প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ মে, ২০২৬
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যারিস্টটলের সেই অবিনশ্বর বাণী- ‘যে ব্যক্তি সমাজে বাস করে না সে হয় দেবতা, না হয় পশু’- মানুষের সামাজিক অপরিহার্যতাকেই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষের এই সামাজিক অস্তিত্বের সমীকরণে ‘বন্ধুত্ব’ শুধু একটি শব্দ নয়, বরং এটি জীবনের এক পরম ঐশ্বর্য। মানবজীবনের হর্ষ-বিষাদ, আনন্দ-বেদনা আর প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে একজন প্রকৃত বন্ধুর উপস্থিতি আত্মার শক্তির আধার হিসেবে কাজ করে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে; ভুল মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা সখ্যতা জীবনকে ঠেলে দিতে পারে এক অনিবার্য ধ্বংসের গহ্বরে।
মানুষ মূলত একাকীত্বের বিপরীতে এক চিরন্তন অভিযাত্রী। তাই জন্মগত সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বাসের বুননে গড়ে ওঠে এক অনন্য বন্ধন-বন্ধুত্ব। এই সম্পর্কের মধ্যে নিহিত থাকে প্রশান্তি আর নির্ভরতার এক অভয় অরণ্য। প্রচলিত ধারণায় সমবয়সীরাই বন্ধুত্বের মূল কারিগর হলেও, সময়ের বিবর্তনে আজ এই সংজ্ঞার দিগন্ত প্রসারিত। বয়সের ব্যবধান ছাপিয়ে আজ বাবা-মা, শিক্ষক কিংবা অগ্রজ-অনুজরা হয়ে উঠতে পারেন শ্রেষ্ঠ সুহৃদ। যখন রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বন্ধুত্বের এই সুবাস ছড়িয়ে পড়ে, তখন জীবন হয়ে ওঠে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও ঋদ্ধ।
একটি সার্থক জীবন গঠনে প্রকৃত বন্ধুত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একজন প্রকৃত বন্ধু শুধু সহযাত্রী নন, তিনি জীবনের ধূসর সময়ে আশার আলো এবং লক্ষ্যচ্যুত মুহূর্তে সঠিক পথের দিশারি। তবে সমকালীন বাস্তবতায় সব বন্ধুত্ব হিরন্ময় নয়। সৎ বন্ধুর সান্নিধ্য যেমন জীবনকে আলোকিত করে, তেমনি স্বার্থান্বেষী বন্ধুর প্রভাবে নৈতিক অবক্ষয় ঘটা বিচিত্র নয়। তাই সখ্যতার এই মহৎ শিল্পে ‘নির্বাচন’ প্রক্রিয়াটি হওয়া উচিত অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও সচেতন। শৈশবের বন্ধুত্বের মধ্যে যে নির্মলতা আর অকৃত্রিমতা থাকে, জীবনের পরিণত বেলায় তা ক্রমশ বিরল হয়ে আসে।
বৈষয়িক সাফল্য আর ক্যারিয়ারের প্রতিযোগিতায় সম্পর্কের গভীরতায় অনেক সময় স্বার্থের মরিচা ধরে। যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগে প্রযুক্তির মায়াজালে আমরা সহস্র বন্ধুর ভিড়েও আজ বড় বেশি একা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা বাড়লেও, প্রকৃত হৃদস্পন্দন বোঝার মতো মানুষের আকাল আজ সর্বত্র। তবুও ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত কিছু বন্ধুত্ব আজও টিকে আছে, যা আমাদের সম্পর্কের ওপর আস্থা রাখতে শেখায়। প্রকৃত বন্ধুত্ব সময় কিংবা দূরত্বের মহাকালের কাছে পরাজিত হয় না। হৃদয়ের টান যদি অটুট থাকে, তবে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পরও মিলনের মুহূর্তটি সেই আগের মতোই অমলিন মনে হয়।
আজকের সমাজব্যবস্থায় যে পারিবারিক অস্থিরতা আর মানসিক শূন্যতা আমরা দেখি, তার মূলে রয়েছে প্রকৃত বন্ধুত্বের অভাব। পারস্পরিক সহমর্মিতা আর মূল্যবোধের এই ঘাটতি শুধু একজন যোগ্য বন্ধুর মাধ্যমেই পূরণ করা সম্ভব। প্রাচীন প্রবাদে বলা হয়- ‘সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে’। এটি শুধু কথা নয়, বরং মানব চরিত্রের এক কঠিন সত্য। সৎ সঙ্গের সংস্পর্শে সাধারণ মানুষও অনন্য হয়ে ওঠে, আর অসৎ সঙ্গের প্রভাবে সুবর্ণ সম্ভাবনাও ছাই হয়ে যায়। অসৎ বন্ধুর সঙ্গ সাময়িকভাবে প্রলুব্ধ করলেও দিনশেষে তা অনিশ্চয়তা আর বিভীষিকার জন্ম দেয়। এটি মানুষকে তার অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করে।
মহাপ্রাণ শেখ সাদী-এর সেই অমোঘ উক্তি— ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’- বন্ধুত্বের এই চিরন্তন দর্শনকেই প্রতিষ্ঠিত করে। একজন যোগ্য বন্ধু আপনার জীবনের গতিপথ বদলে দিয়ে আপনাকে শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে নিয়ে যেতে পারেন। তাই একটি সুন্দর, মার্জিত ও সফল জীবনের সোপান হিসেবে সঠিক বন্ধুত্ব নির্বাচনই হোক আমাদের প্রজ্ঞা ও বিবেচনার প্রধান মানদণ্ড।
ফাহিমা আক্তার
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, ঢাকা।