ঢাকা শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্যামেরা ঢাকার সড়কে নতুন শৃঙ্খলার ইঙ্গিত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্যামেরা ঢাকার সড়কে নতুন শৃঙ্খলার ইঙ্গিত

রাজধানী ঢাকার চিরচেনা যানজট আর বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানোর লক্ষ্যে সম্প্রতি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে স্থাপন করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-প্রযুক্তির উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা। এই নতুন প্রযুক্তি প্রবর্তনের স্বল্প সময়ের মধ্যেই সড়কের চালকদের আচরণে এক দৃশ্যমান পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সিগন্যাল অমান্য করা কিংবা জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর গাড়ি থামিয়ে দেওয়ার যে পুরোনো সংস্কৃতি, তা যেন এই ডিজিটাল পাহারাদারের প্রভাবে ক্রমে বদলে যাচ্ছে।

ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির এই সংমিশ্রণ শুধু আধুনিকায়ন নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল নাগরিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার পথে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘকাল ধরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সরাসরি উপস্থিতির পরও চালকদের বড় একটি অংশ আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতেন। কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ থাকছে না। ‘চোখ ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়’ এই বোধ থেকেই চালকদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। সিগন্যাল লাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে বড় বাসগুলোও সতর্কতার সঙ্গে থেমে যাচ্ছে। বিশেষ করে জেব্রা ক্রসিংয়ের আগে গাড়ি থামানোর যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা পথচারীদের জন্য এক পশলা স্বস্তির বার্তাই বহন করে।

এআই ক্যামেরার কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত নিখুঁত এবং স্বয়ংক্রিয়। এটি শুধু নিয়ম লঙ্ঘন শনাক্তই করছে না, বরং মুহূর্তের মধ্যে যানবাহনের নম্বর প্লেট স্ক্যান করে তথ্যভাণ্ডারে পাঠিয়ে দিচ্ছে। ফলে কোনো ট্রাফিক পুলিশ সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও চালকের মুঠোফোনে জরিমানার ক্ষুদে বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে। এই ‘ইনভিজিবল মনিটরিং’ বা অদৃশ্য তদারকি চালকদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আনছে। যখন একজন চালক জানেন যে তার প্রতিটি গতিবিধি যান্ত্রিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আইন ভাঙলে শাস্তি অনিবার্য, তখন তিনি স্বেচ্ছায় নিয়ম মেনে চলায় মনোযোগী হন। শাস্তির ভয় নয়, বরং শাস্তির ‘নিশ্চয়তা’ই মানুষকে শৃঙ্খলায় ফেরায়- এআই ক্যামেরা সেই নিশ্চয়তা দিচ্ছে।

তবে কেবল ক্যামেরা স্থাপন বা প্রযুক্তি নির্ভরতাই ঢাকার ট্রাফিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। এই সূচনার সুফল ধরে রাখতে আমাদের আরও কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জের দিকে নজর দিতে হবে। প্রথমত, সড়কের ডিজিটাল পরিকাঠামো বা স্মার্ট সিগন্যাল ব্যবস্থার যথাযথ সমন্বয় প্রয়োজন। অনেক সময় যান্ত্রিক সিগন্যালের সঙ্গে পুলিশের হাতের ইশারার অসামঞ্জস্যতা চালকদের বিভ্রান্তিতে ফেলে। এই সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পথচারীদেরও এআই নজরদারির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। চালকরা আইন মেনে জেব্রা ক্রসিংয়ের আগে থামলেও পথচারীরা যদি যত্রতত্র রাস্তা পারাপার হন, তবে সড়কের পূর্ণ শৃঙ্খলা অধরাই থেকে যাবে।

ঢাকার সড়কগুলোতে এআই প্রযুক্তির এ প্রয়োগ আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ হওয়ার অভিযাত্রার একটি প্রতিফলন। আমরা জানি, উন্নত বিশ্বের শহরগুলোতে সড়ক ব্যবস্থাপনা প্রায় শতভাগ প্রযুক্তি নির্ভর। সেখানে ট্রাফিক সার্জেন্টদের খুব একটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। ঢাকাতেও যদি পর্যায়ক্রমে সকল প্রবেশপথ ও প্রধান সড়কগুলো এই ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনা যায়, তবে ট্রাফিক পুলিশের ওপর শারীরিক চাপ যেমন কমবে, তেমনি দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগও হ্রাস পাবে।

একটি শহরের আভিজাত্য ও আধুনিকতানির্ভর করে তার ট্রাফিক শৃঙ্খলার ওপর। এআই ক্যামেরা ব্যবহারের ফলে চালকদের মধ্যে যে ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তাকে স্থায়িত্ব দিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। চালক ও মালিকপক্ষকে এই প্রযুক্তির সুবিধা ও নিয়মকানুন সম্পর্কে আরও বিশদভাবে অবহিত করতে হবে। পাশাপাশি সার্ভার বা কারিগরি ত্রুটির কারণে কোনো নিরপরাধ চালক যেন হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও ডিএমপির সজাগ দৃষ্টি রাখা বাঞ্ছনীয়।

এআই ক্যামেরার প্রভাবে চালকদের নিয়ম মানার এই প্রবণতা এক শুভ সংকেত। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার যে মানুষের অভ্যাস বদলে দিতে পারে, এটি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে এই সাফল্য ধরে রাখা সরকারের ধারাবাহিক তদারকি এবং নাগরিকদের সচেতনতার ওপর নির্ভর করছে। ঢাকার সড়ক হোক নিরাপদ, আধুনিক এবং সুশৃঙ্খল- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। ডিজিটাল পাহারাদার এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত