঝা : স্কুলব্যাগ নাকি বস্তা

প্রতিদিন সকাল হলেই দেশের শহর, মফস্বল কিংবা গ্রামের রাস্তাগুলোতে একটি পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ে। ছোট ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পিঠে বিশাল ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলের দিকে ছুটছে। কারও কাঁধ ব্যাগের ভারে নুয়ে পড়েছে, কেউ হাঁটতে গিয়ে বারবার থেমে বিশ্রাম নিচ্ছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, শিশুরা যেন স্কুলব্যাগ নয়, একেকটি বস্তা বহন করছে। শিক্ষা অর্জনের জন্য স্কুলে যাওয়া আনন্দের হওয়ার কথা; কিন্তু বর্তমানে অনেক শিশুর কাছে স্কুলে যাওয়া মানেই ভারী ব্যাগের কষ্ট বয়ে নেওয়া। বিষয়টি শুধু অস্বস্তির নয়; এটি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বর্তমান সময়ে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ভালো ফলাফল অর্জনের চাপ ছোটবেলা থেকেই শিশুদের ওপর এসে পড়ছে। ফলে প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যেতে হয় অসংখ্য বই, খাতা ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান, ধর্ম, কম্পিউটার- প্রতিটি বিষয়ের আলাদা বই ও খাতা থাকে। এর সঙ্গে যোগ হয় সহায়ক বই, হোমওয়ার্ক খাতা, আঁকার সামগ্রী, পানির বোতল, টিফিন বক্সসহ আরও নানা কিছু। সব মিলিয়ে একটি ছোট শিশুর ব্যাগ এতটাই ভারী হয়ে যায় যে সেটি বহন করা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে।বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। পাঁচ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা শারীরিকভাবে পুরোপুরি শক্তিশালী হয়ে ওঠে না।

তাদের হাড় ও মেরুদণ্ড তখনও গঠনের পর্যায়ে থাকে। এমন অবস্থায় প্রতিদিন অতিরিক্ত ওজন বহন করলে শরীরে স্থায়ী সমস্যা তৈরি হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, একটি শিশুর ব্যাগের ওজন তার শরীরের মোট ওজনের ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শিশুই নিজের শরীরের তুলনায় অনেক বেশি ভার বহন করছে। কেউ কেউ এমন ভারী ব্যাগ নিয়ে হাঁটে যে সিঁড়ি ভাঙতে বা রাস্তা পার হতে গিয়ে কষ্টে হাঁপিয়ে ওঠে। অতিরিক্ত ভারী ব্যাগের কারণে শিশুদের শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মেরুদণ্ড। দীর্ঘদিন ভারী ব্যাগ বহনের ফলে শিশুদের পিঠে ব্যথা, ঘাড়ে টান, কাঁধে ব্যথা এবং কোমরে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় শিশুদের হাঁটার ভঙ্গিও পরিবর্তিত হয়ে যায়। কেউ সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটে, কেউ আবার একদিকে কাঁধ নামিয়ে ব্যাগ বহন করে। এতে শরীরের স্বাভাবিক গঠন বাধাগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যতে এসব সমস্যা আরও জটিল রূপ নিতে পারে। অল্প বয়সেই অনেক শিক্ষার্থী পিঠব্যথার অভিযোগ করছে, যা আগে বড়দের মধ্যে বেশি দেখা যেত। শুধু শারীরিক সমস্যাই নয়, ভারী ব্যাগ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

প্রতিদিন এত বই গুছিয়ে নেওয়া, কোনো বই ভুলে গেলে শিক্ষকের বকুনি পাওয়ার ভয়- এসব কারণে শিশুরা মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ কমে যায়। ছোটবেলার শিক্ষাজীবন হওয়া উচিত আনন্দময়, সৃজনশীল ও মুক্ত। কিন্তু বইয়ের অতিরিক্ত বোঝা শিশুদের সেই স্বাভাবিক আনন্দ কেড়ে নিচ্ছে। অনেক শিশু স্কুলে যাওয়ার কথা শুনলেই ভয় পায় বা বিরক্তি প্রকাশ করে।

এটি একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। এ সমস্যার জন্য শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই অনেকাংশে দায়ী।

বর্তমানে অধিকাংশ স্কুলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বই বহন করতে বলা হয়। অনেক সময় একটি বিষয়ের জন্য একাধিক সহায়ক বই ব্যবহার করা হয়। শিক্ষকরা প্রায়ই সব খাতা প্রতিদিন নিয়ে আসতে বলেন। অথচ প্রতিদিন সব বিষয়ের ক্লাসও থাকে না। অনেক স্কুলে রুটিন ঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় না, ফলে শিশুরা নিরাপদ থাকার জন্য প্রায় সব বইই ব্যাগে ভরে নিয়ে যায়। এতে ব্যাগের ওজন আরও বেড়ে যায়।

অভিভাবকদের মধ্যেও সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেকে মনে করেন, সন্তান যত বেশি বই বহন করবে, তত বেশি পড়াশোনা হবে। কেউ কেউ আবার স্কুলব্যাগে অপ্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে দেন। কিন্তু তারা বুঝতে চান না যে, অতিরিক্ত ভার একটি শিশুর শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে। অনেক সময় অভিভাবকরা নিজেরাই সন্তানের ব্যাগ পরীক্ষা করেন না। ফলে শিশুরা অপ্রয়োজনীয় খাতা, পুরোনো বই কিংবা খেলনা পর্যন্ত ব্যাগে নিয়ে যায়। সচেতন অভিভাবক চাইলে প্রতিদিন ব্যাগ পরীক্ষা করে সন্তানের কষ্ট অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারেন।

স্কুল কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিনের ক্লাস রুটিন এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে একই দিনে অনেক বেশি বিষয় না থাকে। অপ্রয়োজনীয় সহায়ক বই ব্যবহারের প্রবণতা কমাতে হবে এবং শিক্ষকদের সচেতন হতে হবে যেন তারা প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত খাতা বা বই আনতে না বলেন। অনেক উন্নত দেশে স্কুলে লকারের ব্যবস্থা থাকে, যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় বই রেখে যেতে পারে। বাংলাদেশেও বড় স্কুলগুলোতে ধীরে ধীরে এমন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

বর্তমান যুগ প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারও এ সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক দেশে এখন ডিজিটাল বই ও স্মার্ট ক্লাসরুম চালু হয়েছে। ট্যাব বা অনলাইন নোট ব্যবহারের মাধ্যমে বইয়ের সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। যদিও দেশের সব স্কুলে এখনই তা বাস্তবায়ন সহজ নয়, তবুও ধীরে ধীরে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে। এতে যেমন শিক্ষার্থীদের কষ্ট কমবে, তেমনি শিক্ষাব্যবস্থাও আধুনিক হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুলব্যাগের সর্বোচ্চ ওজন নির্ধারণ করে দিতে পারে। পাশাপাশি এ বিষয়ে নিয়মিত তদারকি চালাতে হবে। শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে স্কুলগুলোর জন্য নির্দেশিকা তৈরি করা যেতে পারে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কারণ এটি শুধু একটি ছোট সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতার সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুরা এখন বেড়ে ওঠার পর্যায়ে রয়েছে। তাদের শরীর কোমল ও সংবেদনশীল। অতিরিক্ত চাপ তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। একটি শিশু যদি প্রতিদিন ভারী ব্যাগ বহন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তার শৈশবের আনন্দ নষ্ট হয়ে যায়। অথচ শৈশব হওয়া উচিত মুক্ত, প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি।

অনেক সময় দেখা যায়, ছোট ছোট শিশুরা রাস্তা পার হতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাচ্ছে। বাস বা রিকশায় উঠতেও কষ্ট হচ্ছে। এসব দৃশ্য আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো। একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি ছোটবেলা থেকেই শারীরিক কষ্টে বড় হয়, তাহলে তা জাতির জন্যও অশনি সংকেত। তাই এখনই আমাদের সচেতন হতে হবে।

শিক্ষা কখনোই শিশুর জন্য বোঝা হতে পারে না। শিক্ষা হবে আনন্দের, অনুপ্রেরণার এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার মাধ্যম। স্কুলব্যাগ হবে প্রয়োজনীয় জ্ঞানের বাহক, কষ্টের প্রতীক নয়। কোমল কাঁধে অতিরিক্ত ভার চাপিয়ে দিয়ে আমরা তাদের মেধা বিকাশে সহায়তা করছি না, বরং তাদের সুস্থ ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছি। তাই সময় এসেছে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার। স্কুল কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, অভিভাবক ও সরকার- সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুদের জন্য এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে তারা আনন্দের সঙ্গে শিখবে, স্বস্তির সঙ্গে স্কুলে যাবে এবং সুস্থভাবে বেড়ে উঠবে। কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের কাঁধে বইয়ের পাহাড় চাপিয়ে নয়, বরং ভালোবাসা, সচেতনতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ।

ওরাইনা খাঁন চৌধুরী

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত