ঢাকা শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার বদৌলতে হু-হু করে বাড়ছে বেকারত্ব, মুক্তি মিলবে কবে

মো: ইনজামামুল হক অয়ন
ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার বদৌলতে হু-হু করে বাড়ছে বেকারত্ব, মুক্তি মিলবে কবে

চাকরি বাজারের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় হেরে প্রতিনিয়ত বিশাল সংখ্যক মানুষ বরণ করে নিচ্ছে অভিশপ্ত বেকারত্ব। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর দেশের লক্ষাধিক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে বের হলেও তাদের একটি বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাচ্ছে না। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে দক্ষ জনবলের সংকটও। চাকরিদাতারা বলছেন, যোগ্যপ্রার্থী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে তরুণরা অভিযোগ করছেন, চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা এতটাই অসুস্থ হয়ে উঠেছে যে সেখানে টিকে থাকাই কঠিন। এই দ্বৈত বাস্তবতার পেছনে সবচেয়ে বড় দায় হিসেবে উঠে আসছে দেশের দুর্বল, অকার্যকর, মানহীন ও যুগের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা স্বাধীনতার এতো বছরেও বিশ্বমানের হতে পারেনি। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা কিংবা বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জনের চেয়ে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হওয়ার পরও অধিকাংশ শিক্ষার্থী চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বলা হয় জ্ঞান ও গবেষণার কেন্দ্র। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিবেশ অত্যন্ত সীমিত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থানও আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্বখ্যাত কিউএস র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান প্রমাণ করে যে এখনও বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুক্তবুদ্ধির চর্চা, গবেষণা সংস্কৃতি কিংবা উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ খুব কমই দেখা যায়।

শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এখনও অনেক প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির উপর নম্বর রাখা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও প্রকৃত শেখার আগ্রহ তৈরি হয় না। অন্যদিকে কারিকুলামগুলোও এমনভাবে সাজানো, যেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের আধিক্য থাকলেও বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সীমিত। চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটানোর পরও অনেক গ্র্যাজুয়েট একটি মানসম্মত সিভি তৈরি, প্রেজেন্টেশন দেওয়া বা মৌলিক সফটওয়্যার ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন না।

চাকরিদাতাদের মতে, বর্তমানে চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বাস্তব অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের উপর। কিন্তু দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষা জীবনেই এসব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান না। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করার সুযোগ পায়। এতে তারা যেমন বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তেমনি মানি ম্যানেজমেন্ট, নেটওয়ার্কিং ও পেশাগত আচরণ সম্পর্কেও ধারণা লাভ করে। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামো এখনও এতটাই চাপপূর্ণ যে অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার বাইরে অন্য কোনো দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগই পায় না।

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্র ভবিষ্যতের চাকরির ধরন পাল্টে দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও সেই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি। স্কুল-কলেজের আইসিটি শিক্ষা অনেকাংশেই পুরোনো ধ্যানধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগ শেখানোর বদলে এখনও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের খাতায় ঐঞগখ কোড লিখিয়ে শেখানো হয়। অথচ বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে প্রোগ্রামিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক্সের দিকে।

শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতাই নয়, ভাষাগত দক্ষতার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। একজন শিক্ষার্থী প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর ইংরেজি পড়াশোনা করেও অনেক সময় কার্যকরভাবে ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে পারে না। ফলে আন্তর্জাতিক চাকরির বাজার, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা উচ্চশিক্ষার অনেক সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। বর্তমানে বৈশ্বিক চাকরির বাজারে যোগাযোগ দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সেই দক্ষতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বের হয়ে দক্ষতাভিত্তিক ও ব্যবহারিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রেজেন্টেশন, কম্পিউটার দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ও যোগাযোগ কৌশল শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা জরুরি।

এছাড়া প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণেরও কোনো বিকল্প নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোডিং, ডেটা ম্যানেজমেন্ট ও ডিজিটাল দক্ষতাকে এখন সময়ের চাহিদা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে তরুণদের প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। অন্যথায় ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থানের সংকট আরও গভীর হবে।

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই শক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবেই নয়, সামাজিক অস্থিরতার কারণ হিসেবেও দেখা দিতে পারে।

তাই সময়ের দাবি হলো যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ডিগ্রির চেয়ে দক্ষতা, সনদের চেয়ে যোগ্যতা এবং মুখস্থবিদ্যার চেয়ে বাস্তব জ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাহলেই শুধু দেশের তরুণরা ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

এবার আসা যাক স্বল্প শিক্ষিত কিংবা নিরক্ষর মানুষের কথায়। বাঙালিরা মধ্যেপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশাল সংখ্যায় কাজ করে যাচ্ছে। তবে রেমিট্যান্স সেই তুলনায় কমই আসে বলা চলে। কেননা, আমাদের কর্মীরা দক্ষ না।

ন্যূনতন শিক্ষা, ভাষাজ্ঞান, প্রশিক্ষণের অভাবে বিরাট অংকের রেমিট্যান্স হাত ছাড়া হচ্ছে রাষ্ট্রের। তবে এই মানুষগুলোর প্রশিক্ষণ প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা গেলে রেমিট্যান্স বাড়ানো সম্ভব বহুগুণে। ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার বদৌলতে আমাদের চাকরি বাজারে যে বিশাল ক্ষত প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয়ে আসছে- সেটির থেকে সহসা মুক্তি মেলার আশা ক্ষীণ। অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনে প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

মো: ইনজামামুল হক অয়ন

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত