ঢাকা শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তরুণ সমাজের মানসিক স্বাস্থ্য

সামিয়া রহমান
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তরুণ সমাজের মানসিক স্বাস্থ্য

বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। যার মাধ্যমে আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাবলি সম্পর্কে আমরা অবগত থাকতে পারি। এটি বর্তমানে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। শুধুমাত্র আমাদের বিনোদনের মাধ্যমই নয়, বরং এটি আমাদের নিজেদের চিন্তাধারা প্রকাশ করারও একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। যার কারণেই এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী সক্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৫৬৬ কোটি। যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৯.৯%। ফেসবুক এখনও শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ৩.০৭ বিলিয়নের বেশি ব্যবহারকারী নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, এরপরই রয়েছে- ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রাম। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর ৯৪.৫% সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সক্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ কোটি ২৯ লাখ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯৩% মানুষ (প্রায় ৩১ কোটি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। ২০১০ সালে এই সংখ্যা কম থাকলেও ২০২৬ সালের মধ্যে তা ৬ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অধিকাংশ ব্যবহার যেমন ইতিবাচক কাজে ব্যবহৃত হয় ঠিক, তেমনি এটি অপব্যবহারের সঙ্গেও জড়িত। ইতিবাচক ব্যবহারের গড় হার (৮০%-৮৫%)। রক্তদান, তহবিল সংগ্রহ এবং মানবিক সহায়তায় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কোটি কোটি মানুষ ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন। অন্যদিকে নেতিবাচক বা খারাপ ব্যবহারের গড় হার (১৫%-২০%)। বাংলাদেশে এবং বিশ্বব্যাপী প্রায়ই একটি গোষ্ঠী সামাজিকমাধ্যমে ভুয়া খবর বা ধর্মীয় রাজনৈতিক উস্কানি ছড়ায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটিক, ইউটিউব ইত্যাদি প্লাটফর্ম। এই প্ল্যাটফর্মগুলো যেমন সহজলভ্য ঠিক তেমনই এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক নীরব সংকট যা তরুণ সমাজের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলনা করার প্রবণতা তরুণদের মানসিক চাপে ফেলছে। তাছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের সাফল্য, সুখী মুহূর্ত বা বাহ্যিক সৌন্দর্যের সাজানো ছবি দেখে অনেক মানুষই নিজেকে তুচ্ছ মনে করতে শুরু করে। এই ‘ভার্চুয়াল পারফেকশন’ বাস্তব জীবনের সঙ্গে মেলে না। কিন্তু এই বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে না পারার কারণে অনেকেরই আত্মবিশ্বাস কমে যায়, জন্ম নেয় হতাশা। তাছাড়া লাইক, কমেন্ট ও শেয়ারের ওপর যে নির্ভরশীলতা রয়েছে তা তরুণ-তরুণীদের মানসিক স্থিতিশীলতাকেও নাড়া দেয়।

অনেক সময় একটি পোস্টে প্রত্যাশিত সাড়া না পেলে তারা নিজেদের অযোগ্য বা অপ্রিয় মনে করতে পারে। ফলে এটি তাদের ধীরে ধীরে ক্ষতির দিকে অগ্রসর হতে থাকে। আবার, সাইবার বুলিং বা অনলাইন হয়রানি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই কটূক্তি, ট্রল বা অপমানজনক মন্তব্যের শিকার হন, যা সোশ্যাল মিডিয়ার একটি বড় ধরনের সমস্যা। এই সবকিছু তাদের মধ্যে ভয় লজ্জা ও একাকিত্বের অনুভূতি তৈরি করে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বাজেভাবে প্রভাব ফেলে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি নেতিবাচক দিক হলো আসক্তি। অনেক মানুষই ঘন্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে ডুবে থাকে, যার ফলে ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি, দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মাথাব্যথাসহ আরও নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাছাড়া আমাদের বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোতেও দূরত্ব তৈরি হয়। এই ভারসাম্যহীনতা ধীরে ধীরে মানসিক ক্লান্তি ও অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়। তবে সবকিছুর মাঝেও আশার কথা হলো আমাদের নিজেদের সচেতনতা ও সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো অনেকটাই কমানো সম্ভব। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণদের শিখাতে হবে ডিজিটাল ডিটক্স, বাস্তব জীবনের সম্পর্কের গুরুত্ব এবং আত্মমর্যাদার মূল্য। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ ও ইতিবাচক কনটেন্টে নিজেকে যুক্ত রাখাও জরুরি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খারাপ নয়, এর অপব্যবহারই সমস্যার মূল। তাই প্রযুক্তির সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, একটি সুস্থ মনই পারে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে। তাই আমাদের সকলের উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেষ্ট হওয়া।

সামিয়া রহমান

শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত