প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২১ মে, ২০২৬
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু ঢাকায় বসে একটা শিশু যে মানের শিক্ষা গ্রহণ করছে, দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের শিশু সেই মানের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে না। আবার উচ্চবিত্তের সন্তান যে শিক্ষা সুযোগ পায়, গরিব খেটে খাওয়ার মানুষের সন্তান সেটা পায় না। একই দেশ অথচ মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে কত অসমতা। অথচ শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড।
ব্রিটিশ কারিকুলামের ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু ভর্তি করাতে দেখা হয় বাবা- মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা আর আয়। মানে একজন দিনমজুরের সন্তান মেধাবী হলেও সেখানে পড়তে পারবে না। আবার উন্নত প্রযুক্তি, মানসম্মত শিক্ষক আর বাস্তবিক শিক্ষা সম্পন্ন দেশের নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ঢাকায় কিংবা বিভাগীয় শহরগুলোতে অবস্থিত। প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুর সুযোগ হয় না শহরে গিয়ে পড়ার। তাই শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করে তার জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে ঢাকার নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনে থাকে বিস্তর ফারাক।
শিক্ষা অর্জন অনেকের কাছে এত ব্যয়বহুল যে প্রাইভেট পড়াতে হবে বলে সন্তানের ভালো মেধা থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞান বিভাগে পড়াতে পারে না। বেশিরভাগ খেটে খাওয়া মানুষের সন্তান পড়ে মানবিক বিভাগে। মানবিক বিভাগে পড়াশোনা করলেও মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় আর ছেলেরা উপার্জনের পেছনে ছোটে। বিজ্ঞান বিভাগে অনেকে পড়লেও প্রয়োজনীয় উপাদানের অভাবে বাস্তবিক বিষয় ভালো করে শিখতে পারে না। উচ্চশিক্ষায় ও অসমতা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হয়েও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় হতাশা থেকে পড়াশোনা বন্ধ করে দেয় অনেক শিক্ষার্থী। কারণ সমাজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিচু চোখে দেখা হয়। বাংলাদেশে শিক্ষার পেছনে ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে প্রাথমিকে এই হার প্রায় ১৪ শতাংশ, মাধ্যমিকে প্রায় ১৬ শতাংশের বেশি এবং কারিগরি শিক্ষায় তা ৪৪ শতাংশেরও বেশি।
মূলত আর্থিক সংকট ও শিক্ষা খরচের চাপই এই ঝরে পড়ার মূল কারণ। শিক্ষার কাঠামোগত দুর্বলতা গরিবের সন্তানদের মেধার সঠিক মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে না। অনেকে বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলে খেটে-খাওয়া মানুষের সন্তান পড়ার সুযোগ পায়। কিন্তু তাদের অনুপাত কত? যারা ভালো জায়গায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায় তারা কত কষ্টের পর এই জায়গায় আসতে হয় অনেক উচ্চবিত্তের সন্তান হয়তো তা জানেও না। একজন উচ্চবিত্তের সন্তান যে সুযোগ-সুবিধা পায় একজন দিনমজুরের সন্তান ও তা পাওয়ার দাবিদার।
ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৫’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাত্র ৫ বছরের অবৈতনিক শিক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। এই সূচকে বৈশ্বিক তালিকাতেও দেশের অবস্থান একেবারেই তলানিতে। একই অঞ্চলের ও সমপর্যায়ের অর্থনৈতিক প্রতিবেশী দেশগুলো যেখানে দীর্ঘমেয়াদে অবৈতনিক শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে।
নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তের সন্তানরা যদিও অনেক কষ্ট করে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে, তখন আবার দেখা দেয় মানসম্মত শিক্ষার অভাব। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি তৈরি করতে যে ভূমিকা রাখে দেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটা বর্তমানে অনুপস্থিত। এমনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে শ্রেণিক্ষের সংকট, আবাসন, খাওয়া, যাতায়াত সমস্যা নিত্যদিনের সাথী।
ঢাবি, রাবি, চবির মতো দেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে চরম আবাসন আর যাতায়াত সংকট। বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯৫,৬৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যা মোট বাজেটের প্রায় ১২.১১ শতাংশ এবং মোট জিডিপির ১.৫৩ শতাংশ। টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বাড়লেও, ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী যেখানে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়, সেখানে বাংলাদেশে তা ক্রমাগত কমছে।
তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে আমাদের লক্ষ্য হওয়ার উচিত সকলের জন্য সমান শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। যার জন্য প্রয়োজন জাতীয় বাজেটে শিক্ষার জন্য অর্থ-বরাদ্দ বাড়ানো আর সেই অর্থ যেন সঠিকভাবে কাজে লাগে সেদিকে নজরদারি করা। শিক্ষা যেন জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম হয় এবং উচ্চশিক্ষা অর্জন করে যেন কেউ বেকার না থাকে, সেটা নিশ্চিত করা। শিক্ষা খাতে দুর্নীতি হ্রাস করা, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা আর দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া। শিক্ষকের বেতন বাড়ানো যেন ভালো শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হয়, কারণ ভালো শিক্ষক ভালো পাঠদান করতে পারবেন।
দারিদ্র্যতা যেন শিক্ষাগ্রহণের বাঁধা না হয়, সেজন্য কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা আর কার্যকরি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা। যদিও একদিনে পুরো দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। তবে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন ভবিষ্যতে সবার জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
নুসরাত সুলতানা
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়